Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

ঐতিহ্যের ১০০

দিনটা ১৯২৭ সালের ৩ জানুয়ারি। তৎকালীন বাংলার গভর্নর তথা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য লর্ড লিটন দ্বারোদ্ঘাটন করেছিলেন বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের।

ঐতিহ্যের ১০০
  • ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

দিনটা ১৯২৭ সালের ৩ জানুয়ারি। তৎকালীন বাংলার গভর্নর তথা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য লর্ড লিটন দ্বারোদ্ঘাটন করেছিলেন বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের। 

Advertisement

আমাদের স্কুলের নামের এই ‘গভর্নমেন্ট’ শব্দটির অবশ্য দু’টি ভিন্ন ব্যাখ্যা আছে। ফলে বাংলায় এই স্কুলের নাম কোথাও বালিগঞ্জ সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। আবার কোথাও বালিগঞ্জ রাষ্ট্রীয় উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
তাতে অবশ্য এই স্কুলের সুপ্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কোনও তারতম্য ঘটছে না। বরাবরের মতো এখনও এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুধু ছাত্র গড়ার নয়, মানুষ গড়ার কারিগর।
১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বিজিএইচএস-এর ২০২৭ সালে শতবর্ষ। তবে সেই ঐতিহাসিক ১০০ বছরে পা দেওয়ার উদযাপনের পালা ২০২৬ থেকেই শুরু হয়ে যাচ্ছে। শতবর্ষে পদার্পণের প্রারম্ভিক অনুষ্ঠান মর্যাদামণ্ডিত ৩ জানুয়ারিতেই। ১০০ বছর আগে ঠিক যেদিন বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের দ্বারোদ্ঘাটন হয়েছিল, ১৯২৬-এর সেই ৩ জানুয়ারি হতে চলেছে এই স্কুলের প্রাক্তনীদের নিয়ে এক বিশাল বর্ণাঢ্য প্রভাতফেরি।
পরবর্তী জীবনে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে বাংলা তথা দেশ তথা সমগ্র বিশ্বে উজ্জ্বলতার ছাপ রেখেছেন, এমন কোন কিংবদন্তি কৈশোরে পড়েননি এই স্কুলে? প্রবাদপ্রতিম সত্যজিৎ রায়, শম্ভু মিত্র, ঋত্বিক ঘটক, রাহুল দেব বর্মণ তো আছেনই সেই উজ্জ্বল তালিকায়। এছাড়াও প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রসচিব প্রসাদরঞ্জন রায়, পুলিশ কমিশনার গৌতমমোহন চক্রবর্তী, গায়ক রূপঙ্কর বাগচী, অভিনেতা রজতাভ দত্ত, ইতিহাসবিদ তপন রায়চৌধুরী, কবি ও সাহিত্যিক নবারুণ ভট্টাচার্য, চিত্রগ্রাহক সুব্রত মিত্র, নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানী শেখর বসু সহ আরও অনেক বিখ্যাত মানুষ বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের গর্বিত প্রাক্তনী।
এহেন বটবৃক্ষসম স্কুলের বয়স বর্তমানে ৯৯ বছর চললেও এর প্রতিষ্ঠার পিছনে রয়েছে আরও ১৯-২০ বছরের ইতিহাস। আসলে ১৯০৮ সালে উত্তর কলকাতার যে বাড়িতে ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে ছিল প্রবল স্থানাভাব। কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ এম ই গ্রিফিথ তখন দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর অঞ্চলে‌র প্রশস্ত জায়গায় কলেজ স্থানান্তরের পাশাপাশি সেখানে একটি বিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এর মধ্যে গ্রিফিথ সাহেব বর্ধমানে বিদ্যালয় পরিদর্শক পদে বদলি হয়ে যাওয়ায় ১৯১৫ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত নানা সমস্যায় সেই কাজে বিঘ্ন ঘটে। তবে, ১৯১৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ সাডলার কমিশনে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় অন্তর্ভুক্ত হন। ‘বাংলার বাঘ’-এর ঐকান্তিক উদ্যোগে দক্ষিণ কলকাতার শিক্ষক শিক্ষণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজ এবং প্রশিক্ষণ বিদ্যালয় হিসেবে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল গড়ে ওঠে। যদিও ১৯২৪ সালে স্যার আশুতোষ প্রয়াত হন। কিন্তু তাঁর কর্মকুশলতার ছাপ মুছে যায়নি। অবশেষে সব বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে ১৯২৬ সালের শেষের দিকে ২১ নম্বর প্রমথেশ বড়ুয়া সরণিতে ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজ এবং ৩৮/২, নরেশ মিত্র সরণিতে (দু’টিই তদানীন্তন বেলতলা রোড) বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল গড়ে ওঠে। ১৯২৭ সালের ৩ জানুয়ারি এই স্কুলের দরজা পড়ুয়াদের জন্য খুলে যায়।
বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল ধারাবাহিক উৎকর্ষতার নজির। স্কুলের পড়ুয়াদের সার্বিক শিক্ষার দিকে প্রথম থেকেই নজর রয়েছে শিক্ষকদের। সেই ঐতিহ্য আজও বহন করে চলেছে বিজিএইচএস। এছাড়াও ফুটবল, ক্রিকেট, নাটক, বিতর্ক, আবৃত্তি, গান সব বিষয়েই ছাত্রদের প্রতি এই স্কুলের খেয়াল রয়েছে। এর মধ্যে ১৯৮৭ সালে সৃষ্টি হয় বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের ‘অ্যালমনি’। এই স্কুলের প্রাক্তনীদের সংগঠন। মাত্র তিনজন‌ প্রাক্তন ছাত্রের প্রধান উদ্যোগে। যাঁদের মধ্যে অন্যতম পরবর্তী জীবনে গায়ক সৈকত মিত্র। ওই বছরই স্কুলের হীরক জয়ন্তী বর্ষে প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রদের মধ্যে এক অঙ্কন প্রতিযোগিতা হয়। যার বিচারক ছিলেন সত্যজিৎ রায়। প্রথম তিন পুরস্কার বিজয়ীদের বেছে নিয়েছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ। আবার ২০২০-’২১ সালে কোভিড লকডাউনের জেরে 
মানুষ যখন দিশাহারা, সেসময় কলকাতা, তথা বাংলায় ঘুরে ঘুরে দুঃস্থ মানুষদের বিনামূল্যে 
খাদ্য ও পড়াশোনার সামগ্রী বিলি করেছে স্কুলের প্রাক্তনীদের সংগঠন। 
সবমিলিয়ে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের ইউএসপি— একজন মানুষকে শুধু ভালো ছাত্র হিসেবেই গড়া নয়, তাকে ভালো মানুষ হিসেবেও গড়ে তোলা।
—সুপ্রিয় মুখার্জি, প্রাক্তনী

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ