Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কয়েকটা বেঁচে যাওয়া কন্যাভ্রূণ ও ভারত

রানি কি আজ একটু স্বস্তিতে? চোখ দিয়ে কি ওই জল গড়িয়ে পড়ছে? ভাবছে সে, এই জয় তারও? কতই বা বয়স ওর? মাত্র ১৪! গো-বলয়ের হোমে বড়ো হয়ে উঠছে সে।

কয়েকটা বেঁচে যাওয়া কন্যাভ্রূণ ও ভারত
  • ৪ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: রানি কি আজ একটু স্বস্তিতে? চোখ দিয়ে কি ওই জল গড়িয়ে পড়ছে? ভাবছে সে, এই জয় তারও? কতই বা বয়স ওর? মাত্র ১৪! গো-বলয়ের হোমে বড়ো হয়ে উঠছে সে। ভুল হল প্রতিদিন মানসিক হেনস্তা, আর নিরাপত্তাহীনতার খাদের ধারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে তাকে। আর ওই প্রতিটা দিন যেন এক একটা বছরের সমান। আড়ালে-আবডালে নয়! অনেকেই তাকে ডাক দেয় ‘ফেকিয়া’ বলে। বিশেষ করে ছেলেরা। ঘেন্নার চোখে তাকাত আগে, এখন সেই চাউনি লোভে বদলে গিয়েছে। ওর কোনও ইজ্জত আছে বলে সমাজের এই অংশটা মনে করে না। জন্ম হতেই পরিবার তাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। তাই তার নাম ‘ফেকিয়া’। এমন ফেকিয়া গো-বলয়ের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দেশের পশ্চিম প্রান্তের মরু অঞ্চল থেকে বিস্তীর্ণ গো-বলয়। আজ তারা দেখেছে হরমনপ্রীতের দৌড়। জয়ের দৌড়। কীভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়তে হয়, শিখেছে তারা। বুঝেছে, একলা চলো থিওরি মাঠের মতো সমাজেও খাটে না। মেরুদণ্ড সোজা করতে হলে একে অপরের পাশে দাঁড়াতে হবে। এটাই চাবিকাঠি। স্মৃতিদের সাফল্যের। আর রানিদের বেঁচে থাকার। টিকে থাকার। 

Advertisement

আশার আলো কি দেখছে ওই বৃদ্ধ চোখগুলিও? হাকিয়া দেবী, ধারমি দেবীরা ধাইয়ের কাজ করতেন। শিশুসন্তান জন্মের পর আঁতুড় থেকেই তুলে দেওয়া হতো তাঁদের হাতে। পুরুষশাসিত সমাজ বলত, ‘যা ফেলে আয়।’ কখনও কখনও চোখের সামনে ‘খুন’ হয়ে যেতে দেখতে হতো ফুটফুটে মেয়েগুলোকে। সাংবাদিক তথা পরিচালক অমিতাভ পরাশর ৩০ বছর ধরে শুধু কন্যাভ্রূণ হত্যার শিকড় পর্যন্ত পৌঁছোনোর লক্ষ্যে ছুটে গিয়েছেন। কোথাও কোনও কন্যাভ্রূণ ‘কুড়িয়ে’ পাওয়া গেলে তাই ফোন এসেছে তাঁর কাছে। পরাশর খুঁজে বের করেছেন হাকিয়া দেবীদের। প্রশ্ন করেছেন, ‘কত মেয়ে সন্তানকে এভাবে মেরেছেন?’ নির্লিপ্ত কণ্ঠে হাকিয়া দেবী বলেছিলেন, ‘১২-১৩টা হবে!’ আর ধারমি দেবী? ১৫টা। একটা বিদ্যুতের শক যেন পায়ের নখ থেকে ব্রহ্মতালু পর্যন্ত ঝিলিক দিয়ে যায়। বাধ্য ছিলেন তাঁরা। কেন? ওরা সব ‘বাবু’ লোক। সমাজের ‘মুখিয়া’। ওদের কথা না শুনলে...। আজ তাঁরাই অবাক হয়ে শুনছেন, অনেক বাবু হইহই করছে মেয়েদের দল জিতেছে বলে। রোজ বিকেলে এখন লক্ষ্মী, পার্বতীদের দেখেন তাঁরা ব্যাট-বল হাতে স্কুলবাড়ির মাঠটায় খেলতে। তাহলে কি দিন বদলাচ্ছে? সময় বদলাচ্ছে? মেয়ে হওয়া আর দোষের নয়? হয়তো এই ধাই মায়েরাই আশায় বুক বাঁধছেন, খুনের পালা এবার সাঙ্গ হবে। হয়তো আর ছুড়ে ফেলে দেওয়া হবে না কোনও সদ্যোজাত কন্যাসন্তানকে। 
আশায় কি বুক বেঁধেছেন তিনিও? সেমি-ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে অসম লড়াইয়ে জয় হাসিলের পর ম্যাচের ‘নায়ক’ জেমাইমা রডরিগেজকে নিয়ে যে ব্যক্তি প্রথম ভেবেছিলেন ট্যাগলাইনটা—‘একটি বেঁচে যাওয়া কন্যাভ্রূণ’। এই একটা বাক্যে প্রত্যেক জীবিতের বুকে একটা কাঁপুনি ধরা উচিত। পুরুষ নয়, নারী নয়... জীবিত। কারণ, এ যে আমাদের সমাজের অভিশাপ! এই অভিশাপ দেশের একের পর এক গ্রাম কন্যা-শূন্য করে দিয়েছে। একটা সময় ছিল, প্রতি হাজার পুরুষে দেশের গড় নারীর সংখ্যা নেমে এসেছিল ৯৬০’এরও নীচে। মনে রাখতে হবে, এটা দেশের গড়। এরপর ধীরে ধীরে আইন হয়েছে। নিষিদ্ধ হয়েছে ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ। কিন্তু কন্যাভ্রূণ হত্যা আজও বন্ধ হয়নি। তার প্রমাণ? ওই ধারমি দেবীরা। তাঁরাই স্বীকার করেন, এখনও কন্যা সন্তান বহু গ্রামে যথাযথ মর্যাদা পায় না। বেঁচে থাকার অধিকার পায় না। খুন হয়তো করা হয় না তাদের... কিন্তু ফেলে আসা হয় কোনও না কোনও আঁস্তাকুড়ে। ঝোপের মধ্যে। আগাছার মতো। সে কাঁদে... কিন্তু সেই কান্না পৌঁছোয় না সমাজের কানে। ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে যায় কণ্ঠস্বর। এই ঘটনা আজও ঘটে। স্বীকারোক্তি ঘোরাফেরা করে পরিসংখ্যান দপ্তরেরই অন্দরমহলে। কিন্তু তা সামনে আসে না। কারণ, ২০১১ সালের পর জনগণনা হয়নি এ দেশে। সমীক্ষা যতটুকু হয়েছে, তাতে কন্যাভ্রূণ হত্যা সংক্রান্ত তেমন ডেটা পাওয়া যায় না। শুধু দেখানো হয় পুরুষ-নারী অনুপাত। প্রতি হাজার পুরুষে হাজারেরও বেশি নারী সংখ্যা। অর্থাৎ বুঝে নিতে হবে, কন্যাভ্রূণ হত্যা থেকে পিছু হটেছে দেশ। সফল হয়েছি আমরা। সত্যিই কি তাই? তাহলে এই মোদি জমানাতেও উত্তরাখণ্ডের ১৩২ গ্রামকে কালো তালিকাভুক্ত করতে হয়। কেন? সেই গ্রামগুলোতে তিনমাস কোনও কন্যা সন্তানের জন্ম হয়নি। ২০০ সন্তান। প্রত্যেকে ছেলে। এও সম্ভব? হতে পারে এই ঘটনা কোভিডের ঠিক আগের। তাও এই ঘটনা তাজা। দগদগে ঘায়ের মতো। এই প্রশ্নের উত্তর জানা সত্ত্বেও কেউ দেবে না। দিলেও তা নথিভুক্ত হবে না। কারণ, এই দেশে এখনও কন্যা সন্তানকে ‘বোঝা’ হিসেবে ধরা হয়। ছোটো ভাইদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য কোপ পড়ে দিদির স্কুল ফি’তে। হরমনপ্রীতকে শুনতে হয়, তোদের জায়গা রান্নাঘর। মাঠ নয়। ওটা ছেলেদের। এই মানসিকতাটা এবার বদলাবে তো? নাকি এই দেখনদারি শুধু এক রাতের জন্য। একটা জয়ের জন্য। কিছু এনডোর্সমেন্ট, আর ভোটব্যাংকের জন্য?
আশা করি, এমনটা নয়। মনেপ্রাণে। আশা করি, গোটা দেশে হ্যারি-স্মৃতি-জেমিদের নিয়ে যে ঢেউ উঠতে দেখা যাচ্ছে, তা কোনও এআই দিয়ে তৈরি নয়। সবটাই স্বাভাবিক। স্বতঃপ্রণোদিত। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মানসিকতা সত্যিই বদলাচ্ছে। আশা করি এই সাফল্য গোটা দেশেরই। কোনও জাত, ধর্ম, লিঙ্গ বা রাজনৈতিক দলের নয়। কেউ একে কোনও অপারেশনের সঙ্গে তুলনা করবে না। কেউ দিন বা রাতের দখলের সঙ্গেও একে একাসনে বসাবে না। কারণ, এই লড়াই স্বতন্ত্র। এই জয়ও। এই সাফল্যও। এর জেরে সমাজের চার আনার বদলও যদি আসে, সেটাই প্রাপ্তি। প্রায় দেড়শো কোটি জনসংখ্যার দেশে শিক্ষা এবং সচেতনতা উন্নতির বড় অন্তরায়। সই করতে পারা মানেই এখানে ‘শিক্ষিত’। তাহলে টাকা গুনতে পারা মাত্র অ্যাকাউন্ট্যান্ট কেন নয়? এই প্রশ্ন কেউ করে না। কারণ, শাসক এভাবেই দেশকে এবং দেশবাসীকে দেখতে অভ্যস্ত। কম শিখলে, কম প্রশ্ন করবে। আর কম প্রশ্ন করলে, কম উত্তর দিতে হবে। অস্বস্তিটাও কম হবে। বেশি সচেতন হলে জারিজুরি ফাঁস হবে। সহজেই কোনওকিছু আর খাওয়ানো যাবে না। এরা প্রতিবাদের ঝড় তুলবে। আর তা ক্ষমতায়নের পক্ষে বড় বিপজ্জনক। তাই আজ যে ‘ভাইভ’ নজরে আসছে, তা সোডার মতো ফেনাদার কি না, ধন্দ থেকেই যায়। গেলাস ভরতি করে ঢালার পর যখন বুদবুদগুলো উধাও হবে, কতটুকু তরল পড়ে থাকবে নীচে? এইটেই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন। উত্তর? নেই। উত্তর থাকলে ক্ষমা চাইত গেরুয়া সংস্কৃতির সেই ধারক ও বাহক। যে পিচের মাঝে জেমাইমাকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার সাহস দেখিয়েছিল। ক্রিকেটের নিয়মক সংস্থা ৫১ কোটি টাকা পুরস্কার মূল্য দেওয়ার পাশাপাশি ঘোষণা করত, আর সেকেন্ড গ্রেডেড স্টেডিয়ামে তোমাদের খেলা দেব না। প্রথম সারির স্টেডিয়ামগুলো শুধু ছেলেদের জন্য তোলা থাকবে না। তাতেও তোমাদের সমান অধিকার। সেই ঘোষণা কি হয়েছে? না হয়নি। ঝুলন গোস্বামী, মিতালি রাজরা দিনের পর দিন লড়াই করে গিয়েছিলেন। না, শুধু অস্ট্রেলিয়া বা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে নয়। নিজের দেশের ক্রিকেট প্রশাসনের বিরুদ্ধেও। ছেলেদের বাতিল করা কিট, নাম মাত্র টাকার বিরুদ্ধে। অসাম্যের বিরুদ্ধে। সেই পরিস্থিতি বদলেছে। কিন্তু মানসিকতা কি বদলেছে? এখনও কি শোনা যায় না যে, ‘ও তো মেয়েদের ক্রিকেট।’ ‘ও তো মেয়েদের টিম।’ সাফল্য কিন্তু ছেলেমেয়ে দেখে আসে না। ওই বস্তুটি আসে লৌহকঠিন মন, চোয়ালচাপা লড়াই, আর একটি মন্ত্রে—গো টু দ্য বেসিকস। ভুলে না যাওয়া অতীতকে। হাতে ফোন বা ঘরে এলইডি টিভি থাকলেই আধুনিক হওয়া যায় না। ওটা স্রেফ অন্দর কী বাত। শুরুটা একজনকে করতে হয়। ঝুঁকি নিয়ে। স্রোতের বিপরীতে গিয়ে। ঠিক যেভাবে ৫০ বছর আগে করেছিলেন শান্তা রঙ্গস্বামী, ডায়ানা এডুলজিরা। তৎকালীন ব্যাঙ্গালোরের চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম থেকে ম্যাচ ড্র করে যখন তাঁরা বেরিয়ে আসছেন, ক্যালেন্ডারে ২ নভেম্বর। শুরুটা তাঁরা করেছিলেন। ভারতের ক্রিকেট ইতিহাস নতুন করে লেখার। ৫০ বছরের মাথায় আরও একটা ২ নভেম্বর। আরও একটা শুরু করলেন হরমনপ্রীতরা। ভারতের লিঙ্গবৈষম্যের ইতিহাস নতুন করে লেখার। আশার আলো কি দেখছি আমরাও?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ