


বাতাসে শারদীয়ার মনখারাপিয়া সুর, কোজাগরীর ঘোর কাটতে না কাটতেই হিমঝরানো কৃষ্ণপক্ষ। ক্ষয়িষ্ণু চাঁদের দিকে তাকালেই কালীপুজোর সব অনুষঙ্গ দরজায় কড়া নাড়ে। একে একে পেরই ধনত্রয়োদশী, ভূতচতুর্দশী, দীপাবলি অমাবস্যা। গোটা কার্তিক মাস ধরেই আত্মা বা মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত নানা পার্বণ।
আমেরিকার হ্যালোইন আর ভারতের আকাশপ্রদীপ জ্বলা ভূতচতুর্দশীর ঝুপসি অন্ধকারে ডুবে যাওয়া আদিগন্ত চরাচর। বাজির গন্ধকী গন্ধে ভরপুর হয় বাতাস। ফিরে যাবেন মৃতের আত্মারা পথ চিনে স্বর্গলোকের ঠিকানায়। তাঁদের শান্তি কামনাতেই সন্ধেবেলায় বাড়ির আনাচেকানাচে, দোরে দোরে জ্বলে ওঠে চোদ্দো প্রদীপ। ঘোর অমানিশার অন্ধকারে মৃত আত্মাদের বিচরণ। কোথাও যেন একফোঁটা অন্ধকার না থাকে। বৈদিক মতে এর ঠিক একমাস আগে মহালয়ার দিন মৃত আত্মার শান্তি কামনায় তর্পণ করেছিলাম আমরা। তাঁদেরই স্মৃতিতে। আবার তন্ত্র মতে ঠিক একমাস পরে এই কার্তিক অমাবস্যার আগের দিন মৃত আত্মাদের আলো জ্বালিয়ে স্মরণ-মনন। অমৃতলোকে ভালো থাকুন তাঁরা। সেদিন আবার চোদ্দোশাক ভেজে খাওয়ার রীতি। কার্তিকের ঋতু পরিবর্তনে আবালবৃদ্ধবনিতার মৌখিক টিকাকরণের সুরক্ষাকবচ। মা শোনাতেন আয়ুর্বেদের কচকচানি।
তবে অন্ধকারের সঙ্গে কালের দেবী কালীর সম্পর্ক বেশ রহস্যময়। পুরাণকথায় দেবী কালী নাকি কার্তিক মাসের এই চতুর্দশীর রাতেই ভয়ানক অত্যাচারী অসুরকে বধ করেন বলেই তাঁর পুজোয় এত ধুম। আর দীপাবলি সেই আলোর উৎসব যেখানে আমরা সার্বিক ভাবে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে ক্রমশ প্রবেশ করি নারীশক্তির হাত ধরেই। ‘অসতো মা সদ্গময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়’।
কালীপুজো বা আলোর উৎসবের সেটাই পজিটিভ ভাইব। কালের দেবীর হাত ধরেই আমাদের অন্ধকার থেকে আলোতে, মৃত্যু থেকে অমৃতের দিকে, মন্দ থেকে ভালোর দিকে, অবিদ্যা বা অজ্ঞানতা থেকে জ্ঞান এবং বাস্তবতার দিকে যাওয়া।
দীপান্বিতা বা দীপাবলিকে কেন্দ্র করেই নতুন পোশাক, সুখাদ্য আর উপহার আদানপ্রদান। অশুভ শক্তির বিনাশ আর শুভ শক্তির বরণোত্সবই মোদ্দা কথা।
ধনাগমের জন্য ধনতেরস ও লক্ষ্মী-গণেশের পুজো। মূল উদ্দেশ্য শ্রীবৃদ্ধি ও উন্নতি। ‘আলোয় আলোয় সব ঘুচে যাক্, মুছিয়ে দে মা মনের কালি’।
আমাদের কৃষিপ্রধান দেশে আশ্বিন-কার্তিক মাসে ফসল কাটার সময় লক্ষ্মীপুজো প্রাসঙ্গিক। সুকুমারী ভট্টাচার্যর মতে ‘লক্ষ্মীর অপর নাম শ্রী যা এসেছে লাতিন ‘সেরেস’ থেকে, যার অর্থ শস্যের অধিষ্ঠাত্রী’। তাই এসময় শস্যদেবীর উপাসনা। তাই বুঝি পশ্চিমবাংলার ঘটিদের এবং কালীঘাটের মন্দিরেও কালীপুজোর পাশাপাশি সেদিন লক্ষ্মীপুজো হয়। কার্ত্তিকলক্ষ্মীই দীপান্বিতা। সংসারের শ্রীবৃদ্ধির আশায় লক্ষ্মী, নারায়ণ আর ধনপতি কুবেরের পুজোয় পিটুলি বাটা দিয়ে আমার মা তাঁর নিপুণ হাতে গড়তেন মূর্তি। কলার পেটোতে সেই পুতুল তিনটিরই পুজো হয় ওইদিন। আর একটি কলার পেটোতে মাথা থেকে আঁচড়ানো চুলের নুড়ি, একটু গোবর আর একটা ভাঙা মোমবাতি রেখে চাটাই পিটিয়ে, মোমবাতি জ্বেলে অলক্ষ্মী, অজ্ঞানতা বা অবিদ্যাকে বাড়ির বাইরে বের করে পুজো হল ভূত-প্রেত-অশরীরী আত্মা জাতীয় ‘অলক্ষ্মী’ বা নেগেটিভ শক্তি ঘর থেকে বিদায়ের রীতি। অশুভ শক্তির বিনাশে শুভ শক্তি শ্রীকে বরণ করে নেওয়া ওই তিন পুতুলের প্রাণপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। দীপান্বিতার ভোগে ধবধবে সাদা ঘিয়ের লুচি আর সদ্য ওঠা ফুলকপির ডালনার ঘ্রাণ আসে আজও। এ ভোগের চাটনিও অন্য কোথাও খাইনি আর। সদ্য ওঠা মুলো, রাঙালু, বেগুন, মটর ডালের বড়ি আর কাঁচা তেঁতুল দিয়ে। অনবদ্য স্বাদ তার। অলক্ষ্মী বিদায় সেরে তবেই লক্ষ্মীর পুজো দেখেছি। মা বলতেন, শুভ-অশুভ, মন্দ-ভালো, সাদা-কালো, আলো-আঁধার এসবের মাঝে অলক্ষ্মী-লক্ষ্মী এ দুইই ভগবতীর রূপ। আমাদের সবার মধ্যেই দু’টি দিকই আছে। আমাদের ভেতরের ‘লক্ষ্মী’র সঙ্গে ঢুকে যায় অলক্ষ্মীও। তাই তাঁকে বিদায় দেওয়া হয়। কালো না থাকলে কি সাদাকে চেনা যায়? সেজন্যই কালীপুজোর দিন লক্ষ্মী ও অলক্ষ্মী দু’জনেই থাকেন। ঠিক যেমন দুর্গাপুজোয় দেবী দুর্গার সঙ্গে আসেন মহিষাসুরও।
ভূতচতুর্দশীর আগের দিন ধনত্রয়োদশীর হিড়িক অনেকটাই এখন পণ্য সংস্কৃতির আওতায়। কিন্তু ঝাঁটা কেনা হয় কেন? মৎস্যপুরাণ মতে ঝাঁটাতেও মা লক্ষ্মীর বিরাজ। আবার বৃহৎসংহিতায় ঝাঁটা সংসারের অশুভ শক্তির বিনাশকারী। আসমুদ্রহিমাচল দীপাবলির দিনে মানুষ তাই ঘরদোর সাফ করে, রং করে, কোথাও কোনও ধূলো মলিনতা না থাকে। ঝাঁটাও তো এসবেরই প্রতীক। লক্ষ্মীর পুজো তো আসলে সংসারের শ্রী ফেরানো, তাই না? আবারও সেই মাতৃকাতন্ত্রের বাদ্যি বাজে। আনাচেকানাচে পরিচ্ছন্নতাই তো শ্রী আনে সংসারে। বছরে একবার এভাবে সাফাই অভিযান কিন্তু পরিবেশ ও প্রকৃতির পক্ষেও হিতকর। এরপরেই নিদারুণ শীতকালীন আলস্য যাপনের কারণে সবদিক পরিষ্কার রাখা হয়তো সম্ভব নয় বলেই আমরা ঘরদোর ধুয়েমুছে সাফসুতরো করি কালীপুজোর আগেভাগেই। আর তাই বুঝি ঝাঁটা কেনা। সারদামাও কিন্তু ঝাঁটা গাছটির যথাযোগ্য সম্মান দিতে বলেছিলেন। তুচ্ছ জিনিসও সংসারে
ফেলনা নয়।
ধনত্রয়োদশীতে মনে পড়ে দেববৈদ্য ধন্বন্তরীকে। সমুদ্রবিছানায় বিষ্ণুর কূর্মঅবতারের কঠিন পৃষ্ঠখানি, বাসুকি নাগ স্বরূপ মন্থনদণ্ড দিয়ে ক্ষীরসমুদ্র মন্থনে উঠে এসেছিল নানা ঔষধি যাকে পুরাণে বলছে ঘি বা মাখন আর তারপরেই লক্ষ্মী, ঐরাবত, উচ্চৈঃশ্রবা, বৈচিত্র্যময় মণিমাণিক্য, পারিজাত নামক স্বর্গের নান্দনিক পুষ্পবৃক্ষ আর সবশেষে ১৪টি বিশেষ রত্নের সঙ্গে ছিল অমোঘ অমৃতকলস হাতে এই দেববৈদ্য। অসুররা তা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও দেবতারা তাদের অর্ধেক দিলেন— তা আছে অগ্নিপুরাণে। তবে এই ক্ষীরোদসাগর মন্থনের ফলে স্বর্গের বৈদ্য ধন্বন্তরী সুশ্রুত নামে তাঁর শিষ্যকে অষ্টাঙ্গ আয়ুর্বেদ উপদেশ দিয়েছিলেন।
আয়ুর্বেদধন্য ভারতের এই ধন্বন্তরী, সুশ্রুত আর অমৃতের ঔষধিগুণ একযোগে উচ্চারিত হলেই মনে পড়ে আমাদের অসুখ নিরাময়ে ডাক্তারদের উদ্দেশে ধন্বন্তরী বিশেষণ প্রয়োগ। তাই বুঝি জাতীয় আয়ুর্বেদ দিবস ধন্বন্তরী জয়ন্তী। সবশেষে বাসুকিরাজের সহস্র ফণারূপ ছত্র মাথায় উঠে এসেছিলেন সমুদ্রের ক্ষীরসাগর থেকে মহালক্ষ্মী, ভূদেবী। তাই তো ধনলক্ষ্মীর উপাসনা।
এই অমৃতকুম্ভের জন্যই দেবাসুরের যাবতীয় দ্বন্দ্ব। অমৃত সেই সঞ্জিবনী সুধা যা পান করে দেবতারা অমরত্ব লাভ করলেন। অমৃতের স্বার্থে দেব-দানবের সন্ধি বা আর্য-অনার্যর সমঝোতা আজকের ভাষায় ‘শত্রু-মিত্রের সেটিং’ যা এই সাগরমন্থনের স্ট্র্যাটেজিকে বেশ ভাবায় বইকি। মানে তুমিও নাও, আমাকেও দাও। সাপ ও নেউলের সঙ্গে সাময়িক সমঝোতা। বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্র স্বার্থ বিসর্জন।
কালীপুজোর বাজির গন্ধকী গন্ধ নাকে এলেই মনে পড়ে ভাইয়ের লাগাতার ক্যাপ বন্দুক ফাটানোর শব্দে পাগল পাগল অবস্থা আর ক্যানিং স্ট্রিট থেকে বাবার বাজি কিনে আনা, তুবড়ি, রংমশাল বানিয়ে রোদে খাওয়ানো। ছোটবেলার সেই বিখ্যাত ‘হরেকরকম বাজি ও বারুদের কারখানা’ টাং ট্যুইস্টার মনে পড়ে আপনাদের? বাবা বলতেন আগে বলো ঠিক করে, তবে বাজি পাবে। আর কালীপুজোর পরদিন ভাঙা মোমবাতির টুকরো ছাদের আলসে থেকে কুড়িয়ে এনে মহা উৎসাহে তা পেঁপের ফাঁপা ডালে ভরে মোমবাতি বানানোর নেশায় মেতে উঠতাম মায়ের সঙ্গে।
এখন মহাকালের নিয়ন্ত্রক মহাকালী দুনিয়ার সব কালো রঙের সমষ্টি শুষে নিয়ে আসেন বটে কিন্তু চারদিকে পাপের আধার। নেইকো কোথাও আলো। প্রলয়কালে সব রং নিজের মধ্যে বিলীন করে দিয়েই তিনি কালী হয়েছিলেন আর এই দিগবসনা শক্তিকে ঢাকবে কোন বস্ত্র?
পঞ্চভূত জুড়ে যিনি বিরাজমনা, তাঁকে ঢাকার সাধ্য নেই কোনও বস্ত্রের। অনন্তস্বরূপা আবরণ থেকে আভরণ সবের মধ্যেই বিরাজমান। বাইরে থেকে শাড়ি জড়ানো দেবীমূর্তির রূপটি আমাদের কল্পনাপ্রসূত। শিব অপার, অসীম সমুদ্র যা মূলত স্থির। এবং কালী সেই বিশাল সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ যা সৃষ্টি হয় দাপটের সঙ্গে সাগরের বুকেই আর বিলীন হয়ে যায় মুহূর্তেই সাগরের গভীরেই।
তাই কালীই হোক বা লক্ষ্মী— আলোর উৎসবে সবখানেই মাতৃকাতন্ত্রের ভেরী বেজে ওঠে। নারীশক্তির হাত ধরেই অন্ধকার থেকে আলোর দিকে প্রবেশ। আলোর উত্সব দীপান্বিতা বা দীপাবলি বা দেওয়ালিকে ঘিরে নতুন পোশাক, সুখাদ্য আর উপহার আদানপ্রদান অব্যাহত থাক।
সর্বত্রই অশুভ শক্তির বিনাশ আর শুভ শক্তির বরণোত্সব হোক কালীপুজোর আলোয় আলোয়।
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়