স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতে প্রত্যাবর্তন করে একাধিক বক্তৃতায় বলেছেন, “আগামী পঞ্চাশ বছর ভারতই তোমাদের উপাস্য দেবতা হোন।” নিবেদিতার কাছে তাই ভারত ছিল উপাস্য দেবতা। তাছাড়া তাঁর কাছে ভারতই ছিল পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দেশ, কারণ তিনি বলতেন, “একমাত্র ভারতই হল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্মমতসমূহের জন্মদাত্রী।” সুতরাং সেই দেশের উপর কোনও বিদেশির আধিপত্য তাঁর কাছে ছিল অসহ্য।
পরাধীন ভারতের সশস্ত্র সংগ্রামে অধিকার ছিল না। স্বাধীনতালাভের জন্য বহু যুবক দল গড়ে গোপনে অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করে সংগ্রামের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করত। এই উদ্দেশ্য বহু গুপ্ত সমিতিও গঠিত হয়েছিল। শ্রীঅরবিন্দ এইরকম এক গুপ্ত সমিতির নেতা ছিলেন। নিবেদিতার সঙ্গে এইসকল গুপ্ত সভাসমিতির যোগাযোগ ছিল। তিনি নানা পুস্তকাদি সংগ্রহ করে দিতেন এবং যুবকগণের কাছে জ্বলন্ত ভাষায় স্বাধীনতার আদর্শ ও স্বামী বিবেকানন্দের বাণী প্রচার করতেন। গীতা ব্যাখ্যা করে বলতেন, ন্যায়ের জন্য যুদ্ধ করা সঙ্গত ও প্রয়োজন। শ্রীঅরবিন্দের সঙ্গে তাঁর বিশেষ বন্ধুত্ব ছিল এবং বহুভাবে তাঁকে সাহায্য করেছেন। কিন্তু তিনি যে বিপ্লবীদলের একজন নেত্রী ছিলেন এবং বিপ্লবীগণকে পরিচালনা করতেন, তা এখনও প্রমাণিত হয়নি। অনেকেই অনুমানের উপর নির্ভর করে এই সম্বন্ধে নানা কথা বলে থাকেন। সম্পূর্ণভাবে বিপ্লবের সঙ্গে যুক্ত থাকলে তাঁর পক্ষে অন্য কিছু করা সম্ভব হতো না। কিন্তু পূর্বেই বলেছি, দেশের উন্নতির জন্য তিনি যে নানারকম কাজ করেছেন তার সম্পূর্ণ বিবরণ দেওয়া সম্ভব নয়। দেশের মুক্তিলাভের উদ্দেশ্যে কংগ্রেস বা জাতীয় মহাসভা আবেদন- নিবেদনের মাধ্যমে যে চেষ্টা করতেন তাতেও নিবেদিতার সাহায্য ছিল। আবার ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ উপলক্ষ্যে যে স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলন গড়ে ওঠে, তাতেও তাঁর পূর্ণ সহযোগিতা ছিল। তাঁর একান্ত আকাঙ্ক্ষা ছিল, এই আন্দোলন জয়যুক্ত হোক, ভারতে বিদেশি শাসনের অবসান ঘটুক। স্বাধীন ভারতের চিন্তায় বিভোর নিবেদিতা তাঁর বিদ্যালয়ের ছাত্রীগণকে দিয়ে কাপড়ের উপর নকশা তুলে ভারতের জাতীয় পতাকা তৈরি করিয়েছিলেন। গাঢ় রক্তবর্ণের জমির উপর সোনালি সুতোয় বজ্র ও তার দুপাশে লেখা ‘বন্দে মাতরম্’।
নিবেদিতা বলতেন, “আমরা আশা করব না, নিরাশও হব না। আমরা দৃঢ়নিশ্চয়—আমরা অগ্রগামী মরিয়া দল। আমরা নিজেদের শরীর দিয়ে সেতু প্রস্তুত করব, পরবর্তী সৈন্যদল সেই সেতুর উপর দিয়ে পার হয়ে যাবে।” বস্তুত তিনি সর্বপ্রকারে নিজেকে ভারতের সেবায় নিবেদন করে গুরু-দত্ত নাম সার্থক করে গেছেন।
নিবেদিতা সাধারণত নিজেকে শিক্ষয়িত্রী বলে পরিচয় দিতেন। জীবনের প্রারম্ভে তাঁর আদর্শ ছিল শিক্ষাকার্যে আত্মনিয়োগ। স্বামীজীর সঙ্গে সাক্ষাতের ফলে তাঁর জীবনের গতি পরিবর্তিত হয়।


