নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: মানুষ খুব অসহায় অবস্থায় না পড়লে সুদখোরের কাছে হাত পাতে না। সেই সুযোগে চড়া সুদ ও একাধিক অন্যায্য শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়। এসব কোনওটাই খুব বিরল ঘটনা নয়! সমাজ-সংসারে এমন অনেক উদাহরণ মিলবে। কিন্তু কারও অসহায়তার সুযোগে তাঁকে ঋণের জালে জড়িয়ে টাকা শোধ করার জন্য কিডনি বিক্রির টোপ বেনজির বৈ কি! এমনই ঘটনা সামনে এসেছে উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরে।
ঘটনা হল, দরিদ্র পরিবারের এক যুবক কয়েকমাস আগে চড়া সুদে ৬০ হাজার টাকা ধার নেন অশোকনগরের হরিপুর-ভৈরবতলার বাসিন্দা বিকাশ ঘোষ ওরফে শীতলের কাছ থেকে। ঋণের শর্ত অনুযায়ী প্রতিদিন তাকে সুদ বাবদ ৬০০ টাকা করে দিতে হতো। কিন্তু চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ বাড়ছিল। কোনও মাসে শর্ত লঙ্ঘন হলে পাঁচ হাজার টাকা ফাইন। এভাবে সাত-আট মাসে ওই যুবককে প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা সুদ দিতে হয়। এভাবে টাকা মেটাতে গিয়ে যুবকের দেনা আরও বেড়ে যায়। কিন্তু তারপরও ‘আসল’ ৬০ হাজার টাকা শোধ হয়নি। যুবকের অভিযোগ, আর্থিক অনটনের কথা বিকাশকে জানাতেই সে ‘নতুন খেলা’ শুরু করে দেয়। কিডনি সহ মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ বিক্রির টোপ দেয় বিকাশ। পরিস্থিতির প্যাঁচে পড়ে যুবক তাঁর স্ত্রীর কিডনি বিক্রি করতে রাজিও হয়। তখন ওই সুদখোর কচুয়ার এক মহিলার সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ করিয়ে দেয়। কলকাতার একটি নামকরা বেসরকারি হাসপাতালে গত ১২ মার্চ স্ত্রীকে ভর্তি করান যুবক। ১৪ মার্চ অস্ত্রোপচার করে গৃহবধূর একটি কিডনি ‘বিক্রি’ করে দেওয়া হয়। সাড়ে পাঁচ লক্ষ টাকায় দরদাম চূড়ান্ত হয়। যুবকের অভিযোগ, তখন বিকাশ দু’লক্ষ টাকা দাবি করে বসে। যদিও কিডনি বিক্রির পুরো টাকা তিনি তখনও হাতে পাননি। এই অবস্থায় আর কোনও উপায় না পেয়ে গত শুক্রবার অশোকনগর থানায় বিকাশের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন তিনি। পুলিস অভিযুক্ত সুদখোরকে গ্রেপ্তার করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই যুবক অভিযুক্তের কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন।
এখানেই শেষ নয়! ধৃতকে জেরা ও প্রাথমিক তদন্তের পর পুলিস জানতে পারে, এমন ঘটনা ওই যুবকের ক্ষেত্রেই প্রথম ঘটছে না। রীতিমতো কিডনি পাচারের একটি বড়সড় চক্রের সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে বিকাশের। বছরখানেক আগে একইভাবে ঋণের ফাঁদে ফেলে অশোগনগরেরই এক মহিলাকে কিডনি বিক্রি করতে কার্যত বাধ্য করে সে। রবিবার সেই মহিলা সব ঘটনা পুলিসকে জানিয়ে আসেন বলেও খবর। এদিকে, ধৃত বিকাশকে আদালতে তোলা হলে বিচারক পাঁচদিনের পুলিস হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। বারাসত পুলিস জেলার সুপার প্রতীক্ষা ঝাড়খারিয়া বলেন, ‘এই চক্রের মাথা ধরতে তদন্ত শুরু হয়েছে। নাগরিকদের কাছে আবেদন, এভাবে চড়া সুদের ফাঁদে পড়বেন না। প্রয়োজনে পুলিসকে জানান।’ বারাসত বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক অলোক সমাজপতি বলেন, ‘সুদে টাকা লেনদেন করতে হলে নির্দিষ্ট লাইসেন্স থাকতে হয়। তবে সুদ নেওয়ারও একটা সীমা আছে। চাপ দিয়ে কিডনি বিক্রি করানো মানে দণ্ডনীয় অপরাধ।’