


মৃণালকান্তি দাস: ইরান পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হয়ে ওঠার দ্রুত চেষ্টা চালাচ্ছে— এই অভিযোগ ছিল স্রেফ অজুহাত!
আর সেই অজুহাতে ইজরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে তেহরানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে আমেরিকা। খামেনেইকে ‘শয়তান’ বলা, ধর্মযুদ্ধের রং লাগানো, ট্রাম্পের গায়ে-মাথায় যাজকদের ফুঁ দেওয়া— এ সবই লোক দেখানো। হোয়াইট হাউসের আসল ধান্দা ইরানের তেল ভাণ্ডার দখল করা। যে কথা ফাঁস করে দিয়েছেন খোদ মার্কিন রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। বলেছেন, ‘ভেনেজুয়েলা ও ইরানের কাছে বিশ্বের প্রায় ৩১ শতাংশ তেল মজুত রয়েছে। আমরা দ্রুত সেই ৩১ শতাংশের অংশীদার হব। এর জন্য যুদ্ধ খুব ভালো বিনিয়োগ। এটা চীনের জন্য দুঃস্বপ্ন।’
জুন, ২০২৫-এ হয়েছিল ১২ দিনের যুদ্ধ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, তিনি ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে একেবার ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দিয়েছেন। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও ঘোষণা করেছিলেন তাঁরা ‘ঐতিহাসিক জয়’ পেয়েছেন। তাহলে আট মাসের মধ্যে তাঁদের আরও একটা যুদ্ধ শুরু করতে হল কেন? শাহের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে ১৯৭৯ সালে মোল্লাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা বা ১৯৮৩ সালে বেইরুটে ইরানের আক্রমণে ২৪১ জন মার্কিন ‘মেরিন’ বা সেনার খতমের পর থেকেই তো আমেরিকার কাছে ইরান হয়ে উঠেছে বিপজ্জনক। দু’বছর আগের ইরান যা ছিল, আজও তো তাই। তার মধ্যে নাটকীয় কিছু পরিবর্তনও হয়নি। যেমন পরিবর্তন হয়নি ইরানের বিপুল তেলের ভাণ্ডারের প্রতি লোভও।
তাই তো লিন্ডসে গ্রাহাম বলেছেন, যুদ্ধ আসলে ভালো বিনিয়োগ! যে যুদ্ধে ইরানের সব কিছু লন্ডভন্ড করে, একটি জাতিকে পঙ্গু করে দিয়ে দেশটির মজুত তেল কেড়েকুড়ে নিতে না পারলে মুনাফা আসবে কী করে! এর জন্য গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার বয়ান, কট্টরপন্থা-সন্ত্রাসবাদ বিনাশের নামে পশ্চিমের সংবাদমাধ্যমকে প্রচারে নামিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু গ্রাহামের ওই বক্তব্যের পর ইরানে হামলাকে আর যুদ্ধ কী করে বলবেন? এটি নির্ভেজাল আগ্রাসন ছাড়া আর কী হতে পারে! বিপুল বিনিয়োগে যুদ্ধের নামে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ইরানের পতন ঘটানো যেখানে লক্ষ্য, সেখানে যুদ্ধের নৈতিকতা আর ধোপে টেকে না। তড়িঘড়ি একটা বিজয় ঘোষণা করে ইরানে ‘পুতুল সরকার’ বসিয়ে তেলের ভাণ্ডারে ভাগ বসানোর বড়ো আশা ছিল ট্রাম্পের। তবে দু’সপ্তাহ পরও তা অধরা থেকে গিয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে, হোয়াইট হাউসে যাজক দল আনিয়ে ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের বিজয়ের জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে। গোটা দুনিয়াকে ক্যামেরায় দেখানো হয়েছে সেই দৃশ্য।
ওমানের বিদেশমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল বুসাইদি, যিনি আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে আলোচনার মধ্যস্থতা করছিলেন, তিনি ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি মার্কিন চ্যানেলকে জানান, দু’পক্ষের মধ্যে চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত। ইরান কথা দিয়েছে তারা ‘কখনো’ পরমাণু বোমা তৈরির চেষ্টা করবে না। এবং পারমাণবিক উপকরণ মজুতও করবে না। এর ঠিক পরদিন আমেরিকা ও ইজরায়েল ইরানে বোমাবর্ষণ শুরু করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে আক্রমণ শানায় মার্কিন ফৌজ। প্রথম আঘাতেই ইরানের শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইকে হত্যা করে তারা। পাশাপাশি, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলায় মৃত্যু হয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ্ এবং সেনাপ্রধান আব্দুল রহিম মৌসাভির। পাশাপাশি দক্ষিণ ইরানের মিনাবে মেয়েদের প্রাথমিক স্কুলবাড়ি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে শতাধিক শিশু-সহ অন্তত ১৭৫ জন নিরীহ মানুষের হত্যার পরেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্লজ্জের মতো মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বলতে পারেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে স্কুলে আছড়ে পড়েছে। অথচ সেই ক্ষেপণাস্ত্র আমেরিকার তৈরি টোমাহক এবং যা ইরানের কাছে থাকার কথাই নয়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইকে হত্যা করা শুধু একটি সামরিক আঘাত নয়। এটা রাষ্ট্রের মাথায় আঘাত। একে ‘ডেক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ বা ‘লিডারশিপ টার্গেটিং’ বলা যেতে পারে। শব্দ বদলালেও বাস্তবতা বদলায় না। এখানে আমেরিকা ও ইজরায়েল বলেছে, বড়ো নিরাপত্তা–হুমকি ঠেকাতে হবে, প্রতিরোধ ফিরিয়ে আনতে হবে। কিন্তু বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যায়, লক্ষ্য শুধু ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি বা সামরিক ঘাঁটি নয়, লক্ষ্য ক্ষমতার কেন্দ্রও।
একের পর এক এমন নৃশংস হামলা চালিয়ে শিয়া মুলুকটির ইসলামীয় প্রজাতন্ত্রের পতন শুধু সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে করেছিল ওয়াশিংটন। তাই আলি খামেনেই-সহ ইরানি শীর্ষ নেতৃত্বের মৃত্যুর খবর আসতেই সুর চড়িয়েছিলেন ট্রাম্প। বলেছিলেন, ‘আগামী এক সপ্তাহ লাগাতার বোমাবর্ষণ করবে মার্কিন বিমানবাহিনী।’ তার মধ্যেই ইরানের ক্ষমতার পালাবদল সম্পূর্ণ হবে বলে একরকম নিশ্চিত ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্পের ওই মন্তব্যের পর বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করে একাধিক পশ্চিমি গণমাধ্যম। সেখানে বলা হয়, কুর্সি বদলে তেহরানের শাসনভার কে নেবেন, তা নাকি বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই ছকে রেখেছে মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানিদের উদ্দেশে আর্জি জানান, ‘নিজেদের দেশের সরকার দখল করুন। কয়েক প্রজন্মের মধ্যে এটা আপনাদের কাছে শাসক বদলের একমাত্র সুযোগ।’ অন্যদিকে, ইজরায়েল জানায়, এই হামলা আসলে ‘আগাম প্রতিরোধমূলক’ যুদ্ধ। যাতে রাষ্ট্র হিসাবে ইজরায়েলের ‘অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে না পড়ে’। যেভাবে শুরু থেকে ইরানকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য ভয়ংকর হামলা চালানো হয়েছে এবং ট্রাম্প-নেতানিয়াহু যে সব বার্তা ছড়িয়েছেন, তাতে একথা স্পষ্ট— আগ্রাসী এই দুই শক্তি তেহরানের শুধু শাসক বদলই চায়নি, তাদের চাই ইরান ভূখণ্ডের দখলদারি। ইরানের ‘তরল সোনা’।
২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইরানে প্রায় ২০৯ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ মজুত নিয়ে ইরান এখনও বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেলসমৃদ্ধ দেশ। ইরানের এই তেলের মজুত বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ১২ শতাংশের সমান। সেই দিকেই নজর ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের। প্রভাবশালী রক্ষণশীল মার্কিন সেনেটর গ্রাহাম সেটা গোটা দুনিয়াকে জানিয়েছেন ইরানে আগ্রাসনের ১০ দিনের মাথায়। বলেছেন, খামেনেই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে অর্থলগ্নি করা সার্থক বিনিয়োগ হবে। এই লিন্ডসে গ্রাহাম ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ‘জিগরি বন্ধু’। অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনে তাঁদের দু’জনের নেশা আফিমের আসক্তির চেয়েও ভয়ংকর। দেশে দেশে স্বার্থের প্রয়োজনে, তেল-গ্যাস লুটের জন্য মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের দীর্ঘদিনের সমর্থকও গ্রাহাম। মার্কিন বিশ্লেষকরা তাঁকে বলেন মধ্যপ্রাচ্যে ‘যুদ্ধের ঢোলবাদক’।
ইরানে হামলা চালানোর কয়েক সপ্তাহ আগে লিন্ডসে গ্রাহাম বেশ কয়েকবার ইজরায়েল সফর করেন। সেখানে তিনি ইজরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন। গ্রাহাম বলেন, ‘আমার নিজের প্রশাসন আমাকে যা জানায় না, মোসাদ আমাকে সেসব তথ্য দেয়।’ দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সফরের সময় গ্রাহাম ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গেও কথা বলেন। কীভাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে যুদ্ধের জন্য রাজি করানো যায়, সেই বিষয়ে তিনি নেতানিয়াহুকে পরামর্শ দেন। এরপর নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে এমন কিছু গোয়েন্দা তথ্য দেখান, যা তাঁকে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ যুদ্ধ শুরু করতে ‘প্ররোচিত’ করেছে।
গত মাসে সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমনকে এই যুদ্ধে রাজি করানোর জন্য তিনি রিয়াধ সফরও করেছিলেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গ্রাহাম নিজেই তাঁর সফরের উদ্দেশ্য নিশ্চিত করেন। গ্রাহাম সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং সৌদি আরবকে ইরানের উপর হামলা চালানোর আহ্বান জানান। বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি চাই তারাও এই লড়াইয়ে যোগ দিক। কারণ, আমরা তাদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করি।’ কিন্তু তাতে সাড়া না মেলায় লিন্ডসে গ্রাহাম প্রশ্ন তোলেন, ‘যে দেশ পারস্পরিক স্বার্থের লড়াইয়ে যোগ দিতে অনিচ্ছুক, তাদের সঙ্গে আমেরিকার কি আর কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি করা উচিত?’ উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) দেশগুলিকে হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘আশা করি দ্রুতই আপনাদের অবস্থানের পরিবর্তন হবে। তা না হলে এর পরিণাম ভোগ করতে হবে।’
আমেরিকানরা নন, যুদ্ধ চান নেতানিয়াহু
ট্রাম্পের যেমন তেলের ঘ্রাণ ভালো লাগে, তেমনই নেতানিয়াহুর ভালো লাগে ইহুদিদের জন্য আরও একখণ্ড ভূমি। দু’টিই জাতীয়তাবাদ, দু’টিই আগ্রাসী হয়ে এসেছে ইরানের জন্য। যদি ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায়, তাহলে আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাবে এবং একটা একমেরু পশ্চিম এশিয়া গড়ে ওঠার পথ সুগম হবে। ওয়াশিংটনের পূর্ণ মদতে মধ্যপ্রাচ্যের নেতা হয়ে উঠবে ইজরায়েল। এখানে ইরানিদের স্বাধীনতা পাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল এখানকার ভূরাজনীতি এবং ইজরায়েলের নিজেদের স্বার্থ।
নিউ ইয়র্ক টাইমস জানাচ্ছে, এই যুদ্ধে পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। তাঁর যুক্তি ছিল, সামরিক হামলাই ইরানকে চিরতরে শেষ করার একমাত্র যৌক্তিক পথ। প্রথমে ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোতে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ক্লাবে এবং পরে হোয়াইট হাউসে তাঁর সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনায় সে কথা ট্রাম্পকে বোঝাতে সক্ষম হন নেতানিয়াহু। তাঁর আবদার ছিল, একা ইজরায়েল নয়, আমেরিকাকেও এই হামলায় অংশ নিতে হবে। তাঁর অনুরোধে হামলার তারিখটাও জানুয়ারি থেকে পিছিয়ে ফেব্রুয়ারিতে আনা হয়। কারণ, ইরানের পাল্টা ড্রোন হামলা ঠেকাতে যে পরিমাণ ‘ইন্টারসেপ্টারের’ প্রয়োজন, তা তাদের অস্ত্রাগারে মজুত ছিল না। ট্রাম্প সে কথা মেনে নেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস জানাচ্ছে, নেতানিয়াহুই ট্রাম্পকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেন। সেটা ছিল তাঁর জন্য বিরাট সাফল্য।
ইজরায়েল ও আমেরিকার কৌশলগত স্বার্থ যে এক সুতোয় গাঁথা, তা নতুন কোনো কথা নয়। অনেক ক্ষেত্রেই বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে, মার্কিন কূটনীতি ও রণনীতি বাস্তবায়নে চালকের আসনটি ইজরায়েলের। এই নিয়ে বিস্তর লিখেছেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন মিয়ার্শহাইমার। ২০০৭ সালে অধ্যাপক স্টিফেন ওয়াল্টের সঙ্গে যৌথভাবে লিখিত ইজরায়েল লবি ও মার্কিন বিদেশনীতি গ্রন্থে খোলামেলাভাবেই তিনি বলেছেন, আমেরিকায় ইজরায়েল লবির প্রভাব এত প্রবল যে, অনেক সময় মার্কিন স্বার্থের বদলে ইজরায়েলের স্বার্থকে সামনে রেখে নীতিনির্ধারণ করা হয়। ইরানের ক্ষেত্রেও তা–ই ঘটেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইজরায়েল তার সবচেয়ে বড়ো প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে ইরানকে। উপসাগরের বাকি অধিকাংশ দেশ ইতিমধ্যে ইজরায়েলের সঙ্গে বন্ধুত্বে আবদ্ধ।
সৌদি আরবসহ আজকের আরব বিশ্বের প্রায় সব দেশে যে শাসকরা রয়েছেন, তাঁদের পূর্বসূরিরা নিজেদের নিরঙ্কুশ শক্তিতে ক্ষমতায় বসেননি। তাঁদের ব্রিটিশ-আমেরিকান শক্তিগুলি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আনুগত্যের বিনিময়ে গদিতে বসিয়েছিল। আনুগত্যের সেই লিগ্যাসি এসব আরব নেতাদের মধ্যে এখনও প্রবলভাবে রয়ে গিয়েছে। এই কারণে তাঁরা আমেরিকা ও ইজরায়েলের বিরুদ্ধে কখনো মুখ খোলেন না। বাস্তবতা হল, সৌদি আরবের শাসকদের গদির নিরাপত্তা এখনও আমেরিকার উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এটাই পশ্চিমিরা কাজে লাগাচ্ছে। ওয়াশিংটন চায় সৌদি-ইজরায়েল সম্পর্ক খোলাখুলিভাবে স্বাভাবিক হোক। এতে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানবিরোধী আঞ্চলিক জোট শক্তিশালী করা যাবে। আর সৌদি আরবও ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নকে নিজের নিরাপত্তার জন্য সহায়ক মনে করছে। এর জন্য সৌদি সরকার সবকিছুই করতে রাজি আছে।
একটা সময় ছিল যখন সৌদি বাদশা ফয়সাল প্যালেস্তিনীয়দের অধিকার প্রশ্নে সোচ্চার ছিলেন। প্যালেস্তিনীয়দের পক্ষ নিতে গিয়ে তিনি আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে প্রবল শত্রুতায় জড়িয়েছিলেন। ভাইপোর গুলিতে বাদশা ফয়সালের নিহত হওয়ার পিছনে সিআইএ-মোসাদের হাত ছিল বলেও শোনা যায়। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সৌদি রাজপরিবারে শাসকের বদল হয়েছে। সৌদি নীতিতেও বড়ো পরিবর্তন এসেছে। নীতির দিক থেকে নজিরবিহীন পরিবর্তন এনেছেন আজকের সৌদি বাদশা সলমনের ছেলে মহম্মদ বিন সলমন। সংক্ষেপে অনেকে তাঁকে ‘এমবিএস’ বলেন। তিনি সৌদি আরবকে ‘আধুনিক’ প্রমাণে একরকম মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এমবিএস মনে করেন, সৌদি আরবকে আরব বিশ্বের বাইরে, পশ্চিমের বিশ্বেও প্রভাব রাখতে হবে। পশ্চিমের ভাবধারায় তাল মেলাতে হবে।
ক্রিস্টিস নামে একটি নিলামকারী প্রতিষ্ঠান ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর নিউ ইয়র্কে ‘সালভাতর মুন্ডি’ নামে একটি পেন্টিং নিলামে বিক্রি করেছিল। এটি যিশু খ্রিস্টের ছবি। এই যিশুর চেহারার সঙ্গে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসার অনেক মিল আছে। ছবিটি নিলামে ৪৫০.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়। আজ পর্যন্ত এত দামে কোনো পেন্টিং বিক্রি হয়নি। আর এত দাম দিয়ে এই ছবিটি কিনে নেন মহম্মদ বিন সলমন। বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, ‘সালভাতর মুন্ডি’ এত দাম দিয়ে কেনাটা শুধুমাত্র একটি শিল্প বিনিয়োগ নয়, এটি এমবিএসের আন্তর্জাতিক, আধুনিক ও আংশিকভাবে পশ্চিমি ভাবধারার প্রতীকী প্রকাশ। যিশুর ছবি কেনার মধ্যে দিয়ে তিনি খ্রিস্টিয়ানিটির প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা দিয়েছেন বলেও ধারণা করা হয়। তিনি সৌদি অর্থনীতিকে তেল নির্ভরতা থেকে বের করে আনতে চান। সেখানে বিশ্বমানের শিল্প, প্রযুক্তি ক্ষেত্র যোগ করতে চান। সৌদি এখন ইজরায়েলকে সম্ভাব্য কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখছে। ইজরায়েলের প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, কৃষি, সাইবার নিরাপত্তা ও উদ্ভাবনী ক্ষেত্র বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ে, তাই সৌদি আরব মনে করছে, ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে এই প্রযুক্তিগত ও বিনিয়োগ সুযোগগুলি কাজে লাগিয়ে সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ প্রকল্প ত্বরান্বিত করা যাবে।
২০১৮ সালের মার্চে আমেরিকার সিবিএস টেলিভিশনের প্রোগ্রাম সিক্সটি মিনিটস-এ সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় উপস্থাপক নোরা ও’ডোনেল বিন সলমনকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনি যে সংস্কারের পথে হাঁটছেন, তা থেকে কেউ কি আপনাকে থামাতে পারবে?’ জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘একমাত্র মৃত্যু আমাকে থামাতে পারে।’ এমবিএস মনে করেন, ইজরায়েলের বিরোধিতা করলে পশ্চিমের দিক থেকে যে চাপ আসবে তা তাঁর ভিশন-২০৩০-কে বাধাগ্রস্ত করবে। ফলে প্যালেস্তাইন, ইরান নিয়ে তিনি কোনো উচ্চবাচ্য করতে চান না। ২০২২ সালে দ্য আটলান্টিক পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমবিএস বলেন, ‘আমরা ইজরায়েলকে আর শত্রু হিসেবে দেখি না। আমরা দেশটিকে এখন সম্ভাব্য মিত্র হিসেবে দেখি।’ সৌদি আরব, ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য এমবিএস ইতিমধ্যেই কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। যেমন: ইজরায়েলি বিমানগুলিকে সৌদি আকাশসীমা ব্যবহার করতে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। নেতানিয়াহু যে ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ গড়ার ঘোষণা করেছেন, তাতে দৃশ্যত সৌদি সরকারের আপত্তি নেই। আর সৌদির আপত্তি না থাকলে আরব জাহানের বাকি শাসকদের আপত্তি জানানো কঠিন।
মার্কিন টিভি উপস্থাপক টাকার কার্লসন সম্প্রতি ইজরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবির সাক্ষাৎকার নেন। সেখানে হাকাবি বলেছেন, বাইবেলে ইহুদিদের জমি ঠিক করাই আছে। তাদের জন্য প্রতিশ্রুত ভূমি রয়েছে। সেই কারণে ইজরায়েল যদি মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সীমানা বাড়ায়, এমনকি গোটা মধ্যপ্রাচ্য দখলে নিয়ে নেয়, তা হলেও তো ভালোই হয়। আসলে কার্লসন-হাকাবি সাক্ষাৎকার কেবল এক রাষ্ট্রদূতের দৃষ্টিভঙ্গি নয়, এটি এক বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রকল্পের ইঙ্গিত। সেই প্রকল্পের পথে সবচেয়ে বড়ো বাধা এখন ইরান। এই বাধা ইজরায়েলকে সরাতেই হবে। ইরানকে কবজা করা গেলে এই অঞ্চলে তার আধিপত্য চ্যালেঞ্জ করার মতো কেউ থাকবে না।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন মিয়ার্শহাইমারের কথায়, ‘ইরান বা আমেরিকা কেউই এই যুদ্ধ চায় না, যুদ্ধ চায় ইজরায়েল ও তার প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু।’ ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নিজেই সেটি স্বীকার করেছেন। বলেছেন, ‘এই যৌথ অভিযান আমাকে সেই লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ দিয়েছে, যার জন্য আমি ৪০ বছর ধরে অপেক্ষা করছি। সেই লক্ষ্য হল সন্ত্রাসবাদী শাসনব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করা।’ আর ট্রাম্প বলছেন, ইরানকে পরাজিত করা গেলে মধ্যপ্রাচ্য সম্পূর্ণ বদলে যাবে। এসব বক্তব্য বহুদিনের একটি ধারণার পুনরাবৃত্তি— মধ্যপ্রাচ্যকে নতুনভাবে সাজানোর স্বপ্ন। এই ধারণা আমেরিকার নব্য রক্ষণশীল নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। ২০০৬ সালে মার্কিন বিদেশসচিব কন্ডোলিজা রাইস বলেছিলেন, নতুন মধ্যপ্রাচ্যের জন্মের আগে অঞ্চলটিকে কিছু ‘যন্ত্রণাদায়ক প্রসববেদনা’ সহ্য করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই পরিকল্পনা দ্রুতই ব্যর্থ হয়েছিল!
ইরানের প্রত্যাঘাত
ইরান যুদ্ধের সূচনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শরীরী ভাষায় যেন ঝরে পড়েছিল আত্মবিশ্বাস! প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ট্রাম্পের ‘সেক্রেটারি অব ওয়ার’ পিট হেগসেথের মন্তব্য: আইনি মারপ্যাঁচ নয়, চূড়ান্ত আঘাত। রাজনৈতিক শিষ্টাচার নয়, বিধ্বংসী প্রভাব। তাই ন্যায় নীতি, কূটনৈতিক শিষ্টাচারের তোয়াক্কা না করে ট্রাম্প প্রশাসনের চূড়ান্ত আগ্রাসী মনোভাবই ফুটে বেরচ্ছে তাঁর প্রতিটি আচরণে। যেকোনো যুদ্ধে নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করার সুস্পষ্ট নির্দেশিকা রয়েছে। কিন্তু হেগসেথ সেগুলিকে স্রেফ ‘স্টুপিড রুল্স অব এনগেজমেন্ট’ বলে ব্যঙ্গ করছেন। ইরানে প্রাণহানি ও ধ্বংস নিয়ে পেন্টাগনে চলছে বিকৃত উল্লাস। কিন্তু, প্রাথমিক ধাক্কা সামলে তেহরান প্রত্যাঘাত শানাতেই ফিকে হতে শুরু করেছে আমেরিকার যাবতীয় চাল। শুধু তা-ই নয়, আমেরিকার অন্দরেই উঠছে জোরালো প্রশ্ন। আমেরিকার অবস্থা ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তান যুদ্ধের মতো হবে না তো?
যুদ্ধ বিশারদরা বলছেন, পয়লা মার্চ থেকেই ধীরে ধীরে উলটো দিকে বইতে শুরু করেছে যুদ্ধের হাওয়া। আমেরিকাকে শিক্ষা দিতে পশ্চিম এশিয়ার ছড়িয়ে থাকা তাদের সেনাঘাঁটিগুলিকে নিশানা করে ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। ফলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, কুয়েত, বহরিন ও ওমানে আছড়ে পড়ে তেহরানের ‘হাইপারসনিক’ (শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ গতিশীল) ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন। মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা আইআরজিসির ওই হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বাহরিনে মার্কিন নৌঘাঁটিতে ধরে যায় আগুন। ড্রোন আছড়ে পড়ে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াধের মার্কিন দূতাবাসে। এ ছাড়া উপসাগরীয় এলাকায় আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী র্যাডার ব্যবস্থা উড়িয়ে দেওয়ার দাবি করেছে তেহরান, যা মোতায়েন ছিল কাতারে। তেহরান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দোহার সেনাছাউনির ওই এএন/এফপিএস-১৩২ র্যাডারটি ছিল পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার চোখ ও কান। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন চিহ্নিত করে এটি এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমকে খবর দিচ্ছিল। র্যাডারটির পাল্লা ৫ হাজার কিলোমিটার এবং আনুমানিক মূল্য ১১০ কোটি ডলার বলে জানা গিয়েছে। এ ছাড়া আইআরজিসির প্রত্যাঘাতে ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি লড়াকু জেট হারিয়েছে মার্কিন বায়ুসেনা।
ইরানকে ঘিরতে এ বছরের ফেব্রুয়ারির গোড়া থেকেই পরমাণু শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে পারস্য উপসাগর সংলগ্ন এলাকায় মোতায়েন করে আমেরিকা। তার সঙ্গে ছিল তিনটে আর্লে বার্ক শ্রেণির ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ। আইআরজিসির দাবি, চারটে ক্ষেপণাস্ত্রে লিংকনের উপর জোরালো আঘাত হেনেছে তারা। তেহরানের এ-হেন দাবি ঘিরে শোরগোল শুরু হলে সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে বিবৃতি দেয় আমেরিকার যুদ্ধ দপ্তরের (ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগন। সেখানে বলা হয়, আপাতত অক্ষত আছে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন।
আরবের মার্কিন সামরিক ছাউনিগুলিতে প্রত্যাঘাতের পাশাপাশি ইতিমধ্যেই হরমুজ প্রণালী বন্ধ করেছে ইরানের সেনাবাহিনী আইআরজিসি। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলি জানিয়েছে, আইআরজিসির ওই পদক্ষেপে হরমুজে নোঙর ফেলতে বাধ্য হয়েছে মার্কিন তেলবাহী জাহাজও। সেগুলিকে নিরাপদে বের করে আনতে নৌবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, কাজটা মোটেই সহজ নয়। কারণ, সরু সামুদ্রিক জলপথটিকে অষ্টপ্রহর চক্কর কাটছে ইরানি নৌসেনার রণতরি ও ডুবোজাহাজ। তা ছাড়া ‘ওয়াটার মাইন’ দিয়ে হরমুজ জুড়ে বারুদ সুড়ঙ্গ তৈরি করতে পারে তেহরান। পাশাপাশি সৌদি আরবের তেল শোধনাগারে ঘন ঘন ড্রোন হামলা চালাচ্ছে আইআরজিসি। ফলে মাঝেমধ্যেই উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে রিয়াধকে। পশ্চিম এশিয়ার একের পর এক দেশে এ ভাবে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে হু-হু করে বাড়ছে অপরিশোধিত তেলের দাম। এর প্রভাবে মুদ্রাস্ফীতির সূচকও উপরের দিকে ছুটতে শুরু করেছে। এর ছেঁকা আমেরিকার আমজনতার গায়ে যে লাগতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।
রাশিয়া ও চীনের সংকেতের লড়াই
রাশিয়া ইরানকে অত্যন্ত সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে— মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর কাছে এমনই অভিযোগ জানিয়েছেন তিন মার্কিন কর্তা। এমন দাবি কেবল একটি কৌশলগত জোটের চিত্রই তুলে ধরে না, বরং এটি এক নতুন ধরনের যুদ্ধের কাঠামো উন্মোচন করে। এমন এক যুদ্ধ যেখানে ট্যাঙ্ক বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে নয়, বরং র্যাডার বিম, স্যাটেলাইট ফিড এবং এনক্রিপ্ট করা স্থানাঙ্কের মাধ্যমে লড়াই চলছে। বর্তমানে পারস্য উপসাগরে আসল যুদ্ধটি চলছে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রামে বা তড়িৎচৌম্বকীয় বর্ণালিতে। যেখানে উভয় পক্ষই মূলত একে অপরকে ‘অন্ধ’ করে দেওয়ার লড়াইয়ে লিপ্ত।
সিআইএ-র প্রাক্তন অফিসার ব্রুস রিডেল একবার বলেছিলেন, আধুনিক যুদ্ধে বুলেটের চেয়ে স্থানাঙ্ক বা কো-অর্ডিনেট অনেক বেশি মূল্যবান। শত্রু কোথায় আছে তা যে জানে, জয় তারই হয়। পারস্য উপসাগরে এখন সেই তত্ত্বই বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। রাশিয়ার গোয়েন্দা তথ্যের কারণে ইরান এখন মার্কিন ও ইজরায়েলি রণতরী ও বিমানের অবস্থান এমন নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারছে, যা তাদের একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ইরানের নিজস্ব সামরিক স্যাটেলাইট ব্যবস্থা সীমিত, যা খোলা সমুদ্রে দ্রুত চলমান নৌযান ট্র্যাক করার জন্য যথেষ্ট নয়। তবে রাশিয়ার সেই সীমাবদ্ধতা নেই। রাশিয়ার উন্নত নজরদারি নেটওয়ার্ক এবং ‘খৈয়াম’ (ক্যানোপাস-ভি) স্যাটেলাইট তেহরানকে সার্বক্ষণিক অপটিক্যাল এবং রেডার ইমেজ সরবরাহ করছে। এটি কেবল ইরানের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে না, বরং এটি তাদের ‘প্রিসিশন-স্ট্রাইক’ বা নিখুঁত নিশানায় হামলার মূল স্নায়ুতন্ত্র হিসেবে কাজ করছে।
বেজিংয়ের ভূমিকা এখানে অনেকটা নীরব হলেও তা কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। চীন বছরের পর বছর ধরে ইরানের ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা ইলেকট্রনিক যুদ্ধের দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে। তারা উন্নত রেডার সিস্টেম রপ্তানি করেছে এবং ইরানি সামরিক নেভিগেশন ব্যবস্থাকে মার্কিন জিপিএস থেকে সরিয়ে চীনের এনক্রিপ্ট করা ‘বেইডো-৩’ নেটওয়ার্কে নিয়ে এসেছে। ইজরায়েলি বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমোস ইয়াদলিনের মতে, প্রতিটি সেকেন্ড এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ইরান যদি শত্রু শনাক্ত করতে কয়েক মিনিট সময়ও কমিয়ে আনতে পারে, তবে তা আকাশযুদ্ধের ভারসাম্য বদলে দেয়।
চীনের সরবরাহ করা ‘ওয়াইএলসি-৮বি’ অ্যান্টি-স্টিলথ র্যাডার এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যা মার্কিন স্টিলথ বিমানের রেডার-শোষক আবরণের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। মার্কিন বি-২১ রাইডার এবং এফ-৩৫সি বিমানগুলি মূলত রেডারের কাছে অদৃশ্য থাকার জন্য তৈরি। কিন্তু এই চীনা র্যাডারের সামনে তারা অনেক বেশি দৃশ্যমান। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন থেকে ইরান ৫০টি সিএম-৩০২ সুপারসনিক অ্যান্টি-শিপ মিসাইল কিনছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে বলা হয় ‘ক্যারিয়ার কিলার’ বা রণতরি ধ্বংসকারী। বর্তমানে মার্কিন রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলির নাগালেই।
এই যুদ্ধ ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে জোট বাহিনী ইরাকি রেডার নেটওয়ার্ক জ্যাম করে দিয়ে সাদ্দাম হোসেনের বাহিনীকে অন্ধ করে দিয়েছিল। ইরান গত তিন দশক ধরে সেই যুদ্ধ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। তারা শিক্ষা নিয়েছে যে কীভাবে আকাশপথে প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা শক্তিকে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়। রাশিয়ার স্যাটেলাইট ফিড এবং চীনের রাডার আর্কিটেকচার হল সেই সব শিক্ষার বিপরীতে ইরানের পালটা জবাব। তেহরান কিছুতেই পরবর্তী বাগদাদ হতে চায় না।
ইরানের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের বাইরেও এখানে একটি গভীর কৌশলগত সমীকরণ কাজ করছে। চীন কেবল আদর্শগত কারণে তেহরানকে অস্ত্র দিচ্ছে না, বরং তারা এই সংঘাতকে একটি ‘লাইভ-ফায়ার ল্যাবরেটরি’ বা পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার করছে। মার্কিন রণতরির বিরুদ্ধে সিএম-৩০২ ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা থেকে যে তথ্য পাওয়া যাবে, বেজিংয়ের সামরিক পরিকল্পনাবিদরা তা গভীরভাবে স্টাডি করবে। যা তাদের তাইওয়ান পরিকল্পনায় কাজে লাগবে। অন্যদিকে রাশিয়া পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞা ও ইউক্রেনে নিজেদের সামরিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার প্রতিশোধ নিতে চায়। ইরানকে সাহায্য করে মার্কিন বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত রাখা এবং তাদের দামি গোলাবারুদ শেষ করে দেওয়া রাশিয়ার কাছে একটি ‘কৌশলগত ঋণ উশুল’-এর মতো।
পারস্য উপসাগর সম্ভবত ইতিহাসের প্রথম রণক্ষেত্র হতে যাচ্ছে যেখানে প্রথাগত আগ্নেয়াস্ত্রের চেয়ে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ বেশি নির্ধারক হয়ে উঠবে। এখানে মৈত্রী বা জোট গঠিত হচ্ছে সেনা মোতায়েন বা চুক্তির মাধ্যমে নয়, বরং গোয়েন্দা তথ্যের প্রবাহ এবং স্যাটেলাইট সংযোগের মাধ্যমে। রাশিয়া ও চীন তেহরানের সাহায্যে কোনো সেনা পাঠাচ্ছে না, বরং তারা ইরানকে ‘দেখতে’ শেখাচ্ছে।
এখন র্যাডার বিমগুলি ক্ষেপণাস্ত্রের মতোই প্রাণঘাতী। গোয়েন্দা তথ্যই হল লড়াইয়ের প্রধান মুদ্রা। এই সংকেতের লড়াইয়ে ইরান এমন এক সমতা খুঁজছে যা আগে কখনো তাদের ছিল না। আমেরিকা ও ইজরায়েলের জন্য এখন চ্যালেঞ্জটি কেবল ইরানকে অস্ত্রে হারানো নয়, বরং এটি নিশ্চিত করা যে, যখন ট্রিগার টেপা হবে, ইরান যেন অন্ধের মতো গুলি চালায়। এখন প্রশ্ন হল, বারুদের ধোঁয়া যখন সরবে, কার দৃষ্টি স্বচ্ছ থাকবে?
উপসাগরীয় অঞ্চলে জমি হারাচ্ছেন ট্রাম্প
কথা ছিল, উপসাগরীয় দেশগুলি আমেরিকার অর্থনীতিতে বিপুল বিনিয়োগ করবে এবং নিজেদের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দেবে। বিনিময়ে আমেরিকা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এই অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিমাণ বিশাল। ২০২৫ সালে ট্রাম্পের উপসাগর সফরের সময় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও কাতার কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়। একই সময়ে উপসাগরীয় অর্থ ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক সংশ্লিষ্ট প্রকল্পেও প্রবাহিত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্পের জামাতা জেরার্ড কুশনারের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান অ্যাফিনিটি পার্টনার্স উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে বিলিয়ন ডলার অর্থ পেয়েছে। সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড একাই সেখানে ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।
কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে ট্রাম্প কার্যত সেই দীর্ঘদিনের সমঝোতাকেই দুর্বল করে ফেলেছেন। কারণ, উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়াই এই যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এই যুদ্ধের ঝুঁকি সম্পর্কে উপসাগরীয় দেশগুলি আগেই সতর্ক করেছিল এবং ওয়াশিংটনকে যুদ্ধের পথে না যেতে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাদের কথা গুরুত্ব পায়নি। আমিরশাহির প্রভাবশালী ব্যবসায়ী খালাফ আল হাবতুর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন, গুলি চালানোর আগে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করা হয়েছিল কি না? কারণ, এই উত্তেজনার প্রথম ভুক্তভোগী এই অঞ্চলের দেশগুলিই। তাঁর বক্তব্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ভিতরে তৈরি হওয়া এক বিস্তৃত অস্বস্তির প্রতিফলন!
প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, এত ক্ষয়ক্ষতির পর আমেরিকা-ইজরায়েল কি নিজেদের লক্ষ্য অনুযায়ী মোল্লাতন্ত্রের জমানা বদল করতে পারল? ট্রাম্পের হুমকিকে পাত্তা না দিয়ে ইরান নতুন সর্বোচ্চ নেতার আসনে বসিয়েছে নিহত আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের পুত্র মোজতবা খামেনেইকে। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলি লারিজানি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ট্রাম্পের ফাঁকা আওয়াজে তাঁরা ডরান না। বরং ট্রাম্প সতর্ক থাকুন, তিনি নিজেও নিকেশ হয়ে যেতে পারেন। ইতিমধ্যে ইরান যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন বেশ কয়েক জন মার্কিন সেনা। রণাঙ্গন থেকে তাঁদের কফিনবন্দি দেহ ইতিমধ্যেই ওয়াশিংটনে ফিরেছে। আহত শতাধিক। আমেরিকার ভিতরেই তীব্র সমালোচনার ঢেউ উঠেছে, ইজরায়েলের উসকানিতে ট্রাম্প নিজস্ব খামখেয়ালিপনায় অকারণে এই যুদ্ধে দেশকে জড়িয়েছেন।
সূত্রের খবর, এই অবস্থায় তেহরানে ‘গ্রাউন্ড অপারেশনের’ পরিকল্পনা করছেন ট্রাম্প। তাঁর কথায় শেষ পর্যন্ত পেন্টাগন সায় দিলে নিহত সেনার সংখ্যা উত্তরোত্তর আরও বৃদ্ধি পাবে। কারণ, ভূ-প্রকৃতিগত কারণে পারস্যভূমিতে লড়াই করা বেশ কঠিন। ১৯৪৫ সালে জাপানে পারমাণবিক বোমা মেরে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা ছাড়া শুধু আকাশযুদ্ধে কোনো দেশ জয়ের উদাহরণ আমেরিকার কাছে নেই। ইরানকে বোমা মেরে মধ্যযুগে ঠেলে পাঠালেও সেখানে ‘অটোমেটিক’ শাসনক্ষমতার পরিবর্তন হবে না। ট্রাম্পের মাথায় রয়েছে ভেনেজুয়েলা মডেল, সেখানে প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে ধরে জেলে পুরেছেন, তাঁর কাছে সেটাই মস্ত জয়। কিন্তু সে দেশের সরকারি ব্যবস্থাকে তিনি বদলাতে পারেননি। মাদুরোর নিজ দলের লোকেরাই সেখানে ক্ষমতায়। ইরানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভাব নেই, কিন্তু কোনো একজন বা কোনো একটি দলকে নিয়ে যে, তিনি কাজ করবেন, তেমন সম্ভাবনা এখনও পর্যন্ত দেখা দেয়নি। ফলে চাই বিকল্প ব্যবস্থা। আর সেই বিকল্প ব্যবস্থা হল, ইরানকে একাধিক দল-উপদলে বিভক্ত করা, যাতে তারা নিজেরাই একে অপরের সঙ্গে লড়াই করে নিজেরাই মরে। এটা যে কল্পনা নয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই সে কথা বলেছেন।
নিউ ইয়র্ক টাইমস জানাচ্ছে, ইরানে কুর্দিদের সঙ্গে একযোগে হামলার জন্য সিআইএ ইরাকের কুর্দিদের প্রস্তুত করছে। এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই কথা বলেছেন ইরাকের মার্কিনপন্থী কুর্দি নেতা মাসুদ বারজানি ও বাফেল তালাবানির সঙ্গে। এই কুর্দিদের যদি লেলিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে বর্তমান ইরানের সামরিক বাহিনীকে ব্যস্ত রাখা সহজ হবে। ব্যাপারটা খুব সহজ নয়। মুখে সাহায্যের কথা বললেও এখনও পর্যন্ত আমেরিকা ইরাকি কুর্দিদের ভারী অস্ত্র, বিমান বা ট্যাঙ্ক দিয়ে সাহায্য করেনি। এসব অস্ত্র ব্যবহারে কুর্দি বিদ্রোহীদের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ইরান ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীতে বিভক্ত। ফার বা ফার্সিরা সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ, রাজনৈতিক ক্ষমতাও তাদের করায়ত্ত। অধিক রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক অধিকারের দাবিতে ফার্সিদের সঙ্গে কুর্দি, আজেরি ও বালুচ— এই তিন জাতির মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নতুন নয়। একইরকম জাতিগত দ্বন্দ্বকে ব্যবহার করে লিবিয়া বা সিরিয়ার মতো দেশকে বিভক্ত করা হয়েছে। ইরানেও একই রণনীতি অনুসরণে আগ্রহী ইজরায়েল। তবে প্রাক্তন মার্কিন সেনাকর্তারা মনে করেন, পাহাড় ও মরুভূমিতে ঘেরা ইরানে স্থলবাহিনীর অভিযানে বিপুল সংখ্যায় সেনা হারাতে পারে আমেরিকা। কারণ, এই ধরনের অপারেশনে সাধারণ ভাবে কৃত্রিম উপগ্রহ বা গ্যাজেটের দিকনির্ণয়ের উপর ভরসা করে শত্রুর দেশে পা রেখে থাকে মার্কিন ফৌজ। এর সঙ্গে প্রকৃত রণক্ষেত্রের আকাশ-পাতাল পার্থক্য হতে পারে। অন্য দিকে নিজের এলাকার প্রতিটা ইট চেনে আইআরজিসি। ফলে অতি সহজেই গেরিলা যুদ্ধে আমেরিকাকে নাস্তানাবুদ করে ফেলতে পারে ইরানি সেনা। ইরান সরকারের হাতে একাধিক ভাড়াটে বাহিনীও রয়েছে। লুকিয়ে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাদের জুড়ি মেলা ভার। ফলে সেই ঝুঁকি ট্রাম্প নেবেন কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। লড়াইয়ের বিপুল খরচের বোঝা ইতিমধ্যেই তাঁর প্রশাসনের ঘাড়ে চেপেছে। সূত্রের খবর, যুদ্ধে প্রতিদিন প্রায় ২০ কোটি ডলার খরচ হচ্ছে আমেরিকার। এর জেরে মার্কিন রাজনীতিবিদদের একাংশ ইরান যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু করেছেন। তাঁদের যুক্তি, লড়াই লম্বা চললে সেখানে থেকে আমেরিকার বেরিয়ে আসা কঠিন হবে। তখন ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের মতো লেজেগোবরে দশা হতে পারে ওয়াশিংটনের। তা ছাড়া সংঘর্ষের খরচ শেষ পর্যন্ত জোগাতে হবে মার্কিন আমজনতাকেই।
৯/১১ জঙ্গি হামলার পর ২০০১ সালে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে আমেরিকা। প্রাথমিক সাফল্য এলেও হিন্দুকুশের কোলের দেশটিতে টানা দু’দশক যুদ্ধ লড়তে হয়েছে আমেরিকাকে। তাতেও তালিবানের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারেনি তারা। শেষে ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে ওয়াশিংটন।
এটি ছিল ‘সুপার পাওয়ার’ রাষ্ট্রটির হার স্বীকার করে নেওয়ার শামিল। আফগান যুদ্ধে প্রায় ২,৫০০ সেনা হারায় আমেরিকা। এই লড়াইয়ে তাঁদের খরচ হয়েছিল অন্তত ৭৮ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। সেই পরিস্থিতি যাতে ফের তৈরি না হয়, তার জন্য ট্রাম্পকে প্রতি মুহূর্তে সতর্ক করছেন আমেরিকার বেশ কিছু রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী।
বিবিসির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক জেরেমি বোয়েন লিখছেন, ট্রাম্প হয়তো এ যুদ্ধ থেকে শিখবেন, যুদ্ধ শুরু করা যুদ্ধ শেষ করার চেয়ে অনেক বেশি সহজ। যদি আপনি না জানেন, কোথায় যাচ্ছেন, তাহলে কখন থামতে হবে, তা বোঝা কঠিন।