নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ভূরি ভূরি অনিয়ম! দুর্গাপুজো হোক বা যে কোনো অনুষ্ঠান—বহু মানুষের সমাগম হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে কিছু বিশেষ ব্যবস্থা ও সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। এক্ষেত্রে ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটির (এনডিএমএ) গাইডলাইন মেনেই এগয় পুলিশ। চোরবাগানের পুজো উদ্যোক্তারা সেই গাইডলাইনের ধারপাশ দিয়েও হাঁটেননি। তারপরও যৌথ পরিদর্শনে যাওয়া প্রশাসনিক আধিকারিকরা এই পুজোকে ছাড়পত্র দিলেন কীভাবে? দুর্গাপুজোর প্রথম সপ্তমীর রাতে চোরবাগান মণ্ডপে ১৯ জনের পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর তদন্ত এগতেই প্রকাশ্যে আসছে এমন একাধিক অনিয়ম। সেই সূত্রে পুলিশের ভূমিকাও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। গোটা ঘটনার তদন্তের জন্য রাজ্য সরকার এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে ‘সিট’ গঠন করে দিয়েছে। পাশাপাশি, লালবাজারও আলাদা করে ‘সিট’ বা বিশেষ তদন্তকারী দল তৈরি করে তদন্ত চালাচ্ছে। তাদেরই তদন্তে সামনে এসেছে এমন একাধিক গুরুতর অনিয়ম। সেই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, এসব কেন প্রশাসনের নজরে এল না? তখনই বিষয়টি নিয়ে কড়াকড়ি করলে এত বড়ো ঘটনা হয়তো আটকানো যেত! তাহলে কি ‘প্রভাবশালী’ কারও অঙ্গুলিহেলনেই পুজো কমিটি যাবতীয় নিয়মকানুনকে থোড়াই কেয়ার করেছে? সূত্রের খবর, এ সংক্রান্ত উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ হাতে এলে সংশ্লিষ্ট ‘প্রভাবশালীদের’ জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হতে পারে।
এনডিএমএ’র গাইডলাইনে স্পষ্ট বলা আছে, এসব ক্ষেত্রে মণ্ডপে ঢোকার রাস্তার তুলনায় বেরনোর রাস্তা বেশি চওড়া রাখতে হবে। বিপর্যয় বা আপৎকালীন পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে তিন থেকে চারটি ইমার্জেন্সি গেট রাখতে হবে। পুলিশ-প্রশাসনকে স্পষ্ট রুট ম্যাপ তুলে দিতে হবে উদ্যোক্তাদের। আবদ্ধ জায়গায় প্রতি স্কোয়ার মিটারে কতজন একসঙ্গে দাঁড়াতে পারবে, কোনো অস্থায়ী কাঠামো থাকলে তা কতজনের ভার নিতে পারবে, এসবও যাচাই করে নেওয়ার কথা বলা আছে গাইডলাইনে। কিন্তু ‘সিট’-এর তদন্তে জানা যাচ্ছে, চোরবাগানে এসবের কোনো মূল্যায়নই করেননি উদ্যেক্তারা। ফলে সম্ভাব্য ভিড় নিয়ে কোনো অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট জমা পড়েনি পুলিশের কাছে। এখানেই প্রশ্ন, তাহলে যৌথ পরিদর্শনে যাওয়া অফিসাররা এসব তথ্য চাইলেন না কেন?
তদন্তকারীদের আরও নজরে এসেছে, চোরবাগানে দর্শনার্থীদের বেরনোর রাস্তা প্রবেশপথের চেয়ে সংকীর্ণ ছিল। ইর্মাজেন্সি এক্সিটের কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়নি। সূত্রের খবর, এই ঘটনায় যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁরা প্রত্যেকেই দাবি করেছেন, সবই হয়েছে বড়োদের নির্দেশে! এই ‘বড়ো’রা আসলে কে বা কারা, সেটাই খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
লালবাজার আরও জেনেছে, সপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগানে যখন ভয়াবহ ঘটনা ঘটছে, সেই সময় প্যান্ডেলে নজরদারির দায়িত্বে থাকা সেন্ট্রাল ডিভিশনের এক ডিসি নিজের জন্মদিন পালনে ব্যস্ত ছিলেন। ঘটনার পর ওই বার্থ ডে পার্টির বিষয়টি চেপে যাওয়ার চেষ্টা করেন সেন্ট্রাল ডিভিশনের অফিসাররা। কিন্তু হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠিত হতেই বিষয়টি আর গোপন থাকেনি। সূত্রের দাবি, পুলিশের শীর্ষকর্তারাই নিজেদের পিঠ বাঁচাতে এই বার্থ ডে পার্টির বিষয়টি ফাঁস করে দিয়েছেন। তাছাড়া, কলকাতার বড়ো প্যান্ডেলগুলিতে পুলিশ মোতায়েনের নথি ঘাঁটতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, চোরবাগানে ইনস্পেক্টরের নেতৃত্বে বাহিনী মোতায়েন হয়েছিল। সঙ্গত কারণেই পুলিশের অন্দরে প্রশ্ন, কেন ডিসি বা জয়েন্ট সিপি বা অ্যাডিশনাল সিপির নেতৃত্বে বাহিনী মোতায়েন হল না? কেন এত হালকাভাবে নেওয়া হল চোরবাগানকে?



