সুদীপ্ত রায়চৌধুরী, কলকাতা: সুপ্রিম কোর্টের নজিরবিহীন রায়ে এক লহমায় চাকরিহারা প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-অশিক্ষক কর্মচারী। যোগ্য-অযোগ্য কারা? কী হলে কী হতে পারত? আলোচনার অন্ত নেই। রাজনৈতিক ফায়দা তোলার লোভে আসরে নেমে পড়েছে বিরোধী দলগুলিও। ট্রেন-বাস-চা দোকান থেকে সোশ্যাল মিডিয়া—সর্বত্র একটাই আলোচনা, চাকরি হারালেন যাঁরা, তাঁদের কী হবে?
তর্ক-বিতর্ক চলছেই। তার মধ্যেই শোনা যাচ্ছে একটুকরো আশার খবর, নতুন করে পরীক্ষার সম্ভাবনা। কিন্তু এতগুলি বছর যাঁরা শুধুই পড়িয়েছেন, হঠাৎ করে বললেই কি তাঁরা পরীক্ষার বসে ফের সফল হতে পারবেন? শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত অনেকেই বলছেন, বিষয়টা সত্যিই কঠিন। কারণ ক্লাসে পড়ানো, আর চাকরির পরীক্ষায় বসার মধ্যে ফারাক বহু যোজনের। এর জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত প্রস্তুতির। আর সেকথা মাথায় রেখেই সদ্য চাকরিহারাদের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে এলেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষজন। লেখক সৌরভ মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘ডোমজুড় ও সন্নিহিত এলাকায় কোনও কর্মরত ইংরেজি শিক্ষক আদালতের রায়ে কর্মহীন হয়ে পড়লে, সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে আগামী পরীক্ষা-প্রস্তুতির জন্য আমি তাঁদের সাহায্য করতে প্রস্তুত।’ অপর এক লেখক, উত্তর ২৪ পরগনার বাগদার পার্থ করও বিনা সাম্মানিকে জুলজি পড়াতে চান বলে জানিয়েছেন।
একটা সময় নিয়মিত চাকরির পরীক্ষার জন্য ছাত্রছাত্রীদের প্রশিক্ষণ দিতেন কল্যাণীর বাসিন্দা শাশ্বতী দত্ত রায়। এতদিন তা বন্ধ রাখলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে যাঁরা ‘যোগ্য অথচ চাকরি হারিয়েছেন’, তাঁদের প্রতীকী এক টাকা সাম্মানিকের বিনিময়ে বাংলা পড়াবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। অনলাইন বা অফলাইনে বিনা পারিশ্রমিকে আগ্রহীদের পাশে দাঁড়াতে বার্তা দিয়েছেন নদীয়ার আড়ংঘাটা হাইস্কুলের ইংরেজির দুই শিক্ষক বরুণ সেনগুপ্ত ও সুরঙ্গমা গোস্বামী। সিস্টার নিবেদিতা গভর্নমেন্ট কলেজের অধ্যাপক শেখ জহিরুদ্দিনও বিনা সাম্মানিকে ফিজিক্স পড়াবেন বলে ঘোষণা করেছেন। শুধু সরকারি চাকরির প্রস্তুতিই নয়, চাকরিহারা কোনও শিক্ষক-শিক্ষিকা যদি অন্য পেশায় পা রাখতে চান, তার জন্যও এগিয়ে এসেছেন কেউ কেউ। বিনামূল্যে তথ্যপ্রযুক্তি সেক্টরে চাকরির স্কিল ডেভেলপমেন্ট ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি প্লেসমেন্টের ব্যবস্থাও করা হবে বলে জানিয়েছেন একটি প্রশিক্ষণ সংস্থার প্রধান নির্মাল্য সেনগুপ্ত।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তার মধ্যেই আগামীর পরীক্ষার দিকে মনোনিবেশের চেষ্টা করছেন শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কেউ কেউ। কিন্তু একটা বড় অংশই সুপ্রিম রায়ের অভিঘাত সামলে উঠতে পারেননি। নাম গোপন রেখে সোশ্যাল মিডিয়ার একটি কনফেশন গ্রুপে ‘আত্মহত্যা ছাড়া আর উপায় নেই কোনও’ বলে পোস্ট করেছেন একজন। এই পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে এসেছেন একাধিক মনোবিদ। চাকরিহারাদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন মনোবিদ অনিকেত চট্টোপাধ্যায় ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট পল্লবী মজুমদার। পারিবারিক বা পেশাগত সমস্যায় বিনামূল্যে কাউন্সেলিং করবেন বলে জানিয়েছেন মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী আদিত্য পাল।
পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। তার পরেও বহু মানুষ এগিয়ে এসে যেভাবে একসঙ্গে বেঁধে বেঁধে থাকার বার্তা দিয়েছেন, তাতেই আশার আলো দেখছে নাগরিক সমাজ।