নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া: কবরস্থানটির বয়স ১৯৯ বছর। এটি ব্রিটিশ শাসিত বাংলায় নবজাগরণের অধ্যায় থেকে শুরু করে পাথুরিয়াঘাটা ঠাকুরবাড়ির স্মৃতি বয়ে নিয়ে চলেছে। তবে তা রক্ষণাবেক্ষণে নজর দেওয়া হয়নি। বছরের পর বছর ধরে হাওড়ার এক কেন্দ্রীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে জঙ্গলাকীর্ণ জায়গায় অবহেলিত অবস্থায় পড়ে ছিল কবরস্থানটি। কিছুদিন আগে ঝোপঝাড় পরিষ্কার করার সময় দেখা যায়, কবরে সস্ত্রীক চিরঘুমে শায়িত উনিশ শতকের বিখ্যাত বাঙালি রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। সে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সম্পূর্ণ সংস্কার করা হয়েছে কবরস্থানের। শিবপুরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং, সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বা পূর্বতন বিই কলেজের প্রাঙ্গণে উনিশ শতকের এই ইতিহাস ফের জেগে উঠেছে। দেখতে আসছেন অনেকে।
উনিশ শতকের গোড়ার দিক। মিশনারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাংলায় ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল শিবপুরের বিশপ’স কলেজ। কলেজ লাগোয়া ছিল চার্চ, কবরস্থান। পরবর্তী কালে কলেজ প্রাঙ্গণে স্থানান্তরিত হয় প্রেসিডেন্সি কলেজের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ। এরপর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে বর্তমানের আইআইইএসটি নানা নামে পরিবর্তিত হয়। শুধু লোকচক্ষুর আড়ালে ঢেকে থাকে প্রতিষ্ঠানের ভিতরে থাকা ইতিহাসের একটি অধ্যায়। জানা গিয়েছে, বিশপ’স কলেজের ছাত্র ছিলেন নবজাগরণের পথিকৃৎ রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৮৫২ সালে এই কলেজেই শিক্ষক ও ধর্মযাজক হিসেবে যোগ দেন তিনি। তাঁর হাত ধরে এখানে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন পাথুরিয়াঘাটা ঠাকুরবাড়ির বেশ কয়েকজন সদস্য। ১৮৮৫ সালে বিশপ’স কলেজের কবরস্থানে সমাধিস্থ করা হয় কৃষ্ণমোহনকে। পাশে সমাধিস্থ করা হয় তাঁর স্ত্রীকে। এখানেই রয়েছে জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুরের ছেলে বরেন্দ্রমোহনের সমাধি। ১৮২৬ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত ৬২ খানা কবর খোঁড়া হয়েছিল এই স্থানে।
অনেকের কাছেই এই ইতিহাস ছিল অজানা। আইআইইএসটি’র বর্তমান ডিরেক্টর ভি এম এস আর মূর্তি দায়িত্ব নেওয়ার পর কলেজের বিভিন্ন দ্রষ্টব্য স্থানগুলি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কবরস্থানে বসানো হয় সৌরবিদ্যুৎ আলো। রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমাধির পাশে বসানো হয় ফলক। সাদা রং করা হয় প্রতিটি সমাধি।
আইআইইএসটি’র সহ নিবন্ধক ডঃ বিভোর দাস বলেন, ‘রেভারেন্ড বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমাধি সম্পর্কে অনেকেই জানতেন না। সাধারণ মানুষ যাতে এখানে এসে তা দেখতে পারেন তার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ বিশাল বড় এই ক্যাম্পাসের মধ্যে থাকা আরও কিছু ইতিহাস সংরক্ষণ করা হয়েছে। ১৯৫০ সালের পাঁচ ফেব্রুয়ারি বি ই কলেজের নতুন ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে এসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়। সেই ফলকটিও সংস্কার করা হয়েছে চলতি বছর। বিকেলের দিকে অনেকেই দেখতে আসছেন কলেজ ক্যাম্পাসে থাকা কবরস্থান। অনিন্দ্য পাঠক নামে ইতিহাসের এক ছাত্র বলেন, ‘হাওড়ার এই ইতিহাস অনেকেই জানেন না। কলেজ কর্তৃপক্ষ খুব ভালো উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলার নবজাগরণ সম্পর্কে জানাতে পড়ুয়াদের এখানে নিয়ে আসা প্রয়োজন।’ - নিজস্ব চিত্র