


পি চিদম্বরম: ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালের ভিতরে জনমত যাচাই করা হলে অবশ্যই এই রায় বেরিয়ে আসত যে, ভারতের নির্বাচন কমিশনই (ইসিআই) দেশের সর্বোত্তম এবং সবচেয়ে কার্যকরী প্রতিষ্ঠান, এমনকী সাংবিধানিক আদালতেরও উপরে স্থান পেয়ে যেত ইসিআই। এর জন্য সাধুবাদ প্রাপ্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) টি এন সেশনের। তাঁরই সৌজন্যে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, সততা এবং নিরপেক্ষতা (ইন্ডিপেন্ডেন্স, ইন্টিগ্রিটি ও ইমপারশিয়ালিটি বা তিনটি ‘আই’) সর্বজনীনভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। সেশনের পরবর্তী জমানায় তিনটি ‘আই’-কে দৃঢ়ভাবে রক্ষাকারী প্রধান নির্বাচন কমিশনারগণ ছিলেন—এম এস গিল, জে এম লিংডো, টি এস কৃষ্ণমূর্তি, নবীন চাওলা এবং এস ওয়াই কুরেশি। অন্যান্য প্রধান নির্বাচন কমিশনারদের কারবার বুঝে ওঠা মুশকিল হতো—তাঁরা এই ডুব দিচ্ছেন তো এই ভেসে উঠছেন—কখনও কখনও মনে হতো তাঁরা নত হচ্ছেন, আবার এও মনে হতো যে কর্তব্যকর্মে অটল সাহসিকতায় ভরপুর। গত ১২ বছরে নিযুক্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনারদের সংবিধানের প্রিজমের ভিতর দিয়ে দেখলে বিপর্যয়টা পরিষ্কার হয়।
স্বাধীনতা
ইসিআই একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। সূচনা পর্বের বছরগুলিতে নির্বাচন পরিচালনাকে কোনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হতো না। স্থানীয় শাসকদের ইচ্ছানুযায়ী মানুষ ভোট দিত। একাংশ মানুষের ভোট দেওয়ারই অনুমতি ছিল না। আর তারা এতটাই দরিদ্র এবং দুর্বল ছিল যে সামান্য অভিযোগও জানাতে পারত না। ফলে তখনকার কংগ্রেসের সামনে এসব কোনও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠেনি। নির্বাচন চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছিল ১৯৬৭ সালের পর। ১৯৬৫ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের কাজকর্মে সরকারগুলি কোনোরকম হস্তক্ষেপ করেনি। এবং, এই সংক্রান্ত হস্তক্ষেপের কোনও অভিযোগও আমার মনে পড়ে না। কিছু রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ছিল না। অভিযোগ যেটা ছিল সেটা বরং নির্বাচন কমিশনের অযোগ্যতা নিয়ে।
একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছিল ২০১৪
সালে লোকসভা গঠনের জন্য। তারপর থেকে কী লোকসভা, কী রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন—বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নির্বাচন পরিচালনায় অযোগ্যতা, কারচুপি, জালিয়াতি এবং অবনমনের সমালোচনা হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে নির্বাচন কমিশন অসংখ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে এবং সংস্থাটির সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়েছে মারাত্মকভাবে।
২০২৪ সালের নভেম্বরে মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনের মুখে ভোটার তালিকা একটি বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে। অভিযোগগুলি ছিল: (১)
ভোটার তালিকায় অস্বাভাবিকভাবে বিপুল সংখ্যক নতুন—এবং সম্ভবত ভুতুড়ে—নাম যোগ করা হয়েছিল এবং (২) ভোটগ্রহণের সময় শেষ হওয়ার অনেক পরেও বিপুল সংখ্যক ব্যক্তিকে ভোটদানের অনুমতি দেওয়া হয়, ব্যাপারটি নিঃসন্দেহে ছিল অস্বাভাবিক। নির্বাচন কমিশন উভয় অভিযোগের বিরুদ্ধে আত্মপক্ষ সমর্থন করার চেষ্টা করেছে বটে কিন্তু এর নিষ্পত্তি এখনও হয়নি।
অখণ্ডতা
আর একটি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন আসছে বিহারে। আগামী বছর আরও একাধিক রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন হওয়ার কথা। বিহার একটি ‘টেস্ট কেস’ বা পরীক্ষামূলক ঘটনা
হতে চলেছে। বিহারে ভোটের মাত্র চারমাস আগে, নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকার একটি স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) কাজ শুরু করেছে। এটি অস্বাভাবিক এবং এই কাণ্ড আগে কখনও হয়নি। সাধারণত
বছর পয়লা বা ১ জানুয়ারি ভোটার তালিকা আপডেট করা হয় এবং একটি সামারি রিভিশন বা সংক্ষিপ্ত সংশোধন করা হয় প্রতিটি ভোটের প্রাক্কালে। সংক্ষিপ্ত সংশোধনে নতুন এবং তালিকাবহির্ভূত ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ওইসঙ্গে বর্তমান ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে মৃত এবং যাঁরা স্থায়ীভাবে অন্য জায়গায় চলে গিয়েছেন সেই ভোটারদের নাম। বর্তমান ভোটার তালিকার বেশিরভাগ অংশ অক্ষত থাকবে এবং সেসবে হাতও দেওয়া হবে না। সর্বোপরি, ভোটার তালিকায় নাম যুক্তকরণ এবং বিয়োজনের এই সম্পূর্ণ কাজটাই হবে রাজনৈতিক দলগুলির পুরো জ্ঞাতসারে এবং তাদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে। অন্তর্ভুক্তির প্রতিটি দাবির নিষ্পত্তি হবে সাবধানতার সঙ্গে স্ক্রুটিনি বা যাচাই করার পর। অনুরূপভাবে নাম বর্জনের প্রতিটি কেসের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে পূর্ণ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এবং হিয়ারিং বা শুনানির ভিত্তিতে।
এর পাশে এসআইআর হল একটি ভিন্ন ব্যাপার। এই প্রক্রিয়ায় বর্তমান ভোটার তালিকা কার্যকরভাবেই ‘স্ক্র্যাপ’ বা বাতিল হয়ে যাবে। এসআইআর ২০০৩ সালের ভোটার তালিকার উপর ভিত্তি করে তৈরি বলে দাবি করা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও, এটির শুরু কার্যকরভাবে ‘জিরো বেস’ বা শূন্য ভিত্তিক। ফলে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার জন্য ‘নতুন’ ভোটার তালিকা তৈরি করা হবে। পাশাপাশি এই দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট ভোটারের উপর: বর্তমান ভোটার তালিকায় তাঁর নাম আছে। ২০২০ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে তিনি ভোট দিয়েছেন। তাঁর ভোটাধিকার ছিল ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তিনি ভোটও দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও এমন একজন ভোটারকেও তাঁর ‘নাগরিকত্ব’-এর প্রমাণ দিতে হবে। তার জন্য আবেদনের সঙ্গে তাঁকে পেশ করতে হবে প্রয়োজনীয় নথিপত্র। এই সবকিছু ২৫ জুন থেকে ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে সাঙ্গ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিরপেক্ষতা
তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করাটা এই কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য নয়। বরং ভোটার তালিকায় নাম তোলা এবং ভোটদানের পথে অপ্রতিরোধ্য বাধা সৃষ্টি করাই এর উদ্দেশ্য। নির্বাচন কমিশন নাগরিকত্বের ‘প্রমাণ’ হিসেবে ১১টি নথি ঠিক করে দিয়েছে: এর মধ্যে চারটিতে ‘জন্মস্থান’ সংক্রান্ত তথ্য নেই। এছাড়া এমন দুটি নথি চাওয়া হয়েছে সেগুলি বিহারের কোনও ব্যক্তির জন্য কখনও ইস্যুই করা হয়নি। সুতরাং, যথাযথভাবে নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য থাকছে মাত্র পাঁচটি নথি। তার মধ্যে রয়েছে রেভিনিউ অফিসারের তরফে ইস্যু করা কাস্ট সার্টিফিকেট বা জাতিগত শংসাপত্র। পাসপোর্ট, বার্থ সার্টিফিকেট (জন্মের শংসাপত্র) এবং সরকারি কর্মচারী পরিচয়পত্র বিহারবাসীদের মধ্যে রয়েছে মাত্র ২.৪ থেকে ৫ শতাংশের মতো। যেসব নথি গ্রাহ্য হওয়া উচিত ছিল কিন্তু অনুমোদিত তালিকায় অনুপস্থিত সেগুলি হল: (১) আধার, (২) নির্বাচন কমিশনের তরফে ইস্যু করা এপিক বা ভোটার-পরিচয়পত্র এবং (৩) রেশন কার্ড। এসআইআর-এর জন্য যে নথির তালিকা দেওয়া হয়েছে সেখানে উপর্যুক্ত তিনটি নথি ‘অনুপস্থিত’ কেন? সুপ্রিম কোর্ট যখন এই প্রশ্ন করল তখন নির্বাচন কমিশনের কাছে কোনও ‘রেডি’ জবাব ছিল না। মজার ব্যাপার এটাই যে, রেভিনিউ অফিসাররা নাগরিকের বসবাসের নথি (রেসিডেন্সি) এবং জাতিগত শংসাপত্র ইস্যু বা মঞ্জুর করেন আধারের ভিত্তিতে। অথচ, এসআইআর-এর জন্য রেসিডেন্সি এবং কাস্ট সার্টিফিকেট বৈধ গণ্য বা গ্রাহ্য (ভ্যালিড) হলেও আধার অবৈধ (ইনভ্যালিড)!
এসআইআর-এর একমাত্র যুক্তিসঙ্গত দিক হল—মৃত ব্যক্তি এবং যাঁদের নাম ভোটার তালিকায় দু’বার ঢুকে রয়েছে সেগুলি বাদ দেওয়াই উচিত। নির্বাচন কমিশনের এস্টিমেট, সাড়ে ১৭ লক্ষ ভোটার বিহার থেকে মাইগ্রেট করেছেন বা অন্য স্থানে চলে গিয়েছেন। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, তাঁরা আর বিহারে বসবাস করেন না বা ভোট দিতে ফিরে আসবেন না। বিহারের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) রাজ্যের বাইরের ভোটারদের (আউট-অফ-স্টেট ভোটারস) তালিকাভুক্তির জন্য ১৫ জুলাই একটি ফর্ম আপলোড করেছেন এবং প্রক্রিয়াটি ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে সম্পন্ন করার আশা করছেন তিনি!
অনিবার্য উপসংহার এটাই যে, যোগ্য নাগরিকদের তালিকাভুক্তি এবং ভোটদানের সুযোগ প্রদানের একটি অনুশীলন এই এসআইআর নয়। লক্ষ লক্ষ দরিদ্র, প্রান্তিক বা অভিবাসী নাগরিককে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার একটি অন্ধকার, অশুভ চক্রান্ত এই পদক্ষেপ। সুপ্রিম কোর্টের ২৮ জুলাইয়ের শুনানি এবং সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আমরা।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত