Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

মনোনয়ন জমার উন্মাদনার সঙ্গেই ভোটাধিকার হারানোর আর্তনাদ,

‘আমরা যদি ভুয়ো ভোটার হই, ওদের সরকারটাও ভুয়ো।’ ভোটাধিকার ফিরে পেতে ট্রাইবুনালের লাইনে দাঁড়িয়ে প্রতিমা বিশ্বাস যখন ক্ষোভ উগরে দিচ্ছিলেন তখন কৃষ্ণনগরে মনোনয়ন জমা দিতে যাচ্ছিলেন বিজেপি প্রার্থীরা।

মনোনয়ন জমার উন্মাদনার সঙ্গেই ভোটাধিকার হারানোর আর্তনাদ,
  • ৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১৪:০৪
Prefer us on Google

অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: ‘আমরা যদি ভুয়ো ভোটার হই, ওদের সরকারটাও ভুয়ো।’ ভোটাধিকার ফিরে পেতে ট্রাইবুনালের লাইনে দাঁড়িয়ে প্রতিমা বিশ্বাস যখন ক্ষোভ উগরে দিচ্ছিলেন তখন কৃষ্ণনগরে মনোনয়ন জমা দিতে যাচ্ছিলেন বিজেপি প্রার্থীরা। বর্ণাঢ্য মিছিল। কর্মী-সমর্থকদের উচ্ছ্বাস-উন্মাদনা। ফলে, প্রতিমা ‘ওদের সরকার’ বলতে কাদের সরকার বোঝাতে চেয়েছেন, তার ইঙ্গিত খুব স্পষ্ট। 

Advertisement

ঘড়ির কাঁটা বেলা আড়াইটের ঘরে। পশ্চিমী ঝঞ্ঝার কারণে রোদের তেজ অনেকটাই কম। তা হলেও ভোট-ভবিষ্যতের কথা ভেবেই ট্রাইবুনালের লাইনে ঘামছেন সকলেই। সবার চোখে-মুখে চরম উৎকণ্ঠা। কতশত আশঙ্কা পাক খাচ্ছে মনে—ভোটধিকার হারালে সরকারি সুযোগ, সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে, মোটামুটি স্বাচ্ছন্দ্যে চলা সংসারে বিপর্যয় নেমে আসবে, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকায় ছেলেটার টিউশনের ফি দিতাম, টিউশন বন্ধ করে দিতে হবে। শেষে হয়তো ভিটেবাটি ছেড়ে ঠাঁই হবে ডিটেনশন ক্যাম্পে। আরও যে কতকিছু দুর্ভাবনা জড়ো হচ্ছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। সবমিলিয়ে বিষাদঘন পরিবেশ কৃষ্ণনগরের তথ্য-সংস্কৃতি দপ্তরের চত্বরে। সোমবার তার পাশ দিয়েই হইহুল্লোড় করতে করতেই মনোনয়ন জমা করতে যাচ্ছিলেন বিজেপি প্রার্থীরা। মনোনয়ন মিছিলের বাজনার আওয়াজেই ঢাকা পড়ে যাচ্ছে ভোটহারাদের বুকফাটা যন্ত্রণা! ‎
প্রতিমা বিশ্বাসও একই যন্ত্রণার শরিক। ভোটাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে শামিল। বিজেপির উচ্ছ্বাস থেকে আর নিজেকে সামলে রাখতে পারছিলেন না। রাগত সুরে বলেই ফেললেন, ‘ওদের আবার কীসের চিন্তা? ভোট কাটার নেপথ্য  কারিগর তো ওরাই। ওদের তো ভোট রয়েছে। আমরা কি অপরাধ করলাম জানি না।’ তার পরেই ছুঁড়ে দিলেন মোক্ষম কথাটা—আমি যদি ভুয়ো ভোটার হই, ওদের সরকারও ভুয়ো।’ মঙ্গলবারও তৃণমূল ও সিপিএম মনোনয়ন জমা দেয়। সব ঠিকঠাক থাকলে ভোটও হবে। কিন্তু ততদিনে প্রতিমাদের যন্ত্রণার ছবিটা কি বদলাবে? 
‘জানি না, ওরা কি চায়!’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে কথাটা বললেন প্রদীপ পাল। তথ্য সংস্কৃতি দপ্তরের চত্বরের মাটিতেই বসেছিলেন তিনি। সব নথিপত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও নাম কেন বাদ গেল, তার হিসেব মেলাতে পারছিলেন না কিছুতেই। ট্রাইবুনালেও এসেছেন প্রচুর কাগজপত্র নিয়ে। এবার আর ত্রুটি রাখতে চান না। মনোনয়ন নিয়ে প্রদীপবাবুর কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। হতাশার সুরেই তিনি বলছিলেন, ‘আমার তো আর ভোট নেই। ওরা কি করল, না করল, তা নিয়ে আমি কি করব?’ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মরজিনা বিবির সংযোজন, ‘প্রার্থী জেনে কি করব? ওসব এখন বাদ দিন।’ বলেই মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কালীগঞ্জের পানিঘাটার বাসিন্দা ইমাদুল শেখ প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলছিলেন, ‘২০০২ সালের তালিকায় বাবার নাম রয়েছে।  সমস্ত নথিপত্র জমা দিয়েও আমি ও স্ত্রী সহ পাঁচজনের নাম বাদ পড়েছে।’  
‎ জেলায় বিচারাধীন ভোটার ছিলেন ২ লক্ষ ৬৭ হাজার ৯৪০ জন। যার মধ্যে ২ লক্ষ ৮ হাজারের বেশি ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। ভোটদানের অধিকার পেয়েছেন মাত্র ৬০ হাজার। সংখ্যালঘুর পাশাপাশি প্রচুর মতুয়া ভোটও বাতিল হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই ট্রাইবুনালের সামনে থিকথিকে ভিড়ের একটাই পরিচয়—ভোটাধিকার আন্দোলনের কর্মী। ধর্ম-জাত তাঁদের কাছে এখন গৌণ। 

সম্পর্কিত সংবাদ