


আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভোটাধিকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজনের ভোটাধিকার সেই ব্যক্তির নাগরিকত্বের সূচক। বিশেষ করে যেসব দেশ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়, সেইসব দেশের ভোটাররা সরকার তৈরিতে সরাসরি অংশ নেন। অর্থাৎ জনগণের সরকার তাঁদের মতামত বাদ দিয়ে গঠিত হওয়ার সুযোগ নেই। একটি সরকার কাদের দ্বারা এবং কাদের জন্য পরিচালিত হবে তা জনগণই ঠিক করেন তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে। তাই নিজ নিজ ভোটাধিকার বাঁচানো প্রতিটি সচেতন নাগরিকের অবশ্যকর্তব্য। এই ব্যাপারে বাংলার মানুষ সবচেয়ে বেশি সচেতন ঐতিহাসিক কারণে। স্বাধীনতার শর্ত হিসাবে এই দেশ ১৯৪৭ সালে তিন টুকরো হয়েছিল। ক্ষমতালোলুপ রাজনীতির কারবারিদের উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্য সর্বাধিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল বাংলা ও বাঙালি। গত আট দশকেও বাঙালির সেই ঠাঁইনাড়া দশা কাটেনি। লক্ষ লক্ষ বাঙালি আজও জানে না, কোনটা তার প্রকৃত দেশ। এপার ওপার দুপারেই ধাক্কা খায় সেই দুর্ভাগারা। বাংলাদেশ এবং অসমে তাঁদের উপর নেমে আসা অত্যাচার সারা দুনিয়া জানে। বাঙালিরা এতদিন পশ্চিমবঙ্গে অন্তত নিশ্চিন্ত ছিল। সুখে শান্তিতে বসবাস করছিল।
মাসকয়েক আগে ওঠা এসআইআর ধুয়ো বাঙালির সেই শান্তি তছনছ করে দিয়েছে। সামনে এসেছে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বার করে দেওয়ার অতিসক্রিয়তা। বারবার চেষ্টা করেও তাঁরা চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নিজেদের নাম দেখতে পাচ্ছেন না। তাঁদের ভিতরে কাজ করছে ডিটেনশন ক্যাম্প, পুশব্যাক এবং রাষ্ট্রবিহীন হয়ে পড়ার আতঙ্ক। পাশের দেশ মায়ানমারে রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন যাবৎ নিজভূমে পরবাসী। বাঁচার আশায় পরিবার পরিজন নিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নরনারী এ-দেশ সে-দেশ ছুটে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু কোনো দেশই তাঁদের গ্রহণ করছে না। তাঁদের কুকুর-বিড়াল, এমনকি ‘অপরাধী’ পর্যন্ত জ্ঞান করা হচ্ছে। ফিলিস্তিনি জনগণ এবং শ্রীলঙ্কায় তামিল জনগোষ্ঠীর দশাও অনুরূপ। সব মিলিয়ে বহু দেশের মানবেতর দৃশ্য মন খারাপ করে দেয়। এবংবিধ দুশ্চিন্তা, এসআইআরে ‘ব্রাত্য’ ঘোষিত বহু মানুষের জীবনের প্রতি ভালোবাসা কেড়ে নিচ্ছে। ভোটার এবং বিএলও মিলিয়ে ইতিমধ্যে শতাধিক নরনারী আত্মঘাতী হয়েছেন মোদি সরকারের এসআইআর ধুয়োয়।
কিন্তু এই অনাচার কি চলতেই থাকবে? পরিষ্কার করে দিয়েছে দেশের শীর্ষ আদালত। বুধবার এই সংক্রান্ত এক মামলায় বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী মন্তব্য করেন, ‘কারো ভোটাধিকার চিরকালের জন্য কেড়ে নেওয়া যায় না!’ সুপ্রিম কোর্টের সাফ কথা, তালিকা থেকে নাম বাদ গেল কেন, ভোটারকে তা জানাতেই হবে। বস্তুত নাগরিকের অধিকার রক্ষার বিষয়টি সম্পর্কে জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। ভোটগ্রহণ শিয়রেই। ৬ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফার মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষদিন। মনোনয়ন পেশের শেষদিন পর্যন্তই যাঁদের নাম তালিকায় থাকবে, তাঁরাই এবার ভোট দেওয়ার জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন। দ্বিতীয় দফা মনোনয়নের শেষদিন ৯ এপ্রিল। এখনো ‘বিচারাধীন’ ও ইতিমধ্যেই ‘ডিলিটেড’ তালিকাভুক্ত ভোটারদের মধ্যে এই প্রশ্নে উৎকণ্ঠা বাড়ছে যে, সব মিলিয়ে যা পরিস্থিতি তাতে এবার তাঁরা ভোট দিতে পারবেন কি? এই প্রসঙ্গে এদিন মামলার শুনানিতে দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত জানান, পশ্চিমবঙ্গের মোট ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জন ভোটার বিচারাধীন। তাঁদের মধ্যে ৪৭ লক্ষ ৩০ হাজারের সমস্যার নিষ্পত্তি হয়েছে। ৭ এপ্রিলের মধ্যে যাবতীয় নিষ্পত্তি হয়ে যাবে বলেই কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি জানিয়েছেন। যদিও এর মধ্যে কতজনের নাম অন্তর্ভুক্ত আর কত বাতিল হচ্ছে তা স্পষ্ট করেনি কমিশন। অনুমান করা হচ্ছে, নাম অন্তর্ভুক্তি ও বাতিলের হার যথাক্রমে ৫৫ ও ৪৫ শতাংশ। ফলে, মনোনয়নের আগে এই বিপুল সংখ্যক ডিলিটেড ভোটারদের বিষয়টির নিষ্পত্তি কীভাবে সম্ভব? এই পর্বে শেষমেশ যাঁরা বাদ রয়ে যাবেন, ট্রাইবুনালের ছাড়পত্র পেলেও তাঁরা ভোট দিতে পারবেন কি? সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন। রাষ্ট্রের ব্যর্থতায় কিছু নাগরিকের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ণ হলে সেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন রয়ে যাবে। রাজ্যবাসীর শেষ ভরসা শীর্ষ আদালত। সকলের পক্ষে গ্রহণযোগ্য সুরাহার সন্ধান তারাই দেবে, নাগরিকের অধিকার রক্ষায় যথোচিত পদক্ষেপ করবে তারা, এমনই আশা থাকবে। কারণ আদালতের কাছে সংবিধান এবং নাগরিকের অধিক গুরুত্বপূর্ণ কেউই নয় নিশ্চয়।