


নিজস্ব প্রতিনিধি ও সংবাদদাতা: তীব্র গরম। বুথে বুথে দীর্ঘ লাইনও। সব কিছু উপেক্ষা করেই প্রথম দফায় ১৫২টি আসনে রেকর্ড সংখ্যায় ভোট দিল বাংলার জনতা-জনার্দন। প্রতিটি কেন্দ্রেই ভোটের লাইনে মহিলাদের উপস্থিতি ছিল নজরকাড়া। বাংলার ভোট ভাণ্ডারে এ যেন ‘লক্ষ্মী’র আশীর্বাদ! কয়েকটি বিক্ষিপ্ত ঘটনা ছাড়া এদিনের ভোটপর্ব ছিল শান্তিপূর্ণ। নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, রাত ৯টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৯২.৩৫ শতাংশ। স্বাধীনতা পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গে ইতিহাসে যা সর্বকালীন রেকর্ড! ভোটদানের এই হার দেখে খুশি দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনি আধিকারিক মনোজ আগরওয়ালের দাবি, ১০০ শতাংশ বুথে ওয়েব কাস্টিং হয়েছে। তিনি এবং রাজ্য পুলিশের নোডাল অফিসার আনন্দ কুমার দু’জনেরই বক্তব্য, রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ৪৮৪৮টি বুথে ভোটগ্রহণ চলছে। রাজ্যের কোথাও ভোটকেন্দ্র ও তার ১০০ মিটারের মধ্যে অশান্তির কোনো অভিযোগ নেই। গোলমালের আশঙ্কায় ৫৭০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নওদা, দুবরাজপুর, কুমারগঞ্জ সহ আরও কয়েকটি জায়গায় সংঘর্ষ ও গোলমালে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরও ৪১ জনকে। তবে এখনও পর্যন্ত কোথাও পুনর্নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা নেই।
এই বিপুল ভোটদানের হার উন্নয়নের পক্ষে নাকি পরিবর্তনের? এ নিয়ে প্রবল চর্চা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। উচ্ছ্বসিত জোড়াফুল ও পদ্ম, দু’পক্ষই। তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য সাফ জানিয়েছেন, ‘মানুষ ভোটকেই প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। প্রথম দফার ভোট শেষে আমরাই চালকের আসনে।’ দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়েরও দাবি, প্রথম দফাতেই দফারফা হয়েছে বিজেপির। যদিও পদ্মপার্টির সেকেন্ড-ইন-কমান্ড কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বুক ফুলিয়ে জানিয়েছেন, ভোটপর্বে এত বিশাল সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ প্রমাণ করছে, বাংলায় পরিবর্তন নিশ্চিত।
প্রথম দফার ভোটে যে ক’টি বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে বীরভূমের দুবরাজপুর বিধানসভার খয়রাশোলের বুধপুর গ্রামের ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য। বিকেলের দিকে ভোটগ্রহণ চলাকালীন আচমকাই বিকল হয়ে যায় সেখানকার ৬৫ নম্বর বুথের ইভিএম। বাইরে লাইনে প্রতীক্ষারত মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে যান সাধারণ ভোটাররা। লাঠিচার্জ করে বাহিনী। রিভলভার উঁচিয়ে ক্ষিপ্ত জনতাকে তাড়া করা হয়। পালটা ইটবৃষ্টিও শুরু হয়। ভাঙচুর চলে পুলিশের গাড়িতে। লাঠিচার্জ ও ইটের আঘাতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান সহ বেশ কয়েকজন আহত হন। তবে শুধু দুবরাজপুর নয়, রাজ্যের আরও বেশ কয়েকটি প্রান্তে অতিসক্রিয়তার অভিযোগ উঠেছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে। উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া বিধানসভা কেন্দ্রের লখিপুরে ১৬২ নম্বর বুথে এক বৃদ্ধা ও তাঁর ভাইপোকে বিজেপি প্রতীকে ভোট দিতে কয়েকজন জওয়ান প্ররোচিত করছিল বলে অভিযোগ। বৃদ্ধা প্রতিবাদ করায়, তাঁকে ও তাঁর ভাইপোকে লাঠিপেটা করা হয়েছে। পাশাপাশি বাঁকুড়ার কোতুলপুর বিধানসভার যমুনা গ্রামে ১০০ মিটারের অনেক দূরে থাকা তৃণমূলের ক্যাম্প অফিস এবং বেশ কয়েকটি বাইক ভাঙচুর করার অভিযোগ উঠেছে আধাসেনার বিরুদ্ধে। ইন্দাসে লাউগ্রাম এলাকাতেও ১০০ মিটারের বাইরে থাকা তৃণমূল ও সিপিএমের ক্যাম্প অফিস ভাঙচুর চলে। সেখানেও আঙুল উঠেছে সিআরপি’র বিরুদ্ধে।
বীরভূমের লাভপুরে এবং দক্ষিণ দিনাজপুরের কুমারগঞ্জের দুই বিজেপি প্রার্থী আক্রান্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ। পশ্চিম বর্ধমানের হীরাপুরের রহমতনগরে বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পলের গাড়িতেও ভাঙচুর চলে। মুর্শিদাবাদের নওদায় তৃণমূল এবং আম জনতা উন্নয়ন পার্টির সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বীরভূমের মুরারইতে গোঁড়শা গ্রামে তৃণমূল ও কংগ্রেস সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। জখম হন তিনজন। এদিন ভোট পর্বে কেশপুর, মালতীপুর, সিউড়ি এবং পটাশপুরে অসুস্থ হয়ে চার ভোটারের মৃত্যু হয়েছে।