নিজস্ব প্রতিনিধি, মেদিনীপুর: আইনের চোখ রাঙানি, প্রশাসনের সচেতনতা শিবির, স্কুলে স্কুলে প্রচার— সবকিছুর পরেও পশ্চিম মেদিনীপুরে বাল্যবিবাহের অভিশাপ এখনও উদ্বেগের কারণ। প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, গত দেড় বছরে জেলায় নাবালিকা বিয়ের সংখ্যা ১০ হাজারের গণ্ডি ছুঁয়েছে। তবে নতুন সরকার গঠন হওয়ার পর এই পরিস্থিতিতে বাল্যবিবাহ রুখতে এবার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করল জেলা পুলিশ। স্পষ্ট বার্তা, থানায় ডেকে কোনও সমঝোতা নয়, আইন ভাঙলে হবে কঠোরতম ব্যবস্থা।
জেলার পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা বলেন, বাল্যবিবাহ কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যাবে না। কেউ এই ধরনের কাজে যুক্ত থাকলে কঠোর থেকে কঠোরতম পদক্ষেপ করা হবে। জেলাজুড়ে নো-টলারেন্স নীতি কার্যকর করা হচ্ছে।
প্রশাসনের কর্তাদের বক্তব্য, পশ্চিম মেদিনীপুরে বাল্যবিবাহ দীর্ঘদিনের সামাজিক ব্যাধি। আগামী অর্থবর্ষের মধ্যে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সেই উদ্দেশ্যে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে সচেতনতামূলক প্রচার চালাবে পুলিশ ও প্রশাসন। কোথাও জোর করে নাবালক বা নাবালিকার বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে থানায় খবর দেওয়ার আবেদনও জানানো হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, সমস্যার গভীরতা এখনও যথেষ্ট। ২০২২-’২৩ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছিল, ওই এক বছরেই জেলায় প্রায় সাড়ে ১১ হাজার নাবালিকার বিয়ে হয়েছে। যদিও প্রশাসনের দাবি, ধারাবাহিক প্রচার ও নজরদারির ফলে বর্তমানে সেই সংখ্যা কিছুটা কমেছে। তবু উদ্বেগ কাটছে না। বাল্যবিবাহ রুখতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপও ক্রমশ বেড়েছে। ২০২১-’২২ অর্থবর্ষে ৫৭ জন নাবালিকার বিয়ে বন্ধ করা হয়েছিল। ২০২২-’২৩ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৮। ২০২৩-’২৪ সালে ৯৯টি এবং ২০২৪-’২৫ সালে প্রায় ১৪৪টি বাল্যবিবাহ রুখে দেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে। চলতি অর্থবর্ষেও ইতিমধ্যে প্রায় ৫০ জনের বেশি নাবালিকার বিয়ে আটকানো হয়েছে। তবু প্রশ্ন উঠছে, এত উদ্যোগের পরেও কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না এই প্রবণতা? প্রশাসনের এক আধিকারিকের কথায়, জেলার প্রায় সব ব্লকেই বাল্যবিবাহের সমস্যা রয়েছে। প্রতিবছর আরও বেশি সংখ্যক বিয়ে আটকানো সম্ভব হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সামাজিক সচেতনতার অভাব এখনও বড় বাধা। অভিভাবকদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। এছাড়া কিশোর-কিশোরীদের উপর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি স্মার্টফোন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণও জরুরি। একইসঙ্গে প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েতে নজরদারি জোরদার করার উপর জোর দিতে হবে। অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের একাংশও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই ধরনের বিয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছেন। কেশপুরের বাসিন্দা সন্তোষ মণ্ডলের বক্তব্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই এই কাজে মদত দেন। আইন অনুযায়ী কড়া শাস্তি শুরু হলে এই প্রবণতা অনেকটাই কমবে।মেদিনীপুরের বিধায়ক শংকর গুছাইত বলেন, তৃণমূলের জামানায় কি হয়েছে মানুষ জানে। তবে নতুন সরকার গঠনের পর থেকে কোনও অনিয়ম মেনে নেওয়া হচ্ছে না।