Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অমৃতকথা (৩০/০৪/২৫)

অমৃতকথা (৩০/০৪/২৫)
  • ৩০ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

এই যজ্ঞে জীবই যজমান, গৃহস্বামী, জীবের প্রকৃতি গৃহপত্নী, যজমানের সহধর্ম্মিণী, কিন্তু পুরোহিত কে হইবে? জীব যদি স্বয়ং স্বযজ্ঞের পৌরোহিত্য সম্পাদন করিতে যায়, যজ্ঞ সুচারুরূপে পরিচালিত হইবার আশা নাই-ই বলা যায়; কারণ জীব অহঙ্কার দ্বারা চালিত, মানসিক প্রাণিক ও দৈহিক ত্রিবিধ বন্ধনে জড়িত। এই অবস্থায় স্বপৌরোহিত্য গ্রহণ করায় অহঙ্কারই হোতা ঋত্বিক এমন কি যজ্ঞের দেবতা সাজে, তাহা হইলে অবৈধ যজ্ঞবিধানে মহৎ অনর্থ ঘটিবার আশঙ্কা। প্রথমে নিতান্ত বদ্ধ অবস্থা হইতে সে মুক্তি চায়। আর যদি বন্ধনমুক্ত হইতে হয়, স্বশক্তি ভিন্ন অন্য শক্তির আশ্রয় লইতেই হইবে। ত্রিবিধ যূপরজ্জুর শিথিলীকরণের পরেও যজ্ঞ চালাইবার মত নির্দ্দোষ জ্ঞান ও শক্তি হঠাৎ প্রাদুর্ভূত বা সত্বরে সুগঠিত হয় না। দিব্য জ্ঞান ও দিব্য শক্তির প্রয়োজন, তাহার যজ্ঞ দ্বারাই আবির্ভাব ও সুগঠন সম্ভব। আর জীব মুক্ত হইলেও, দিব্যজ্ঞানী ও দিব্যশক্তিমান হইলেও যজ্ঞের ভর্ত্তা অনুমন্তা ঈশ্বরও যজ্ঞফলের ভোক্তা হয়, কিন্তু কর্ম্মকর্ত্তা হয় না। দেবতাকেই পুরোহিতরূপে বরণ করিয়া বেদীর উপর সংস্থাপিত করিতে হইবে। দেবতা স্বয়ং মানব হৃদয়ে প্রবিষ্ট প্রকাশিত ও প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্য্যন্ত মানবের পক্ষে দেবত্ব ও অমরত্ব অসাধ্য, সত্য বটে দেবতা জাগ্রত হওয়ার আগে সেই বোধনার্থে মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষিগণ যজমানের পৌরোহিত্য স্বীকার করেন, বশিষ্ঠ ও বিশ্বামিত্র সুদাস ক্রসদস্যু ও ভরতপুত্রের হোতা হন। কিন্তু দেবতাকে আহ্বান করিয়া বেদীর উপরে পুরোহিত ও হোতার স্থান দিবার জন্যেই সেই মন্ত্রপ্রয়োগ ও হবিঃপ্রয়োগ। দেবতা অন্তরে জাগ্রত না হইলে কেহ জীবকে তরণ করিতে পারে না। দেবতাই ত্রাণকর্ত্তা। দেবতাই যজ্ঞের একমাত্র সিদ্ধিদাতা পুরোহিত।
দেবতা যখন পুরোহিত হন তখন তাঁহার নাম অগ্নি, তাঁহার রূপও অগ্নি। অগ্নির পৌরোহিত্য সর্ব্বাঙ্গসুন্দর সফল যজ্ঞের মুখ্য উপায় ও প্রারম্ভ। এইজন্যই ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলের প্রথম সূক্তের প্রথম ঋকে অগ্নির পৌরোহিত্য নির্দ্দিষ্ট করা হইয়াছে। এই অগ্নি কে? অগ্‌ ধাতুর অর্থ শক্তি, যিনি শক্তিমান তিনি অগ্নি। আবার অগ্‌ ধাতুর অর্থ আলোক বা জ্বালা, যে-শক্তি জ্বলন্ত জ্ঞানের আলোকে উদ্ভাসিত, জ্ঞানের কর্ম্মবল স্বরূপ, সেই শক্তির শক্তিধর অগ্নিরূপ। আবার অগ্‌ ধাতুর অন্য অর্থ পূর্ব্বত্ব ও প্রধানত্ব, যে-জ্ঞানময় শক্তি জগতের আদিতত্ত্ব হইয়া জগতের অভিব্যক্ত সকল শক্তির মূল ও প্রধান, সেই শক্তির শক্তিধর অগ্নি। আবার অগ্‌ ধাতুর অর্থ নয়ন (প্রচালন), জগতাদি সনাতন পুরাতন প্রধান শক্তির যে শক্তিধর জগৎকে নির্দ্দিষ্ট পথে নির্দ্দিষ্ট গন্তব্যধামের দিকে লইয়া অগ্রসর হইতেছেন, যে কুমার দেবসেনার সেনানী, যিনি পথে প্রদর্শক, যিনি প্রকৃতির নানা শক্তিকে জ্ঞানে বলে স্ব স্ব ব্যাপারে প্রবর্ত্তিত করিয়া সুপথে চালিত করেন, সেই শক্তিধর অগ্নি। বেদের শত শত সূক্তে অগ্নির এই সকল গুণ ব্যক্ত স্তুত হইয়াছে।

Advertisement


শ্রীঅরবিন্দের ‘বিবিধ রচনা’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ