শতবর্ষে খিদিরপুর সর্বজনীন, দুর্গার সঙ্গে মিলেমিশে এক দেশমাতৃকা
  • ১০ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সোমনাথ বসু, কলকাতা: খুব যত্ন করে সাদা ধুতিতে লেপা হয়েছে মাটি। রোদে শুকিয়ে এবার তা লেখার জন্য তৈরি। আলতায় তুলি চুবিয়ে লেখা দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী স্লোগান, ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরীয়সী’, ‘নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্যঃ’। দুর্বল ব্যক্তি আত্মাকে লাভ করতে পারে না। এছাড়াও রয়েছে ‘বন্দেমাতরম’, ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য উচ্চ যেথা শির’। এলাকার তরুণ ও যুবকরাই দুর্গাপুজো আয়োজনে এগিয়ে এসেছেন। আর নেতৃত্বের গুরুভার কার কাঁধে? ৪৭ বছরের বারীন্দ্রকুমার ঘোষ। শক্তি আরাধনার আড়ালে জনসাধারণের মধ্যে স্বাধীনতা চেতনা জাগ্রত করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নির্দেশে খিদিরপুর ব্যায়াম সমিতিতে শুরু হল দুর্গাপুজো। সালটা ১৯২৭। পায়ে পায়ে একের পর এক দশক পেরিয়ে সেই আয়োজনই এবার শতবর্ষে। পুজোর পোশাকি নাম খিদিরপুর সর্বজনীন দুর্গোৎসব। 

Advertisement

এ পুজোর ইতিহাসে ধূপধুনোর পাশাপাশি রয়েছে বারুদের গন্ধও। শোনা যায়, ৩২ মুরারিপুকুর রোডের সেই বাগানবাড়িতে বসেই খিদিরপুরের এই পুজোর পরিকল্পনা করেছিলেন বারীন ঘোষ। আলিপুর বোমা মামলায় দোষী সাব্যস্ত থাকার জন্য প্রায় ১২ বছর (১৯০৯-১৯২০) কারাবাসও তাঁর দেশপ্রেমে একবিন্দু চিড় ধরাতে পারেনি। শহরে অনুশীলন সমিতির বিভিন্ন শাখায় দুর্গাপুজো আয়োজনের ভাবনা প্রথম এসেছিল নেতাজির মাথায়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলেন প্রিয় বারীনদার কাছে। কাজও শুরু হয় পরিকল্পনা মাফিক। খিদিরপুর অনুশীলন সমিতির যুবকদের নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক। ঠিক হল, মা দুর্গার পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে দেশপ্রেমের ভাবনা। আধুনিক প্রজন্ম যাকে থিম বলে। 
মণ্ডপের মধ্যে এবং তার আশপাশের বাড়ির দেওয়ালে জাতীয়তাবাদী স্লোগান লেখা চোখ এড়াত না ব্রিটিশ পুলিশের। পুজো শেষ হলেই তাই বারীন ঘোষের ডাক পড়ত থানায়। কেন লিখেছেন এরকম স্লোগান? শান্ত অথচ দৃপ্ত কণ্ঠে তাঁর জবাব ছিল, ‘এটাই খিদিরপুর সর্বজনীন দুর্গোৎসবের বিশেষত্ব। বলতে পারেন, দেশমাতৃকার সঙ্গে আমরা মিলিয়ে দিতে চেয়েছি দশপ্রহরণধারিণীকে।’ 
এবার পুজোর ভাবনায় প্রাধান্য পেয়েছে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’। অমর ঐতিহাসিক উপন্যাসে দেশমাতৃকা বা জন্মভূমির সঙ্গে মা দুর্গাকে মিলিয়ে দিয়েছেন সাহিত্যসম্রাট। ‘বন্দে মাতরম’ গানের একটি অংশে তিনি লিখছেন, ‘ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী...’।  তাই ‘আনন্দমঠ’-এর বিভিন্ন দৃশ্য, চরিত্র, প্রতীক ও ভাবনার মধ্যে দিয়ে উদ্যোক্তারা সাজিয়ে তুলেছেন মণ্ডপ। রয়েছে আনন্দমঠের অন্যতম প্রধান চার চরিত্রের (মহেন্দ্র, কল্যাণী, সত্যানন্দ ও দেবানন্দ) লাইভ শো। প্রতিমা সাবেকি ধাঁচের। দেখলে প্রণাম করতে বাধ্য হবেন দর্শনার্থীরা। সৃষ্টিসুখ ও দৃষ্টিসুখের আনন্দে চোখের কোণ ভিজে উঠলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। 
শতবর্ষেও সেই ‘বারুদের গন্ধ’ই যেন ফিরছে খিদিরপুরে। এই বারুদ আত্মপ্রত্যয়ের, দেশপ্রেমের, স্বাধীনতার সংগ্রামের সামনে নতজানু হওয়ার। তাই ভারতমাতার সঙ্গে মহিষাসুরমর্দিনীকে মেলানোর প্রচেষ্টায় ব্রতী খিদিরপুর সর্বজনীন দুর্গোৎসব। বারুদভরা ইতিহাসের স্পর্শে বর্তমানকে সাক্ষী রেখে উদ্যোক্তারা এগিয়ে যেতে চান সোনালি ভবিষ্যতের দিকে। বারীন্দ্রকুমার ঘোষ ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আদর্শই যে তাঁদের পাথেয়।
এভাবে ঐতিহ্য বুকে নিয়েই এগিয়ে চলা খিদিরপুর সর্বজনীন দুর্গোৎসবের। এখানে আড়ম্বরের থেকে নিষ্ঠাই বরাবর প্রাধান্য পেয়ে এসেছে। মা দুর্গার রং অতসী ফুলের মতো বা তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ। ‘অতসী পুষ্প-বর্ণাভাং সুপ্রতিষ্ঠাং সুলোচনম্’— মহিষাসুরমর্দিনী স্তোত্র অনুযায়ী শিল্পী গড়ে তোলেন দশপ্রহরণধারিণীকে। মহাষ্টমীর পুষ্পাঞ্জলির সময় শুধু পাড়া নয়, আশপাশের এলাকা থেকেও পুজোপ্রেমীরা ভিড় করেন মণ্ডপে। ধূপধুনোর গন্ধের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ। নিয়ম মেনে এখনও বিজয়া দশমীতেই মা পাড়ি দেন কৈলাসে।