Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শ্রুতি..

ঈশ উপনিষদ পূর্ণযোগ-তত্ত্ব ও পূর্ণ আধ্যাত্মসিদ্ধি-পরিচায়ক, অল্পেতে বহু সমস্যা সমাধানকারী, অতি মহৎ অতল গভীর অর্থে পরিপূর্ণ শ্রুতি।

শ্রুতি..
  • ২০ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ঈশ উপনিষদ পূর্ণযোগ-তত্ত্ব ও পূর্ণ আধ্যাত্মসিদ্ধি-পরিচায়ক, অল্পেতে বহু সমস্যা সমাধানকারী, অতি মহৎ অতল গভীর অর্থে পরিপূর্ণ শ্রুতি। আঠার শ্লোকে সমাপ্ত কয়েকটি ক্ষুদ্রাকার মন্ত্রে জগতের ততোধিক মুখ্য সত্য ব্যাখ্যাত। এইরূপ ক্ষুদ্র পরিসরে অনন্ত অমূল্য সম্পত্তি—infinite reaches in a little room—শ্রুতিতেই পাওয়া যায়।

Advertisement

সমন্বয়-জ্ঞান সমন্বয়-ধর্ম্ম, বিপরীতের মিলন ও একীকরণ এই উপনিষদের প্রাণ। পাশ্চাত্য দর্শনে একটি নিয়ম আছে যাহাকে Law of contradiction বলে, বিপরীতের পরস্পর বহিষ্করণ বলা যায়। দুইটি বিপরীত সিদ্ধান্ত একসঙ্গে টিকিতে পারে না, মিলিত হইতে পারে না, দুইটি বিপরীত গুণ এক সময়ে এক স্থানে এক আধারে এক বস্তুর সম্বন্ধে যুগপৎ সত্য হইতে পারে না। এই নিয়ম অনুসারে বিপরীতের মিলন ও একীকরণ হইতেই পারে না। ভগবান যদি এক হন, তিনি হাজার সর্ব্বশক্তিমান হউন বহু হইতে পারে না। অনন্ত কখন সান্ত হয় না। অরূপের রূপ হওয়া অসাধ্য, সে সরূপ হইলে তাহার অরূপত্ব বিনষ্ট হয়। ব্রহ্ম যে এক সময়ই নির্গুণ ও সগুণ, উপনিষদ যেমন ভগবানের সম্বন্ধে বলে যে তিনি “নির্গুণো গুণী”, এই সিদ্ধান্তকেও এই যুক্তি উড়াইয়া দেয়। ব্রহ্মর নির্গুণত্ব, অরূপত্ব, একত্ব, অনন্তত্ব যদি সত্য হয়, তাহার সগুণত্ব, সরূপত্ব, বহুত্ব, সান্ততা মিথ্যা, “ব্রহ্ম সত্যং জগন্মিথ্যা” মায়াবাদীর এই সর্ব্বধ্বংসী সিদ্ধান্ত এই দার্শনিক নিয়মের চরম পরিণতি। ঈশ উপনিষদের দ্রষ্টা ঋষি প্রতিপদে এই নিয়মকে দলন করিয়া প্রতি শ্লোকে তাহার যেন অসারত্ব ঘোষণা করিয়া বৈপরীত্যের মধ্যে বিপরীত তত্ত্বের গুপ্ত হৃদয়ে মিলন ও একীকরণের স্থান বাহির করিয়া চলিতেছেন। গতিশীল জগৎ ও স্থাণু পুরুষের একত্ব, পূর্ণ ত্যাগে পূর্ণ ভোগ, পূর্ণ কর্ম্মে সনাতন মুক্তি, ব্রহ্মের গতির মধ্যেই চিরস্থাণুত্ব, চিরন্তন স্থাণুত্বে অবাধ অচিন্ত্য গতি, অক্ষর ব্রহ্ম অ ক্ষর জগতের একত্ব, নির্গুণ ব্রহ্ম ও সগুণ বিশ্বপুরুষের একত্ব, যেমন অবিদ্যায় তেমন বিদ্যায় পরম অমরত্ব লাভের অভাব, যুগপৎ বিদ্যা অবিদ্যা সেবনে অমরত্ব, জন্মচক্রঘুরণেও নয়, জন্মবিনাশেও নয়, যুগপৎ সম্ভুতি ও অসম্ভুতির সিদ্ধিতে পরম মুক্তি ও পরম সিদ্ধি, এইগুলিই উপনিষদের উচ্চকণ্ঠে প্রচারিত মহাতথ্য।
দুর্ভাগ্যবশতঃ উপনিষদের অর্থ লইয়া অনর্থক গোল করা হইয়াছে। শঙ্করাচার্য্য উপনিষদের প্রধান প্রায়ই সর্ব্বজনস্বীকৃত টীকাকার, কিন্তু এই সকল সিদ্ধান্ত যদি গৃহীত হয়, শঙ্করের মায়াবাদ অতল জলে ডুবিয়া যায়। মায়াবাদের প্রতিষ্ঠাতা দার্শনিকদের মধ্যে অতুল্য অপরিমেয় শক্তিশালী। 
শ্রীঅরবিন্দের ‘বিবিধ রচনা’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ