Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অমৃতকথা

শিষ্য—আপনার বর্ণিত সৃষ্টি তত্ত্বে প্রণব হইতে বিশ্বসৃষ্টির প্রকার যেরূপ ভাবে বর্ণিত আছে তাহার সহিত বেদ পুরানাদি বর্ণিত সৃষ্টির সঙ্গতি নিশ্চয়ই আছে।

অমৃতকথা
  • ৩ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শিষ্য—আপনার বর্ণিত সৃষ্টি তত্ত্বে প্রণব হইতে বিশ্বসৃষ্টির প্রকার যেরূপ ভাবে বর্ণিত আছে তাহার সহিত বেদ পুরানাদি বর্ণিত সৃষ্টির সঙ্গতি নিশ্চয়ই আছে। ঋগবেদে নাসদীয় সূক্তে এবং মনুসংহিতা পুরাণাদিতে বলা আছে প্রথমে সদসৎ কিছুই ছিল না সেই অচিন্ত্য অবর্ণ্য অব্যক্ত অবস্থার মধ্যে সর্বভূত-পতি হিরণ্য গর্ভের উৎপত্তি হইল, তিনি প্রজাপতিদের সৃষ্টি করিলেন প্রজাপতিরাই তপস্যা দ্বারা বিশ্বসৃষ্টি করিলেন। তাহা ছাড়া অন্তরের প্রেম ভক্তি একাগ্রতা প্রভৃতি সাত্ত্বিক ভাব, কাম ক্রোধাদি রাজসিকভাব, মোহাদি তামসিক ভাব কি ভাবে সৃষ্টি হইল ইহা একটু বুঝাইয়া বলুন।

Advertisement

গুরু—তোমাদের জিজ্ঞাস্য প্রশ্নের উত্তর একে একে আমি দিতে চেষ্টা করিব। প্রথমে তোমাদিগকে শব্দ সৃষ্টির কথা বলিব। শব্দ আকাশের গুণ। আকাশ যেরূপ প্রপঞ্চিত জগতের সৃষ্টি ও লয়ের মূল আধার, শব্দও তদ্রূপ সৃষ্টি ও স্থিতির মূল কারণ। ইতিপূর্ব্বে তোমাদিগকে শব্দের ধ্বনিগত ৪৯ মৌলিক ভেদ কিভাবে সম্পাদিত হইয়াছে তাহাও বলা হইয়াছে। সঙ্গীত ধ্বনিতে যেরূপ রাগ রাগিনী মূর্ত্ত হয়, মন্ত্রে যেরূপ মন্ত্রোক্ত দেবতার রূপ মূর্ত্ত হয় তদ্রূপ এই মৌলিক শব্দ প্রকাশ পথে আব্রহ্মস্তম্ব পর্য্যন্ত সকল নাম ও রূপ সৃষ্টি করিয়াছে আদি সৃষ্টির প্রকাশ ও বিলয় যে ক্রমে হইয়াছে বর্ত্তমানের যে কোন একটী জীব দেহ ও সেই ক্রমেই সৃষ্টি হয়। জীববিজ্ঞানে দেখিবে একটী নরশিশু প্রথমে মাতৃগর্ভে একটী বিন্দু আকারে উৎপন্ন হয়। পিতার বীর্য্য বিন্দু এবং মাতার রজো বিন্দু মিলিত হইয়া গর্ভ-বিন্দুটী হয়। তার পরে সেই বিন্দুটী দ্বিগুণ ক্রমে বৃদ্ধি পাইতে পাইতে গর্ভস্থ ভ্রূণ বিন্দুকে পূর্ণাঙ্গ শিশুরূপে পরিণত করে। তার পরে সেই সম্‌পূর্ণাঙ্গ শিশু গর্ভ হইতে ভূমিষ্ঠ হয়। স্তরে স্তরে এই বৃদ্ধি কি ভাবে হয় তাহা বৈদ্যশাস্ত্রে বিশদভাবে বর্ণিত আছে। এই সৃষ্টির আদি বিন্দুরূপ ধ্বনি হইল হ। পরমাত্মা ও তাঁহার ইচ্ছার মিলনেই এই বিন্দুর উৎপত্তি। সুতরাং আদি বিন্দুর ধ্বনিগত রূপ হইল হ্‌ এবং ভাব হইল আনন্দ। বিক্ষেপ বিক্ষেপকৃত জ্ঞানের চ্যুতিতে পরমাত্মা হইলেন আনন্দময় সৎ। হ ধ্বনি সৃষ্টি বিকাশচ্ছন্দে দ্বিগুণিত হইলে তাহার বিকাশ হইল উঁকার এবং হুঁকার ধ্বনিতে এবং তাহার ভাব হইল চিদানন্দ। পরমাত্মা চিদানন্দ দ্বারা উপস্থিত হইয়া হইলেন সচ্চিদানন্দ। এই উঁকার ও হুঁকার দ্বিগুণ হইয়া হইবে উঁ হুঁ, অ এবং হ। হুঁ উঁকার আছে এবং হ কারে অ কার আছে বলিয়া এই ধ্বনি চতুষ্টয়ের মৌলিক রূপ হইল অ উ হ্‌ ম। পরমাত্মার সৎ স্বরূপ, আনন্দস্বরূপ ও চিৎস্বরূপ দ্বারা পরমাত্মায় কোন ভেদ সৃষ্টি হয় নাই। কিন্তু অ উ হম্‌ বিক্ষেপাত্মক হ কার সৃষ্টি বিকাশের ছন্দে আত্মপ্রকাশ করায় তৎস্বরূপ সৎস্বরূপে আপনি আপনা হইতে উদ্গত হইলেন। তাঁহার অন্তরস্ত অহরূপ প্রজাপতি অহং জ্ঞান বিশিষ্ট বহু জীব রূপে আত্মপ্রকাশ করিলেন এবং বাকী ওঁম জ্ঞান (অ+উঁম্‌) দ্বারা জীবজগতের সঙ্গে স্থূল সূক্ষ্ম কারণ সত্তারূপে বর্ত্তমান থাকিয়া নাদবিন্দু (ঁ) লক্ষিত প্রপঞ্চোপশান্ত শান্ত শিবাদ্বৈতরূপে প্রতিষ্ঠ হইলেন। ইনিই আদি পুরুষ হিরণ্যগর্ভ, সত্যব্রহ্ম, প্রথমজ প্রভৃতিরূপে অভিহিত হইয়াছেন। তাঁহার অহ প্রকৃতি প্রজাপতি ধ্বনির অষ্টধা বিকাশ ‘অ’, ‘ই’, ‘উ’, ‘ঋ’, ‘৯’, ‘এ’, ‘ও’, এবং ‘অং’ (অনুস্বার) (সৃষ্টি ছন্দক্রমে অ উ হ ম এই চতুষ্টয়ের দ্বিগুণ ভাব প্রকাশ) আশ্রয় করিয়া সৃষ্টি করিলেন প্রকৃতি, বুদ্ধি, অহংকার, ব্যোম, মরুৎ, তেজ, আপ ও ক্ষিতি এই অষ্ট শক্তি।
শ্রীসুধীররঞ্জন সেনগুপ্তের ‘ঔপনিষদিক সাধন রহস্য’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ