নিজস্ব প্রতিনিধি, দুর্গাপুর: রাতে একসঙ্গে খেতে যাওয়া, জঙ্গল-পথে হাঁটার পরিকল্পনা। তারপর সেই অভিশপ্ত অধ্যায়—গণধর্ষণ, টাকা-মোবাইল ছিনতাই। ভয়ে সহপাঠীর চলে আসা। ফোনে বারবার ফিরে আসার আর্জি। সাড়া পেয়ে জঙ্গল থেকে অসহায় অবস্থায় কোনওরকমে বেরিয়ে আসা। মূল রাস্তায় সহপাঠীর সঙ্গে দেখা। ক্যাম্পাস পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে হস্টেলে ফেরা। ফিরেও দু’জনের হোয়াটসঅ্যাপে দীর্ঘ কথা—সবকিছুই থরে থরে সাজানো নির্যাতিতার স্মার্টফোনে। ফলে, দুর্গাপুর গণধর্ষণ মামলায় মোবাইলে দু’জনের কথোপকথন ও হোয়াটস অ্যাপ চ্যাটই এখন তুরুপের তাস। সোমবার শুনানির জন্য মামলাটি ওঠে দুর্গাপুর আদালতের এডিজে ফার্স্ট কোর্টে, বিচারক লোকেশ পাঠকের এজলাসে। শুনানিতে মোবাইলের তথ্য-প্রমাণ নিয়ে সরকারি আইনজীবী ও সহপাঠীর আইনজীবীর মধ্যে তুমুল টানাপোড়েন চলে। দুই অভিযুক্ত শেখ রিয়াজুদ্দিন ও সফিক শেখকে রাজসাক্ষী করার মৌখিক প্রস্তাবও দেওয়া হয় সরকারি আইনজীবীর তরফে। তবে, এদিন মামলার চার্জগঠন হয়নি । আজ, মঙ্গলবার ফের শুনানি।
পুলিশের একটি সূত্রের খবর, মোবাইল বিপাকে ফেলতে পারে জেনেই বহু তথ্য মুছে দেয় সহপাঠী ওয়াসিফ আলি। কিন্তু, আদালতের অনুমতি নিয়ে সেইসব তথ্য উদ্ধার করে তদন্তকারী অফিসাররা। এদিন, মামলার শুনানিতে সরকার নিযুক্ত বিশেষ আইনজীবী বিভাস চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘দু’জনের ওই হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট আমাদের কাছে ‘প্যারামাউন্ট এভিডেন্স’ অর্থাৎ, এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। সেই এভিডেন্সের কপি পাওয়া দু’পক্ষের আইনজীবীর দীর্ঘ সওয়াল চলে। উদ্ধার হওয়া তথ্যের একটা অংশ পাননি বলে আদালতে জোরাল দাবি করেন সহপাঠীর আইনজীবী। কেননা, চ্যাটটিকে তিনি হাতিয়ার করে মক্কেলকে ধর্ষণের অভিযোগ থেকে মুক্তি দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালাতে পারেন। এমনটাই মত আইনজ্ঞদের একটা বড় অংশের।
নির্যাতিতার মোবাইলটি শুধু মামলার অস্ত্রই হয়ে ওঠেনি, তদন্তের মোড়টাও পুরোপুরি ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ঘটনাস্থল থেকে মোবাইলে ফোন করেছিল পালিয়ে যাওয়া দুষ্কৃতীরা। সেই সূত্র ধরেই পাঁচ অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা সহজ হয় পুলিশের কাছে। পরে, নির্যাতিতার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট থেকেও একের পর এক লিঙ্ক মেলে। এরপর নির্যাতিতা ও সহপাঠীর মোবাইলের কললিস্ট বের করে আতশ কাচের তলায় ফেলেন দুষ্কৃতীরা। এদিন সরকারি আইনজীবী আদালতে বলেন, ‘এখনকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে যারা অপরাধ করে, তারা অনেক বেশি প্রযুক্তিকে কাজে লাগায়। আমরা জানতাম মোবাইলটির সঙ্গে বাইরের ইন্টারনেট সংযোগ করলেই সব চ্যাট ডিলিট হয়ে যাবে। তাই আগেই মোবাইলের চ্যাটের স্ক্রিনশট নিয়ে রেখেছিলাম।’ এরপর সহপাঠীর আইনজীবী শেখর কুণ্ডুকে উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনার মক্কেল যতই চালাক হোক, আমরা মুছে ফেলা চ্যাটও উদ্ধার করেছি।’ শেখরবাবু পাল্টা বলেন, ‘চ্যাটের সব নথি আমাদের দেওয়া হয়নি। মামলায় সরকার পক্ষ যে সব তথ্য ধর্তব্যে আনেনি, সেগুলিও দেওয়ার কথা। কিন্তু, তা দেওয়া হচ্ছে না।’ একই সঙ্গে তিনি ১০ অক্টোবর থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁর মক্কেলের ফোনের টাওয়ার লোকেশন ও দুর্গাপুর, নিউ টাউনশিপ ও বিজন পুলিশ ফাঁড়ির সিসিক্যামেরার ফুটেজ দেওয়ার দাবি জানান। চার্জশিট অসম্পূর্ণ বলেও তিনি অভিযোগ তোলেন।
স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রশ্নকে ঘিরে সবমহলের কৌতূহল তুঙ্গে। সেটা হল, কী রয়েছে চ্যাটে? প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, ঘটনার দিন রাতে খেতে যাওয়ার পরিকল্পনা থেকে সহপাঠী ও নির্যাতিতার আগে ফাঁকা রাস্তায় হাঁটতে যাওয়ার কথপোকথন সহ একাধিক তথ্য সেখানে রয়েছে। এমনকী, গণধর্ষণের পর নির্যাতিতা হস্টেলে ফেরার পরও সহপাঠীর সঙ্গে হোয়াটাসঅ্যাপে দীর্ঘ চ্যাট হয়। এদিকে, অভিযুক্তরা বিচারকের কাছে জানান, তাদের আত্মীয়রা আইনজীবী দেবেন। বিচারক সাফ জানিয়ে দেন, তাদের আইনজীবীর অপেক্ষায় মামলার শুনানি থেমে থাকবে না।