Bartaman Logo
২৪ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

হেনস্তা, রাস্তায় মার অভিষেককে, তৃণমূল সাংসদকে চড়-ঘুসি-ডিম-জুতো সোনারপুরে

ভোট-পরবর্তী সন্ত্রাসে খুন হয়েছেন দলীয় কর্মী। শোকসন্তপ্ত সেই পরিবারকে সমবেদনা জানাতে গিয়ে শনিবার বিকেলে সোনারপুরের কামরাবাঁধ এলাকায় আক্রান্ত হলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

হেনস্তা, রাস্তায় মার অভিষেককে, তৃণমূল সাংসদকে চড়-ঘুসি-ডিম-জুতো সোনারপুরে
  • ৩১ মে, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: ভোট-পরবর্তী সন্ত্রাসে খুন হয়েছেন দলীয় কর্মী। শোকসন্তপ্ত সেই পরিবারকে সমবেদনা জানাতে গিয়ে শনিবার বিকেলে সোনারপুরের কামরাবাঁধ এলাকায় আক্রান্ত হলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রকাশ্য রাস্তায় মারা হয় তাঁকে। সকাল থেকেই সেখানে বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিয়েছিল বিজেপির কর্মী-সমর্থকরা। অভিষেক মোটরবাইকে চড়ে দলীয় কর্মীর বাড়ির কাছাকাছি আসামাত্র দেখানো হয় কালো পতাকা। শুরু হয় ‘চোর চোর’ এবং ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান। তাঁকে লক্ষ্য করে নাগাড়ে ডিম ও ঢিল ছুড়তে শুরু করে গেরুয়া সমর্থকরা। বাইক থেকে নেমে, হেলমেট পরে সেই হামলা থেকে বাঁচার চেষ্টা করেন ডায়মন্ডহারবারে সাংসদ। তাতেও রেহাই মেলেনি। শারীরিকভাবে নিগ্রহ করা হয় তাঁকে। শুধু জুতো, চটি ছোড়া নয়, চলে ব্যাপক কিল, চড়, ঘুষি। কলার টেনে ছিড়ে দেওয়া হয় জামা। মারধর করার সময় ভেঙে যায় অভিষেকের চশমা। মারমুখী জনতার হাত থেকে তৃণমূল সেনাপতিকে রক্ষা করতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হন দুই দেহরক্ষী এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের একটা অংশও। তাঁরা না থাকলে, বড়ো কোনো অঘটন ঘটে যেতে পারত। 

Advertisement

অভিষেকের এই কর্মসূচি ছিল পূর্বঘোষিত। তা সত্ত্বেও ঘটনাস্থলে পুলিশ তো দূরের কথা, সিভিক ভলান্টিয়ারদেরও দেখা মেলেনি। দেখা যায়নি ‘ডায়মন্ডহারবার মডেল’-এর অনুরাগী কর্মী-সমর্থকদের একজনকেও। বরং অভিষেক আসার অনেক আগেই বিজেপির মহিলা কর্মীদের মধ্যে ডিম বিতরণ করার ভিডিয়ো সামনে এসেছে। মারধর খাওয়া সত্ত্বেও পিছু হটেননি তৃণমূল সাংসদ। ছেঁড়া জামা, গোটা গায়ে ডিম মাখা অবস্থাতেই তিনি পৌঁছান খুন হওয়া দলীয় কর্মী সঞ্জু কর্মকারের শরৎপল্লির বাড়িতে। সমবেদনা জানান নিহতের বাবা পরেশ কর্মকার ও মা শুক্লাদেবীকে। বাইরে তখন কয়েকশো জনতার ভিড়। চলছে ‘চোর-চোর’ স্লোগান। বিজেপি সমর্থক বলে পরিচিত কয়েকজন মহিলা তখন ঝাঁটা হাতে ওই বাড়ির দরজায় তুমুল ধাক্কাধাক্কি শুরু করেন। দরজা ভাঙার চেষ্টাও চলে। সেই সময় ঘরের ভিতরে সঙ্গী সাংবাদিকদের অভিষেক বলেন, ‘ওরা আমায় মারতে চায়, মেরে দিক! আমি এখান থেকে যাব না। সঞ্জুর বৃদ্ধ বাবা-মাকে ছেড়ে কোথাও যাব না। আমি হাইকোর্ট ও রাজ্যপালের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এই বাড়ির দরজা ভাঙার চেষ্টা করছে। পুলিশের কেউ নেই এখানে। আমি এসপি এবং আইসিকে জানাতে বলেছি। এখনও কোনো বাহিনী আসেনি।’ 
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সোনারপুরের এই ‘তাণ্ডবপর্ব’ সম্প্রচারিত হতে থাকে। এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের সঙ্গে নিয়ে সোনারপুর থানার দু’জন পুলিশ আধিকারিক পৌঁছান শরৎপল্লিতে। খানিক বাদে থানার আইসি আসেন আরও বড়ো বাহিনী নিয়ে। ঘিরে ফেলা হয় গোটা বাড়ি। তার মধ্যেও বাইরে বিক্ষোভ চলছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে যেতে হয় কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের। কোনোক্রমে অভিষেককে গাড়িতে তুলে রওনা করানো হয়। গাড়িতে ওঠার সময়ও ফের ছোড়া হয় ডিম, জুতো ও চটি। শহরে ফিরে স্বাস্থ্যপরীক্ষার জন্য সাংসদকে নিয়ে যাওয়া হয় ইএম বাইপাস সংলগ্ন বেসরকারি হাসপাতালে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে পৌঁছে যান তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়। শোভন বলেন, অভিষেকের চোখ, মুখ সহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত লেগেছে। বড়ো অঘটন ঘটতে পারত। এই পর্বেই মমতা অভিযোগ করেন, এখানে ঠিকমতো চিকিৎসা হচ্ছে না অভিষেকের। ওই বেসরকারি হাসপাতাল থেকে তাঁকে বের করে মধ্য কলকাতার একটি নার্সিংহোমে নিয়ে যান প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে আইটিইউতে নিয়ে যাওয়া হয় ডায়মন্ডহারবারের সাংসদকে। রাতে অবশ্য সেই নার্সিংহোমের তরফে জানিয়ে দেওয়া হয়, অভিষেকের আঘাত গুরুতর নয়। ওঁর বুকে সামান্য আঘাত রয়েছে। তবে এখনই তাঁকে ভরতি করার প্রয়োজনীয়তা নেই। পরে মমতা দাবি করেন, অভিষেককে ভরতি না নেওয়ার জন্য হাসপাতালগুলিকে চাপ দিয়েছে বিজেপি। এই হামলার প্রতিবাদে শনিবার রাতে চুঁচুড়া ও কামারহাটিতে প্রতিবাদ মিছিল হয়। আজ রাজ্যজুড়ে পথে নামবে তৃণমূল কর্মীরা। আগামী ২ জুলাই রানি রাসমণি অ্যাভিনিউয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন তৃণমূল সুপ্রিমো স্বয়ং। 
গোটা ঘটনার দায় অবশ্য নিতে নারাজ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তিনি সাফ জানিয়েছেন, এই ঘটনার সঙ্গে বিজেপি কোনোভাবেই যুক্ত নয়। কোনো হেনস্তার ঘটনাকে সমর্থন করে না তাঁর দল। যদিও অভিষেকের উপর আক্রমণের যে ছবি সংবাদমাধ্যমে সম্প্রচারিত হয়েছে, তাতে যে সমস্ত মারমুখী পুরুষ ও মহিলাকে দেখা যাচ্ছে, তারা এলাকায় বিজেপি কর্মী-সমর্থক বলেই পরিচিত। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিষেককে ঘিরে বিক্ষোভ দেখানোর বিষয়টি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। সেজন্য এদিন সকালেই সোনারপুর ব্লকের পোলঘাট গ্রাম পঞ্চায়েতের অস্থায়ী মহিলা কর্মীদের নিয়ে আসা হয়েছিল। বিরিয়ানি খাওয়ানো হয় তাঁদের। বিকেল পাঁচটা নাগাদ অভিষেক এলাকায় এলে তাঁদের দিয়েই বিক্ষোভ দেখানো হয়, ছোড়া হয় ডিম। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ