নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: অনলাইন হোক বা দোকান, ওষুধে মিলছে ২০, ২৫, এমনকী ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়। অথচ অপরিহার্য ওষুধ বাদে ফার্মাসি ব্যবসায় মুনাফার হার বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। পাইকারি ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে তা ১০ শতাংশ এবং খুচরো ব্যবসায়ীর ২০ শতাংশ। তাহলে কি এত এত ছাড় দেওয়া হচ্ছে কীভাবে? লোকসান করে ওষুধ বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা? একেবারেই নয়। ব্যাপক ছাড় দিয়েও মুনাফা বজায় রাখতে, আসল ওষুধের প্যাকেটে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে ভেজাল ওষুধের স্ট্রিপ। ফলে হু হু করে বাড়ছে নিম্নমানের এবং জাল ওষুধের চাহিদা। সঙ্গে রয়েছে ঘুরপথে আসা (গ্রে রুট) ব্র্যান্ডেড ওষুধও। রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোল এবং ব্যবসায়ী মহলের একাংশ সূত্রে এমনই চাঞ্চল্যকর খবর সামনে এসেছে। গত মঙ্গলবার রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোলের অভিযানেই মিলেছে তার প্রমাণ। একাধিক দোকান থেকে আসল ওষুধের প্যাকেটে ভেজালের স্ট্রিপ মিলেছে। সেগুলির উৎস আবার উত্তরপ্রদেশের আগ্রা!
নাম গোপন রাখার শর্তে পাইকারি ওষুধ ব্যবসা-জগতের কয়েকজন ঝানু কারবারি জানিয়েছেন, সরকার নির্ধারিত মুনাফার বাইরেই হয় আসল খেলা। সরাসরি ডিস্ট্রিবিউটর বা পাইকারি ব্যবসায়ীদের সারা বছর ব্যবসা দেওয়ার নাম করে আরও ২ থেকে ৮ শতাংশ লাভে মাল তোলেন খুচরো ওষুধ ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ। ফলে সরকার নির্ধারিত ২০ শতাংশের বাইরেও তাদের হাতে থাকে পাইকারি ব্যবসায়ীদের দেওয়া সেই বাড়তি মুনাফা। অর্থাৎ, প্রায় ২২-২৮ শতাংশ লাভের মুখ তারা দেখতে পারেন ওষুধ বিক্রি করে। কিন্তু অনলাইন ও বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলিকে টক্কর দিতে তাদেরকেও দিতে হচ্ছে কমপক্ষে ২০-২৫ শতাংশ ছাড়। কখনও কখনও তার থেকে বেশি। তাহলে তো ওই খুচরো ব্যবসায়ীদের অচিরেই দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার কথা? এই পরিস্থিতিতে ‘ত্রাতা’ হিসেবে অবতীর্ণ হচ্ছে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলির একাংশের মদতে ‘গ্রে রুটে’ বাজারে চলে আসা ওষুধ এবং ভিন রাজ্য থেকে বাজারে ঢুকে পড়া নিম্নমানের অথবা জাল ওষুধ।
কিন্তু ‘গ্রে রুটে’-র ওষুধ আবার কী? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্টকিস্ট বলেন, আইনি পথে বিক্রির পাশাপাশি কিছু কোম্পানি একই ওষুধ ‘অবৈধ’ স্টকিস্টদের মাধ্যমে পৌঁছে দিচ্ছে খুচরো ব্যবসায়ীদের কাছে। বেশ কিছু হাসপাতাল এবং বড় সংস্থা বিরাট ডিসকাউন্টে সেগুলি কিনছে। ফলে ঘুরপথে তা চলে আসছে খোলা বাজারে। সেগুলি হয়তো ভেজাল নয়, কিন্তু, তাতে খুচরো ব্যবসায়ীর ৩০-৪০ শতাংশ বাড়তি মুনাফা হওয়ার রাস্তা খুলে যাচ্ছে। আর এই মওকারই অপেক্ষায় থাকে ভেজাল কারবারিরা। সুযোগ বুঝে তারাও দোকানে ঢুকিয়ে দিচ্ছে জাল ওষুধ। সুতরাং, একই দোকানে একই ব্র্যান্ডের একই রকম স্ট্রিপ এবং প্যাকেটের তিন থেকে চার রকমের ওষুধ মিলছে ড্রাগ কন্ট্রোলের অভিযানে।
ঠিক এ কারণেই মেহতা বিল্ডিং, বাগড়ি এবং গান্ধী মার্কেটের কিছু জায়গায় কখনও কখনও অস্বাভাবিক ছাড়েও ওষুধ পাওয়া যায়। তাদের হাত ধরে এই ব্যবসায় হাত পাকিয়ে ফেলেন ‘শিক্ষানবিশ’ ব্যবসায়ীরাও! বেঙ্গল কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র শঙ্খ রায়চৌধুরী জানাচ্ছেন, ‘এই কারণেই ওষুধ ব্যবসায়ীদের পইপই করে বলছি, কেউ বেশি ছাড়ে ওষুধ বিক্রি করতে এলে কেনার আগে ১০০ বার ভাবুন।’
অল ইন্ডিয়া কেমিস্ট অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউটরস ফেডারেশনের সর্বভারতীয় সম্পাদক জয়দীপ সরকারের প্রশ্ন, ‘আমাদের দেশে ওষুধ নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ার ৩-৬ মাসের মধ্যেই কোম্পানি নানাভাবে রেহাই পেয়ে যায়। ফের একই ওষুধ বাজারে চলে আসে। কেন এমন হবে?’