


বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: কতই বা বয়স হবে, বড়জোর বছর দশেক। এই কিশোরকে আমতলা ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তার বাবা যখন নিয়ে এসেছিলেন, তখন সন্ধ্যা। রোগীর ঝিমিয়ে পড়া অবস্থা দেখে ডাক্তাররা বুঝেছিলেন, এ কালাচের কামড় না হয়ে যায় না। কিন্তু কে বোঝাবে বাবাকে! চিকিৎসকরা যেই অ্যান্টি ভেনাম (এভিএস) দিতে গেলেন, সঙ্গে সঙ্গে বাধা। ছেলেকে ইঞ্জেকশন দিচ্ছেন কেন? ডাক্তাররা বলেন, ওকে সাপে কামড়েছে যে! বাবার প্রশ্ন, কোথায় কামড়? কামড়ের দাগ তো নেই শরীরে। চিকিৎসকরা বোঝানোর চেষ্টা করলেন, ‘কালাচ কামড়ালে মশার কামড়ের মতো দাগও থাকে না কখনও কখনও। সুতরাং তর্ক না করে ইঞ্জেকশন দিতে দিন। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে।’ বাবা অনড়। যখন রাজি হলেন, তখন ভোরের আলো ফুটেছে। কিশোরের অবস্থা শোচনীয়। কোনওক্রমে শ্বাসটুকু ধরে রেখেছে মাত্র। আর ঝুঁকি না নিয়ে চিকিৎসকরা রেফার করলেন মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজে। বেশিক্ষণ নয়। রাস্তাতেই মারা গেল ওই কিশোর।
কখনও পরিবার এভিএস দিতে না দেওয়ায়, কখনও ওঝা-গুণিনের ঘরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট করায়, আবার কখনও এভিএস-এর গুণগত মান (চন্দ্রবোড়ার ক্ষেত্রে) ভালো না হওয়ায় সাপের কামড়ে রাজ্যে মৃত্যু অব্যাহত। স্বাস্থ্যদপ্তরের অভ্যন্তরীণ তথ্য থেকে জানা গিয়েছে, ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন— এই ছ’মাসে রাজ্যে ৩৬ হাজার ৪৫২ জন মানুষকে সাপে কেটেছে। তাঁদের মধ্যে মারা গিয়েছেন ১২৯ জন। পরিসংখ্যান বলছে, সাপে কাটা রোগীদের মধ্যে ‘এনভেনোমেশন’ বা শরীরে বিষক্রিয়ার ঘটনা ঘটেছে ৭ হাজার ৫০৪টি। সবচেয়ে বেশি সাপের কামড়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে পূর্ব বর্ধমানে। তারপরই রয়েছে বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুর।
সর্পাঘাত ও মৃত্যুর নিরিখে ২৭টি জেলা ও স্বাস্থ্য জেলার মধ্যে ৮টি জেলা নিয়ে চিন্তায় রয়েছে স্বাস্থ্যদপ্তর। এই সবক’টি জেলাকেই লাল তালিকাভুক্ত করেছে তারা। জেলাগুলি হল, বাঁকুড়া, বীরভূম, হুগলি, মালদহ, নদীয়া, দুই মেদিনীপুর এবং পূর্ব বর্ধমান।
রাজ্যে সর্পাঘাতের চিকিৎসার রিসোর্স পার্সন ডাঃ দয়ালবন্ধু মজুমদার বলেন, দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম প্রধান বিষধর সাপ চন্দ্রবোড়ার কামড়ে বর্তমানে এভিএস যে ভালোমতো কাজ করছে না, তা প্রমাণিত সত্য। সেইজন্য সরকারি নীতির কিছু পরিবর্তন হয়েছে। সেটা যেমন ভালো খবর, তেমনই খারাপ খবর হল, আজ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে সাপের অ্যান্টিভেনাম তৈরি করবে, এমন কোনও সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া সম্ভব হয়নি। টেন্ডারই হয়ে চলেছে দু’-তিন বছর ধরে। অন্যদিকে মানুষের বিপদ বাড়ছে।
স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রে খবর, বাংলার বিষধর সাপ থেকে বিষ সংগ্রহ করার জন্য মনসা বায়োটেক নামে একটি সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, সেই বিষ থেকে এভিএস তৈরির জন্য সংস্থা বাছাইয়ের কাজ মাসের পর মাস ধরে চলছে তো চলছেই!