নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: অশোকনগরে কিডনি পাচার কাণ্ডে প্রথম গ্রেপ্তার করা হয় সুদের কারবারি বিকাশ ঘোষ ওরফে শীতলকে। অভিযোগ, হতদরিদ্র মানুষের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে তাকে চড়া সুদে ঋণের টোপ দিত সে। সুদের ভারে জর্জরিত ঋণগ্রহীতা টাকা শোধের কোনও উপায় না পেলে তাকে কিডনি বিক্রির টোপ দেওয়া হতো। বিকাশকে গ্রেপ্তার করে এই কাণ্ড জানার পর অশোকনগর থানার পুলিস আরও একজনকে গ্রেপ্তার করে। তার নাম গৌর সর্দার। তদন্তের স্বার্থে প্রথমে পুলিস তার নাম প্রকাশ্যে আনেনি। তাকে জেরা করে পুলিস এক ‘রহস্যময়ী’র খোঁজ পায়, যে গৌরের স্ত্রী এবং দক্ষিণ কলকাতার একটি নামজাদা বেসরকারি হাসপাতালের আয়া হিসেবে কাজ করে। মঙ্গলবার গভীর রাতে দক্ষিণেশ্বর এলাকা থেকে পুলিস সেই মহিলা এবং তার সঙ্গী আরও এক মহিলা এবং এই কারবারের সম্ভাব্য ‘মাস্টারমাইন্ড’কে গ্রেপ্তার করে। ধৃতরা হল মৌসুমি সর্দার, পিয়ালি দে এবং গুরুপদ জানা ওরফে অমিত। এদের মধ্যে মৌসুমি ইতিপূর্বে ধৃত গৌরের স্ত্রী। গুরুপদ বাদে এই তিনজন ধৃত দক্ষিণ কলতাতার একটি নামজাদা বেসরকারি হাসপাতালে আয়ার কাজ করত বলে জানা গিয়েছে। পিয়ালির বাড়ি বারাসতে, মৌসুমির বারুইপুর ও অমিতের বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুরে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ধৃতরা তাদের অসাধু কারবারের কথা স্বীকার করেছে বলে দাবি পুলিসের। কিন্তু তিন আয়ার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ? পুলিস সূত্রে জানা গিয়েছে, বিকাশ, গুরুপদরা কাউকে কিডনি বিক্রিতে রাজি করাতে পারলে সরকারের সম্মতি সহ অন্যান্য নথিপত্রের ব্যবস্থা করত এই তিনজন। সেই সঙ্গে হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করে কিডনি বার করা ও প্রতিস্থাপনের কাজটিও তাদের তত্ত্বাবধানে হতো। ধৃত গুরুপদ নিজেকে উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা বলে পরিচয় দিত। নিজের নাম বলত অমিত। আদতে সে থাকে যাদবপুরে। অমিতই এই টিমের মাস্টারমাইন্ড। তাদের বারাসত আদালতে পেশ করা হলে বিচারক ছ’দিনের পুলিসি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন।
তদন্তকারীরা আরও জেনেছেন, বিকাশের মতো এই কারবারে জড়িত আরও কয়েকজন সুদখোর গুরুপদ ওরফে অমিতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। কাউকে কিডনি বিক্রি করতে রাজি করানো গেলে কাজ শুরু হতো হাসপাতালের পিয়ালি, মৌসুমি এবং তার স্বামী গৌরের। এদের মূল কাজ ছিল কিডনি দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে যোগাযোগ রেখে প্রয়োজনীয় নথি ও আইনি স্বীকারোক্তি জোগাড় করা। সরকারি ছাড়পত্র না এলেও ওই হাসপাতালে যোগাযোগের সূত্রে ‘না কে হ্যাঁ’ করানোর ক্ষমতা তাদের ছিল বলে দাবি তদন্তকারীদের। এরপর তৈরি হতো ভুয়ো কাগজ। যে অভিযোগের ভিত্তিকে এই চক্রের পর্দা ফাঁস হয়েছে, সেক্ষেত্রেও এভাবেই এগিয়েছিল বিষয়টি। কিডনি গ্রহীতাদের জন্য ব্লাড গ্রুপ অনুযায়ী অমিতদের রেটচার্ট ছিল ভিন্ন। বিরল বা নেগেটিভ গ্রুপের রক্তের কারও কিডনির জন্য চড়া দর হাঁকা হতো। দাতাকে পাঁচ-সাড়ে পাঁচ লক্ষ টাকা ধরিয়ে বাকি ১৫-১৬ লক্ষ টাকা এই ‘সিন্ডিকেট’ ভাগাভাগি করে নিত বলে দাবি তদন্তকারীদের।