Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দায়িত্ব মানুন শাহ

পরিবেশ দূষণের জন্য ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা দিল্লিবাসীর। এবার তারই মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে অন্য বিষবাষ্প। তাতে বিপন্ন বোধ করছে রাজধানীসহ সারা দেশ। সৌজন্যে পাক মদতপুষ্ট জঙ্গিবাহিনী।

দায়িত্ব মানুন শাহ
  • ১২ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পরিবেশ দূষণের জন্য ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা দিল্লিবাসীর। এবার তারই মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে অন্য বিষবাষ্প। তাতে বিপন্ন বোধ করছে রাজধানীসহ সারা দেশ। সৌজন্যে পাক মদতপুষ্ট জঙ্গিবাহিনী। সম্ভবত একই কায়দায় ভারতের নানা শহরে পরপর হামলার ছক কষেছিল আইএস। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে অস্ত্র হাতবদলের সময়ই অভিযান চালায় গুজরাত পুলিশের এটিএস। তাতেই ওই রাজ্যে শুক্রবার ধরা পড়ে তিন জঙ্গি। তাদের মধ্যে একজন আবার ডাক্তার! ধৃতদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র এবং বিপজ্জনক রাসায়নিক। ধৃতরা জেরায় জানিয়েছে, প্রাণঘাতী ‘রাইসিন’ বিষ তৈরির জন্যই ক্যাস্টর অয়েল ব্যবহার করা হত। অর্থাত্, আর শুধু গুলি নয়, বিষ ছড়িয়েও গণহত্যার ছক কষেছিল আইএস। গুজরাত এটিএস জানিয়েছে, ধৃতদের নাম আহমেদ মহিউদ্দিন সৈয়দ, মহম্মদ সুহেল এবং আজাদ সুলেমান সাইফি। হায়দরাবাদের বাসিন্দা সৈয়দ (৩৫) চীনে ডাক্তারি পড়েছে। সুহেল ও আজাদ নামে অন্য দুজন ইউপির বাসিন্দা। দুজনেই মাদ্রাসায় পড়াকালে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ে। লখনউ, দিল্লি, আমেদাবাদের জনবহুল এলাকা তারা ঘুরে দেখেছিল বলে জানতে পেরেছে এটিএস। গিয়েছিল কাশ্মীরেও। খবর মেলে যে, সৈয়দ আমেদাবাদে ঢোকার প্ল্যান নিয়েছে। আজাদ ও সুহেল রাজস্থান থেকে অস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম আনে। সেগুলি লুকোনো ছিল গান্ধীনগরের একটি কবরখানায়। সেসব হায়দরাবাদ নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল সৈয়দের। কিন্তু শুক্রবার গান্ধীনগরে একটি টোল প্লাজার কাছে তাকে ধরে ফেলে এটিএস। তারপর ধরা হয় বাকি দুজনকেও। ইসলামিক স্টেট-খোরাসান প্রভিন্সের সদস্য আবু খাদিমের সঙ্গে সৈয়দের যোগাযোগ ছিল। খাদিমই সৈয়দকে ভারত-বিরোধী কার্যকলাপের জন্য অর্থসংগ্রহ এবং জঙ্গি নিয়োগের কাজে নামায়। অপারেশন সিন্দুরের পরই পাক মদতপুষ্ট জঙ্গি সংগঠনগুলি ভারতে নাশকতার ছকে বদল এনেছে। এখবর ছিলই। গোয়েন্দারা আরও জেনেছিলেন, আইএসকেও ব্যবহার করা হচ্ছে। গত জুলাই মাসে বেঙ্গালুরুতে অভিযান চালিয়ে একিউআইএসের এক মহিলাসহ পাঁচ জঙ্গিকে গ্রেফতার করেছিল গুজরাত এটিএস। এরপর উত্সবের মরশুমে চার রাজ্যে অভিযান চালিয়ে আইএসের পাঁচ জঙ্গিকে ধরা  হয়। এবার ফের জালে আইএসের তিন জঙ্গি। ওইসঙ্গে গোয়েন্দাদের কপালের ভাঁজ আরও চওড়া হয়। 

Advertisement

বাস্তবে সেই আশঙ্কাই সত্যি হল। হল না শেষরক্ষা। সোমবার ভরসন্ধ্যায় জঙ্গি হামলাই ঘটল রাজধানী দিল্লির বুকে। একেবারে লালকেল্লার সামনে এক চলন্ত গাড়ির মধ্যে আচমকা বিস্ফোরণ ঘটে গেল! কেঁপে উঠল পুরোনো দিল্লির বিস্তীর্ণ অঞ্চল। ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে কয়েকজনের দেহ। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়েছে একাধিক ব্যক্তির এবং হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন অনেকে। গোটা দিল্লিই শুধু নয়, দেশজুড়ে হাই অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। হুঁশিয়ার করা হয়েছে ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত এলাকাতেও। ঘটনার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘটনাস্থলে যান। জঙ্গিযোগের সন্দেহ করেছেন তিনিও। স্বভাবতই বিষয়টি নিয়ে জল্পনা-চর্চা হচ্ছে যে, তবে কি অপারেশন সিন্দুরের বদলা নিল লস্কর-জয়েশ? ২০০১ সালের পার্লামেন্ট অ্যাটাকের পর আর ‘আত্মঘাতী’ জঙ্গি হামলা দিল্লিতে হয়নি। সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানী দিল্লিতেই ঘটল গাড়িতে বিস্ফোরণ! এই ‘মোডাস অপারেন্ডির’ সঙ্গে ফিরে আসছে হিজবুল মুজাহিদিনের অতীত কর্মকাণ্ডের বিষাদময় স্মৃতি। ২০০৫-এ দীপাবলির আগের রাতে পাহাড়গঞ্জ, লাজপতনগর এবং গোবিন্দপুরীর বিস্ফোরণে ২১০ জনের মৃত্যু হয়। বিস্ফোরক রাখা ছিল গাড়িতে ও বাসে। ২০১১ সালে দিল্লি হাইকোর্টের রিসেপশনে রাখা হয় আরডিএক্স। বিস্ফোরণে প্রাণ যায় পাঁচজনের। ফের একই সূত্রে লালকেল্লা ও নাশকতার ইঙ্গিত। মনে করিয়ে দিচ্ছে লস্করের অতীত হামলাও। ২০০০ সালে এই লালকেল্লার মধ্যেই চলেছিল গুলি। সোমবারের রোমহর্ষক কাণ্ডের পর হরিয়ানা রেজিস্ট্রেশনের আই-টুয়েন্টি গাড়ির পুরোনো ‘মালিক’ সলমনকে দ্রুত গ্রেফতার করা হয়। পুলওয়ামার বাসিন্দা তারিক গাড়িটি কিনেছিল। তাতেই জঙ্গিযোগের আশঙ্কা বেড়েছে। দিল্লি পুলিশের পাশাপাশি এনআইএ, এনএসজি, এটিএস এবং ফরেন্সিকের স্পেশাল টিম তদন্তে নেমেছে। হরিয়ানার সীমান্তবর্তী ফরিদাবাদ থেকেই সকালে পাওয়া গিয়েছে প্রায় তিন হাজার কেজি বিস্ফোরক তৈরির উপকরণ! গ্রেফতার হয় তিন ডাক্তারও। তদন্তে প্রকাশ, তারা নাকি গোটা উত্তর ভারতে জঙ্গিজাল বিস্তারে মরিয়া। মগজধোলাই করে সাধারণ যুবকদের ভারত-বিরোধী কার্যকলাপে যুক্ত করার নষ্টামি এতদিন করেছে জঙ্গি সংগঠনগুলি। অপারেশন সিন্দুরের পর সেই কৌশলে বদল তো তাহলে অভাবনীয়!
সব মিলিয়ে যা পরিস্থিতি, তাতে মোদি সরকারের বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো নীতিই প্রকট হচ্ছে। পদে পদে ব্যাহত হচ্ছে নাগরিকের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা। বিপন্ন বোধ করছে গোটা দেশ। এই ভয়াবহ কাণ্ড কোনও বিরোধী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক্তিয়ারে ঘটলে বিজেপির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কী হত? দলের চুনোপুঁটি থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, এমনকি প্রধানমন্ত্রীও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল নেতার পদত্যাগ দাবি করে বসতেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অবিলম্বে সেই দৃষ্টান্তই স্থাপন করা উচিত নয় কি? সর্বোচ্চ পর্যায়ের তদন্ত যা চলছে তা তো হবেই।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ