বয়স ৩৮। ক’দিন পরেই পা দেবেন ৩৯’এ। কিন্তু পারফরম্যান্স দেখে তা বোঝার উপায় নেই। ভারতীয় সময় বুধবার সকালে দুরন্ত হ্যাটট্রিকে আলজেরিয়াকে দুরমুশ করল আর্জেন্তিনা। বলা ভালো, এক এবং অদ্বিতীয় এলএমটেন। তাঁর ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে চলতি বিশ্বকাপ হয়ে উঠল মেসিময়। তিনটি গোলেই শিল্পের ছোঁয়া। তাছাড়া তিনি বল ধরলেই সবুজ ক্যানভাসে যেন নানা রঙের তুলির টান। কখনও চমৎকার ডজ, আবার কখনও বা নিখুঁত লক্ষ্যভেদ— সব যেন আগে থেকে ছকে রাখা।
বুধবার সকালে (ভারতীয় সময়) জ্যাজের শহর কানসাস সিটিতে মেসির হ্যাটট্রিক যেন আফ্রিকান ছন্দ এবং ইউরোপিয়ান সুরের সংমিশ্রণ। ইম্প্রোভাইজশন, ছন্দের বৈচিত্র্য ও ব্লু নোট। গ্যালারিতে আর-হে-ন্তিনা, আর-হে-ন্তিনা শব্দব্রহ্ম, জাতীয় পতাকা, স্কার্ফ, টুপিতে নীল-সাদা ঢেউ তাই উত্তাল। আবেগের বিস্ফোরণ কানসাস থেকে কলকাতায়। মঙ্গলবার রাতে ফ্রান্স-সেনেগাল দেখে মাত্র কয়েক ঘণ্টা ঘুম। মুঠোফোনে অ্যালার্ম সেট করে রাখা। তারপর তড়িঘড়ি উঠে চায়ের কাপ হাতে বাঙালি মেসি মোহে মজেছে। এরকম হ্যাটট্রিকের সাক্ষী থাকার জন্য অনায়াসে হাঁটা যায় কয়েকশো মাইল। কে বলবে, চোটের জন্য একটি প্রস্তুতি ম্যাচে খেলেননি তিনি।
এই বয়সে বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে হ্যাটট্রিক দ্বিতীয় কারও নেই। বছর তিনেক আগেই ইউরোপিয়ান সার্কিট ছেড়ে মায়ামিতে আস্তানা গেড়েছেন। কিন্তু ওই যে, ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট। আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম গোলটি তাঁর ইনস্টেপের জাদু। ম্যাচের ১৭ মিনিটে। রডরিগো ডে পলের বাড়ানো বল পেয়ে কয়েক কদম এগলেন মেসি। বক্সের সামনে আলজেরিয়ার দুই ডিফেন্ডার। মুহূর্তে ঝলসে উঠল তাঁর বাঁ পা। গোলরক্ষক লুকার হাতে লেগে বল জড়াল জালে। আনন্দে লাফালেন তিনি। সঙ্গেসঙ্গে গোটা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীরাও। গ্যালারিতে বসা বাবা জিদানের দৃষ্টিতে তখন শুধুই শূন্যতা। কারণ, দুর্গরক্ষার দায়িত্বে তাঁরই ছেলে। আর হ্যাঁ, তিনিও জানেন, এই গোলের জন্য মেসিকে পরিশ্রম করতে হয়নি, এটা সহজাত।
দ্বিতীয় গোলটি তো ঠিক সময়ে জায়গায় পৌঁছানোর ফসল। বিপক্ষ গোলরক্ষকের বুক থেকে বল ছিটকে আসা মাত্রই মেসির ক্ষিপ্রতা চিতার সমান। ডান পায়ের প্লেসিংয়ে জাল তো নড়বেই। এরপরেই গ্যালারিতে শুরু হয় হ্যাটট্রিকের প্রার্থনা। হতাশ করেননি ‘দ্য ম্যাজিশিয়ান’। ৭৬ মিনিটে ঝলসে উঠল সোনায় বাঁধানো ইনস্টেপ। ডানদিকে ঝাঁপালেন লুকা, কিন্তু দুর্গরক্ষার জন্য তা যথেষ্ট ছিল না।
হ্যাটট্রিকের পরেই মেসিকে তুলে নিলেন কোচ স্কালোনি। ডাগ-আউটের সামনে বসে বাকি সময় কাটল মহানায়কের। দেশের হয়ে ২০০তম ম্যাচে তিনি একাই একশো। পারফরম্যান্স দেখে কে বলবে, এটা তাঁর ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। গোলসংখ্যা আপাতত ১৬। তা সত্ত্বেও স্টেডিয়াম ছাড়ার মুহূর্তে মেসি অদ্ভূত রকমের শান্ত। শুধু বললেন, ‘দর্শকদের ধন্যবাদ। প্রথম ম্যাচ সহজে জিততে পেরে ভালো লাগছে। ক্লোজে-রোনাল্ডোদের পাশে থাকা সত্যিই গর্বের। তবে দিনের শেষে এগুলো শুধুই পরিসংখ্যান।’ এই মেসির জন্য মাঠে প্রাণ দিতে পারেন লাওতারো মার্তিনেজ-ম্যাক অ্যালিস্টাররা। কোচ লায়োনেল স্কালোনিও সাংবাদিক সম্মেলনে বলতে পারেন, ‘যে কোনো প্রয়োজনে মেসির পরামর্শ নিই। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ওর অভিজ্ঞতা আর্জেন্তিনার সম্পদ।’
আজও ফুটবল দেবতা ভর করেন তাঁর উপর। আজও ঝলসে ওঠে তাঁর বাঁ পায়ের কামান। আজও তাঁর মাঠে থাকা-না থাকা গড়ে দেয় ফারাক। এই ৩৯-এর দোরগোড়াতেও।
কে বলবে, ভগবান বৃদ্ধ হয়েছেন?