নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: গায়ে লাল জার্সি। পিছনে লেখা লামিনে। রাত জেগে বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখার উন্মাদনা এতটাই বেশি যে, সাতসকালেই পাড়ার ক্লাবে হাজির ছোট্ট চিভান। সবে এগারোতে পা দিয়েছে সে। ঠাকুরপুকুর বিবেকানন্দ সংঘের মাঠে রবিবার সকালে সে-ই যেন হত্তাকত্তা। বারবার তার মুখে চারটি শব্দ ঘুরে ফিরে আসছে— বার্সেলোনা-স্পেন-ইয়ামাল-ট্রফি।
পাশে দাঁড়িয়ে হাসছেন ২৪ বছরের তরুণী অরনা। তিনিও বার্সেলোনার বড়ো ভক্ত। তবে আইকন আলাদা। ২০১২ সালে বার্সেলোনার হয়ে মেসির বিধ্বংসী ফর্ম দেখার পর এই দলের প্রতি ভালোবাসা জন্মায় অরনার মনে। এক বছরে ক্লাবের হয়ে ৬৮টি ম্যাচে ৯১ বার বিপক্ষের জাল কাঁপিয়েছেন লিও। সেই পরিসংখ্যান হয়তো তিকি-তাকায় তাজ্জব হওয়া ছোট্ট চিভানদের অজানা। কিন্তু, ২০১২ সালে ক্লাব পর্যায়ে মেসির সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ১৪ বছর পরও টাটকা অরনাদের মতো আর্জেন্তিনার সমর্থক তথা মেসিভক্তদের মনে। তাই ছোট্ট চিভানের মুখে ইয়ামাল প্রীতি শুনে হয়ত অরনা ভাবলেন, খেলা তো হবে নিউ জার্সির মাঠে।
মেসি-ইয়ামাল যুদ্ধকে ঘিরে রবিবার সকাল থেকেই শহরজুড়ে পাড়ায় পাড়ায় শুরু হয়েছে খেলা দেখার প্রস্তুতি। তাতে যোগ দিয়েছেন দু’পক্ষের সমর্থকরা। তবে এদিন সকালে মুখ ভার ছিল একপক্ষের। আর সেলিব্রেশনে মেতেছিল অপরপক্ষ। তবে চিভান ও অরনাদের মতো বার্সেলোনার সমর্থকদের প্রত্যাশার ভাঁড়ার কানায় কানায় পূর্ণ। এদিন সকাল থেকেই টালা থেকে তারাতলা যেন ফুটবল জ্বরে তপ্ত। এদেশে ‘ফুটবলের মক্কা’ কলকাতা। বিশ্বকাপ মানেই শহর দু’ভাগে বিভক্ত। একপক্ষ ব্রাজিল হলে অন্যপক্ষ অবশ্যই আর্জেন্তিনা। তবে ২০১০ সালে ইনিয়েস্তা-জাভিদের তিকি-তাকা শহরবাসীর মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিল। তখন থেকেই স্পেনকে ভালোবাসা দিতে পিছপা হয় না কলকাতা।
দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জ থানার আশপাশের এলাকা দেখলেই স্পষ্ট হবে কেন এই শহর ‘ফুটবলের মক্কা’ বলে পরিচিত। চারদিকে আর্জেন্তিনার পতাকা আর মেসির ছবিতে ছেয়ে গিয়েছে। সকাল থেকেই চলল ম্যাচ দেখার তোড়জোড়। স্থানীয় ক্লাবে বসানো হয়েছে জায়ান্ট স্ক্রিন। একই ছবি বেহালা, ঠাকুরপুকুর থেকে গড়িয়া, টালিগঞ্জে। তবে সকাল থেকেই প্রতিকূল আবহাওয়া। তাই ম্যাচ দেখতে অনেকেই ত্রিপল জোগাড় করেছেন। বেহালার আমরা ক’জন ক্লাবের মাঠ ঢাকা হয় ত্রিপল দিয়ে। বাইরের চাতালে বের করা হয়েছে এলইডি টিভি। ক্লাবের সম্পাদক বাবাই চৌধুরীর দাবি, নীল-সাদা জার্সিতে ফুটবল দেবতার হাতে আরেকবার বিশ্বকাপ দেখতে চাই। এভাবেই শেষ হোক ২৫ বছরের অধ্যায়। উত্তর কলকাতার সিমলা স্ট্রিট, বিবেকানন্দ রোড সংলগ্ন সব এলাকায় আর্জেন্তিনার পতাকার রমরমা। তার মধ্যে কোথাও কোথাও উঁকি দিচ্ছে স্পেনের পতাকা। কারণ তিকি-তাকার ট্যাকটিকাল ফুটবলে দ্বিতীয়বারের জন্য বিশ্বকাপ জিততে চাইছে কলকাতার স্পেনের সমর্থকরা। অনেকেই বললেন, এই যুদ্ধটা বার্সেলোনার নবীন-প্রবীণের। আর জয় যারই হোক, আদতে বার্সেলোনাই জিতবে। কারণ মেসি হোক বা ইয়ামাল— দু’জনেরই উত্থান বার্সেলোনা থেকে। ফড়িয়াপুকুরে তোলা নিজস্ব চিত্র