


পরামর্শে মনিপাল সল্টলেক-এর ইএনটি সার্জেন ডাঃ দ্বৈপায়ন মুখোপাধ্যায়
সুপ্রিয় নায়েক: শীত ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে। গরমের আঁচ ইতিমধ্যেই পেতে শুরু করেছি আমরা। সিজন চেঞ্জের এই সময় ঘরে ঘরে দেখা যাচ্ছে কাশির রোগী! কারো কারো ক্ষেত্রে পাঁচ থেকে সাত দিনে সমস্যা ছেড়ে গেলেও বহু রোগীরই কাশি সমস্যা স্থায়ী হচ্ছে। কারো কারো এক দেড় মাস অবধি কাশির সমস্যা থেকে যাচ্ছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা দিচ্ছে শুকনো কাশি। এই শুকনো কাশিটাও নাছোড়বান্দা অবস্থায় থাকছে এবং সারাদিন ধরে কাশি হওয়ার কারণে রাতের দিকে বুকের পাঁজরে ব্যথাও হচ্ছে। কারো কারো আবার কাশি থেকে বমিও হচ্ছে।
কাশির মূল কারণ
ঋতু পরিবর্তনের সময়ে আমাদের ল্যারিংস এবং ভোকাল কর্ডে একটা ভাইরাল ইনফেকশন বা প্রদাহ হয়। যা মূলত তিনটি ভাইরাসের থেকে হয়— রাইনোভাইরাস, রেসপিরেটরি সেনসিটিয়াল ভাইরাস আর প্যারা ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস। এই ধরনের ভাইরাল ইনফেকশন গুলো থেকে ল্যারিঞ্জাইটিস-এর সমস্যা তৈরি হয়। সেই ল্যারিঞ্জাইটিস থেকে লারিংসের বিভিন্ন অংশ এবং মূলত যে জায়গা থেকে আমরা কথা বলি সেই ভোকাল কর্ড-এর অংশটি ফুলে যায় বা প্রদাহ তৈরি হয়।
ল্যারিঞ্জাইটিসের লক্ষণ
এক্ষেত্রে দুটো জিনিস হয়— প্রথমত গলার স্বরের কিছুটা পরিবর্তন হয় এবং তার সঙ্গে কাশি হয়। সাধারণভাবে এই ভাইরাল ইলনেস বা এই কাশির সমস্যা পাঁচ দিন সাত দিন বাদে আস্তে আস্তে নিজের থেকে কমে যায়। কিন্তু ঋতু পরিবর্তনের সময়ে ভাইরাল ইনফেকশন থেকে হওয়া প্রদাহের কারণে যে ল্যারিঞ্জাইটিস হয় তা চট করে সারতে চায় না। সেক্ষেত্রে এই দমকা কাশি বা নাছোড়বান্দা কাশি দীর্ঘস্থায়ী হয়। কাশতে কাশতে রোগীর গলা ব্যথা হয়ে যায় বা অনেক সময় স্বরের পরিবর্তনও হয়ে যায়।
কখন নেবেন চিকিত্সকের পরামর্শ
কাশি ও স্বরভঙ্গের উপসর্গ সাত দিনের বেশি থাকলে অবশ্যই ইএনটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ভালো করে গলা পরীক্ষা করে দেখলে বা গলার মধ্যে ফাইবার অপটিক লারিংগোস্কোপি করে দেখলে প্রকৃত সমস্যা ধরা পড়ে যায়।
এই ধরনের কাশি শুধু অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে সারে না। দরকার পড়ে আরও কিছু ব্যবস্থার।
সাবধানতা ও ঘরোয়া প্রতিকার
যে সাবধানতাগুলো অবলম্বন করতে হয়—
ভয়েস রেস্ট: প্রথম কথা হচ্ছে ভয়েস রেস্ট, মানে খুব কম কথা বলা। কারণ যত বেশি কথা বলা হয় বা চিৎকার চেঁচামেচি করা হয় সেক্ষেত্রে ওই ভোকাল কর্ডের উপর চাপ পড়ে তাতে ফোলা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং তাতে কাশি আরও বাড়ে।
গরম জলের ভাপ: কাশি ও স্বরভঙ্গের সমস্যায় গরম জলের ভাপ নিলে অনেক উপকার পাওয়া যায়।
ওষুধ ও জল: কিছু অ্যান্টি-অ্যালার্জিক ওষুধ আছে। এই ধরনের ওষুধ খেলেও উপকার পাওয়া যায় এবং তার সঙ্গে বেশি মাত্রায় জল খেতে হয়।
কারণ যখন অ্যালার্জি
সিজন চেঞ্জের সময়ে অ্যালার্জিজনিত কারণেও কিন্তু কাশির প্রকোপ অনেক বৃদ্ধি হয়। সেক্ষেত্রে যদি দেখা যায় এই কাশির সঙ্গে নাক দিয়ে জল পড়া, নাক বন্ধ, হাঁচির মতো উপসর্গ— তাহলে কিন্তু ধরে নেওয়া যেতে পারে যে সমস্যা অ্যালার্জি থেকে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে অল্প কয়েকদিন বিভিন্ন অ্যান্টি-অ্যালার্জিক ওষুধ দিয়ে উপসর্গ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু যদি দেখা যায় সারা বছরেই বারংবার এই ধরনের সমস্যা ফিরে ফিরে আসছে সেক্ষেত্রে অ্যালার্জি স্কিন প্রিক টেস্ট করা যেতে পারে ও ঠিক কোন কারণে অ্যালার্জি হচ্ছে। যদি কোন খাবার জিনিসের থেকে হয় তাহলে সেই খাবার এড়িয়ে চলা ভালো। আর যদি দেখা যায় ধুলো বা বিছানার চাদরে থাকা আণুবীক্ষণিক মাইটস এইসব থেকে যদি হয়, তাহলে তখন তার জন্য ইমিউনোথেরাপি দেওয়া যেতে পারে।
কখন জটিলতা
কারও যদি কাশির সঙ্গে শ্বাসকষ্ট ও হাঁপ ধরার মতো জটিলতা দেখা দেয় বা কাশির সঙ্গে কফ বেরতে থাকে তাহলে বুকের একটা এক্স রে করানোর প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষত বয়স্ক মানুষের এইভাবে ভাইরাল ল্যারিঞ্জাইটিস থেকে ধীরে ধীরে লোয়ার রেসপিরেটরি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন হয়। এমন ক্ষেত্রে চেস্টেও একটা সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই এই সিজন চেঞ্জের সময়ে যদি বয়স্ক রোগীর নাছাড়বান্দা কাশির মচতো জটিলতা হয় তাহলে একটা চেস্ট এক্স রে করে দেখে নেওয়া ভালো যে তাদের বুকেও সর্দি জমছে কি না। সেক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক বা ইনহেলার-এর দরকার পড়তে পারে।