


সুকমল দালাল, বোলপুর: আজ পয়লা বৈশাখ। বাঙালির নববর্ষ। নতুন বছরের প্রথম দিনকে ঘিরে আনন্দ, উৎসব, ঐতিহ্যের আবহে মেতে উঠেছে গোটা বাংলা। কিন্তু এবারের নববর্ষ শুধুমাত্র উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে তা হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক জনসংযোগ, শক্তিপ্রদর্শন ও বার্তা পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। বোলপুর-শান্তিনিকেতন ও ইলামবাজারজুড়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে একাধিক কর্মসূচি রেখেছেন শাসক-বিরোধী দলের প্রার্থীরা।
বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার দাবিকে সামনে রেখে সরব হয়েছে বোলপুর-শান্তিনিকেতন সংস্কৃতি মঞ্চ। ইতিপূর্বে এক মাস আগে তৃণমূল প্রার্থী চন্দ্রনাথ সিংহের সঙ্গে বৈঠকের পর মঞ্চের সদস্যরা নববর্ষ থেকেই পথে নামার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের দাবি, তাঁরা সরাসরি রাজনৈতিক ব্যানারে না থাকলেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে নিরপেক্ষ থাকা সম্ভব নয়। তাই আজকের দিনটিকেই বেছে নেওয়া হয়েছে জনসচেতনতা গড়ে তোলার সূচনা হিসেবে।
মঞ্চের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আজ বোলপুর-শান্তিনিকেতন শহরজুড়ে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হবে। শোভাযাত্রায় অংশ নেবেন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মী, শিল্পী, নাট্যকর্মী এবং সাধারণ মানুষ। শুধু শোভাযাত্রাই নয়, পথনাটিকার মাধ্যমে বাংলা ভাষার প্রতি অবিচার, ভিনরাজ্যে বাঙালিদের সমস্যার চিত্র এবং ভাষা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হবে। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পোস্টারিং ও প্রচার কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়ে।
মঞ্চের সদস্যদের বক্তব্য, বাংলা শুধু একটি ভাষা নয়, এটি আমাদের পরিচয়, আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি। সম্প্রতি বিভিন্ন জায়গায় ভাষাগত বৈষম্য ও বাঙালিদের উপর হেনস্তার ঘটনা উদ্বেগজনক। তাই এখনই সময়, মানুষকে একজোট হয়ে ভাষা ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে হবে। তৃণমূল প্রার্থী চন্দ্রনাথ সিংহও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদের আত্মপরিচয়ের মূল স্তম্ভ। এটিকে রক্ষা করতে হলে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
এই আবহেই ইলামবাজারে তৃণমূলের প্রচারে যুক্ত হচ্ছে তারকাখচিত আকর্ষণ। নববর্ষের দিনেই বোলপুরের তৃণমূল প্রার্থী চন্দ্রনাথ সিংহের সমর্থনে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় অংশ নিতে চলেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা তথা সাংসদ দেব। তাঁর উপস্থিতিকে ঘিরে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে প্রবল উৎসাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দলীয় সূত্রে খবর, ইলামবাজারের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এই শোভাযাত্রা হবে। যেখানে স্থানীয় মানুষজন অংশ নেবেন। নববর্ষের উৎসবের আমেজের সঙ্গে এই প্রচার কর্মসূচি মিলিয়ে এক বিশেষ আবহ তৈরি হয়েছে এলাকায়। শুধু তাই নয়, এদিন কঙ্কালীতলা মন্দিরে পুজো দিতেও হাজির হতে পারেন একাধিক দলের প্রার্থীরা।
নববর্ষ উপলক্ষে বিজেপিও তাদের কর্মসূচি সাজিয়েছে। আজ, বোলপুর শহরে শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানির। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। বিজেপির বোলপুর সাংগঠনিক জেলা সভাপতি শ্যামাপদ মণ্ডল বলেন, বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়েই আমাদের এই আয়োজন। যার মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে আরও নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করা হবে।
সিপিএমও এদিনে আলাদা ধরনের বার্তা দিতে চায়। দলের জেলা সম্পাদক গৌতম ঘোষ বলেন , আমরা নববর্ষ পালন করব সম্পূর্ণ বাঙালি ঐতিহ্য মেনে। তবে মাইকবিহীন প্রচারের মাধ্যমে। সরল, সংযত এবং সংস্কৃতিমনস্ক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করব। তাঁদের মতে, অতিরিক্ত জাঁকজমক নয়, বরং সংস্কৃতির মূল সুরটিকেই তুলে ধরা উচিত এই দিনে।
উল্লেখ্য, কয়েক মাস আগে বোলপুরে পদযাত্রা করে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার বার্তা দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই ধারাবাহিকতাতেই নববর্ষকে কেন্দ্র করে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসঙ্গ আবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। বিভিন্ন দলের নেতাদের বক্তব্যেও বারবার উঠে আসছে বাঙালি, ভাষার মর্যাদা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রসঙ্গ।
তাই আজ পয়লা বৈশাখ শুধুমাত্র উৎসবের দিন নয়, এটি হয়ে উঠেছে আবেগ, সংস্কৃতি এবং রাজনীতির এক মিলনমঞ্চ। শোভাযাত্রা, পথনাটিকা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে তারকা উপস্থিতি, সব মিলিয়ে বোলপুর-শান্তিনিকেতন নববর্ষ উদযাপন যেন এক নতুন মাত্রা পেতে চলেছে। উৎসবের রঙে রাঙা এই দিনে ভোটের সুর মিশে গিয়ে তৈরি করেছে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আবহ।