


নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাকপুর ও চুঁচুড়া: রঙের উৎসবের যাবতীয় আনন্দ বদলে গেল স্বজন হারানোর হাহাকারে। দোলের দিন ভাটপাড়া ও বলাগড়ে, অর্থাৎ গঙ্গার দু’পাড়েই অল্প সময়ের ব্যবধানে ঘটে গেল মর্মান্তিক ঘটনা। দু’টি ঘটনায় মোট ছ’জন তলিয়ে গিয়েছেন গঙ্গায়। ঘটনার পর ২৪ ঘণ্টা অতিক্রান্ত। কিন্তু একজনেরও খোঁজ মেলেনি।
রং খেলা শেষে মঙ্গলবার বিকেলে দুই যুবক এবং তাঁদের সম্পর্কিত এক বোন ভাটপাড়া বলরাম সরকার গঙ্গার ঘাটে স্নান করতে নেমেছিলেন। তাঁদের বাড়ি জগদ্দল বিধানসভা এলাকার ভাটপাড়া পুরসভার ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের মাদ্রাল গভর্নমেন্ট কলোনিতে। স্নানের সময় তিনজনই গঙ্গায় তলিয়ে যান। তাঁদের বাঁচানোর চেষ্টা করেন স্থানীয় বাসিন্দা তথা একাদশ শ্রেণির ছাত্র সৌরভ সরকার। তাঁকেও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট গ্রুপের তিনটি, কলকাতা পুলিশের একটি এবং এনডিআরএফের দু’টি টিম বুধবার দিনভর গঙ্গায় তল্লাশি চালিয়েছে। কিন্তু একজনেরও হদিশ মেলেনি। কান্নায় ভেঙে পড়েছেন নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা। এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
এদিন দুপুরে বলাগড়ের ডুমুরদহে একটি ডিঙি নৌকায় পাঁচ বন্ধু গঙ্গাবক্ষে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। সেই সময় জোয়ারের ধাক্কায় ডিঙি নৌকাটি উলটে যায়। পাঁচজনের মধ্যে তিনজন সাঁতরে কোনোরকমে পাড়ে উঠে আসতে পারেন। সায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় (২৩) এবং শুভজিৎ মণ্ডল (২১) সাঁতার জানতেন না। তাঁরা তলিয়ে যান। তাঁদের বাড়ি ডুমুরদহে। ডিএমজির টিম, ডুবুরি নামিয়েও কারও হদিশ মেলেনি। স্থানীয় ডুমুরদহ নিত্যানন্দপুর পঞ্চায়েতের উপপ্রধান শ্যামাপ্রসাদ রায় বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমরা সবরকম চেষ্টা চালাচ্ছি। মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেল।’
ভাটপাড়ার পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, নিখোঁজ দুই ভাই সৈকত নন্দী (৩২) ও সৌরভ নন্দী ( ২৭)। তাঁদের সম্পর্কে বোন দীপশিখা দাস রজক। মঙ্গলবার রং খেলার পর ‘পুকুরে স্নান করতে যাচ্ছি’ বলে গঙ্গার ঘাটে চলে আসেন তাঁরা। দীপশিখাই প্রথমে ঘাটে নামেন। পা পিছলে বা কোনোভাবে তিনি জলে পড়ে যান। তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে দুই ভাইও স্রোতে ভেসে যান। তিনজনকে হাবুডুবু খেতে দেখে জলে ঝাঁপ দেন ভাটপাড়ার ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাবুপাড়ার বাসিন্দা সৌরভ সরকার। ঘটনাস্থলে ভাটপাড়া থানার পুলিশ পৌঁছালে স্থানীয়রা ক্ষোভ উগরে দেয়।
বিধানসভা ভোটের মুখে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যথারীতি শুরু হয়ে গিয়েছে রাজনৈতিক আকচাআকচি। পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন ভাটপাড়ার বিজেপি বিধায়ক পবন সিং। অকুস্থলে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘চার ঘণ্টা বাদে ডুবুরি নামে। গঙ্গার ঘাটে কোনো পুলিশ ছিল না।’ পালটা তৃণমূল নেতা সঞ্জয় শ্যাম বলেন, ‘ভাটপাড়ার বিধায়ককে গত ৫ বছরে দেখা যায়নি। সামনে ভোট বলে এখন তিনি হাজির হয়েছেন। পুলিশ আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ডুবুরি নামানো হয়েছে। এনডিআরএফ এসেছে। ড্রোন দিয়ে তল্লাশি চলছে।’ নিখোঁজ সৈকত নন্দীদের প্রতিবেশী কার্তিক সরকার বলেন, ‘দুই ভাইয়েরই কিছুদিন আগে পরপর বিয়ে হয়েছে। একজন খুব ভালো গান করে। কী মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেল, ভাবতে পারছি না।’ বলরাম সরকার গঙ্গার ঘাটে থেকে থেকে কান্নার রোল উঠছে। মাদ্রাল সরকারি কলোনিতেও শোকের আবহ।