সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, বারুইপুর: ভোর হয়েছে। আকাশ হয়েছে লাল। বারুইপুরের শালেপুরে এ সময় সূর্য দেখার আগে ঘুম ভাঙে জং ধরা সাইকেলের চেনের খড়খড় শব্দে। সে সাইকেলে অমিত চলেছে কাগজের বান্ডিল হাতে। এরপর বাড়ি ফিরবে। নাকেমুখে গুঁজে এক ছুটে স্কুল। এবছর উচ্চ ম্যধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছেন অমিত মল্লিক।
রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন অমিতের বাবা অশোককুমার। একদিন কাজ করতে করতে উঁচু থেকে পড়ে চোট পান। তারপর থেকে বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। রোজগেরে মানুষটির এই দশার পর সংসারে প্রবল অনটন। অমিতের মা মণিকা মল্লিক লোকের বাড়ি রান্নার কাজ শুরু করেন। তবে তা দিয়েও চলছিল না। অমিত তখন সবে মাধ্যমিক দিয়েছে। পেটের ভাত জোগাড় করতে শুরু করল দুধ বিক্রি। কিন্তু মালিক মাইনের পুরো টাকা দিল না। ফলে তা ছেড়ে কাগজ বিক্রি শুরু। মাসে দেড় হাজার মাইনে। এখন মাইনেটা সময়েই পান। মালিক লোক ভালো। অমিতকে স্নেহ করেন।
মা-বাবার চিরকালই ইচ্ছে ভালো করে পড়াশোনা করুক ছেলে। মানুষের মতো মানুষ হোক। তবে বাবার দুর্ঘটনা সবকিছু থমকে দিত যদি না ছেলেটি জেদি, পড়ুয়া ও মনযোগী হতো। সকাল থেকে এ পাড়া ও পাড়া ঘুরে কাগজ বিক্রিতে হাড়ভাঙা পরিশ্রম। তারপরও লেখাপড়া ছাড়েনি। দিনে পড়ে। স্কুলে যায়। সন্ধ্যায় পড়ে। কম ঘুমোয় কারণ রাতেও পড়তে হয়।
তাঁদের বাড়ি বারুইপুরের হরিহরপুর পঞ্চায়েতের শালেপুর ঘোষপাড়ায়। মদারাট পপুলার অ্যাকাডেমি স্কুলে পড়েন অমিত। প্রতিদিন কাকভোরে সাইকেল চালিয়ে বারুইপুর স্টেশনে যান। মালিক শান্তিলাল ঘোষের কাছ থেকে নেন বিক্রির জন্য কাগজ। তারপর বাড়ি বাড়ি ঘুরে ফেরি। শান্তিলাল বলেন, ‘এই শক্ত পরীক্ষা দেওয়ার মাঝেও দায়িত্বে অবিচল। ছেলেটি বেশি ভালো।’
অমিতদের ভাড়া বাড়িতে আসবেস্টসের ছাদ। দু’টি ঘর। ওর অধ্যাবসায় দেখে খুশি হয়ে এক ক্রেতা সাইকেলটি উপহার দিয়েছিলেন। ভালো রেজাল্ট করে বিএ পাশ করে সরকারি চাকরির পরীক্ষায় বসার ইচ্ছে পরিশ্রমী ছেলেটির। বিক্রির ফাঁকে সব কাগজের হেডলাইন পড়ে একবার নেন। পরে মন দিয়ে পড়েন গোটা কাগজ। শান্তিলালবাবুর মতোই পাড়ার সবাই বলেন, ‘ছেলেটি ভালো। ওর ব্যবহার মুগ্ধ করে।’ সবাই খুশি হয়ে পুজোর সময় টাকা ইত্যাদি উপহার দেন। অমিত বলেন, ‘যেদিন পরীক্ষা থাকে না সেদিন বেলা পর্যন্ত কাগজ বিক্রি করি। পরীক্ষার দিন তাড়াতাড়ি ফিরে আসি। মালিক সাহায্য করেন খুব। শিক্ষকরা পড়াশোনার সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।’
উচ্চশিক্ষার জন্য তৈরি হতে থাকা ছেলেটির সব দিকে নজর। জানালেন, দৈনিক প্রায় ৫০টি ‘বর্তমান’ বিক্রি করেন। বাদবাকি কাগজ সবমিলিয়ে বিক্রি হয় ৪০টির মতো। নিজস্ব চিত্র