Bartaman Logo
২৬ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

সমৃদ্ধি কামনায় লক্ষ্মীর আরাধনা

সংস্কৃতে ‘ধনত্রয়োদশী’, হিন্দিতে ‘ধনতেরস’। বাংলায় ধনত্রয়োদশীই বলতে হয়। নীরোগ শরীর ও মজবুত স্বাস্থ্যের জন্য ধন্বন্তরি দেব এবং সমৃদ্ধি ও ধনদৌলত কামনায় মা লক্ষ্মীর যুগপৎ আরাধনা কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশীতে। এটাই ধনতেরসের মাহাত্ম্য। এই উৎসব উত্তর ও পশ্চিম ভারতের হিন্দিভাষী জনগোষ্ঠীর দেশজ সংস্কৃতিসম্ভূত।

সমৃদ্ধি কামনায় লক্ষ্মীর আরাধনা
  • ১৮ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু বসু: সংস্কৃতে ‘ধনত্রয়োদশী’, হিন্দিতে ‘ধনতেরস’। বাংলায় ধনত্রয়োদশীই বলতে হয়। নীরোগ শরীর ও মজবুত স্বাস্থ্যের জন্য ধন্বন্তরি দেব এবং সমৃদ্ধি ও ধনদৌলত কামনায় মা লক্ষ্মীর যুগপৎ আরাধনা কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশীতে। এটাই ধনতেরসের মাহাত্ম্য। এই উৎসব উত্তর ও পশ্চিম ভারতের হিন্দিভাষী জনগোষ্ঠীর দেশজ সংস্কৃতিসম্ভূত।
উত্তর ও পশ্চিম ভারতে পাঁচ দিনের দীপাবলি উৎসবের সূচনা ধনতেরসে, শেষ ভাইদুজ বা ভাইফোঁটায়। বাংলায় এই উৎসব একটু আলাদা। আমাদের দীপাবলি উৎসবের প্রসিদ্ধি দীপান্বিতা কালীপুজোর জন্য। অষ্টাদশ শতকে দীপান্বিতা কালীপুজোকে জনপ্রিয় করেছিলেন নদীয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র। তাঁর হুকুমে প্রতিবছর নদীয়ায় নাকি দশ হাজার কালীমূর্তি পুজো হতো। তবে কার্তিক মাসের অমাবস্যায় লক্ষ্মীপুজোরও চল আছে বাংলায়। লক্ষ্মী ধনসম্পদের দেবী। তাঁকে সন্তুষ্ট করার আগ্রহ মানুষের স্বভাবসিদ্ধ। বছরের বিভিন্ন সময় লক্ষ্মীর পুজো হয়ে থাকে। আমাদের এই বাংলায় ভাদ্র, পৌষ ও চৈত্রে কৃষ্ণপক্ষের নির্দিষ্ট বৃহস্পতিবারে দিনের বেলায় এবং আশ্বিনের পূর্ণিমার দিন ও দীপাবলির দিন রাতে লক্ষ্মীপুজো হয়। তবে জনপ্রিয়তার নিরিখে প্রথমেই আসে আশ্বিনের কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো।   
আমাদের বাড়িতে দীপান্বিতা কালীপুজোর দিন লক্ষ্মীপুজো হয়। বাড়ির এই পুজো নিয়ে বিগত প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছরের স্মৃতি হাতড়ে দেখি, দীপাবলির কয়েকদিন আগে বাড়িতেই মাটি দিয়ে চোদ্দো প্রদীপ বানানো হতো। আমি নিজেও সে কাজে হাত লাগাতাম। চোদ্দো শাকের দু-একটা কম পড়লে, ঠাকুমার সঙ্গে চোদ্দো শাক খোঁজাখুঁজি করেছি বাড়ির বাগানে। ভূত চতুর্দশীর দিন সন্ধেয় মায়ের হাতে জ্বেলে দেওয়া প্রদীপগুলো নিয়ে ছুটেছি বাড়ির দুয়ারে দুয়ারে স্থাপন করতে। হাত দিয়ে প্রদীপের শিখা আড়াল করেছি যাতে হাওয়ায় নিভে না যায়। এর পরের দিন লক্ষ্মীপুজো। কলাবউ ও লক্ষ্মীসরা স্থাপন করে পুজো। ওদিন সকালে চালের গুঁড়ো জলে গুলে তা দিয়ে অপটু হাতে আলপনা দিতে সাহায্য করেছি মাকে। সিঁড়িতে বারান্দায় মা লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ এঁকেছি। গোটা বাড়িকে সাজাতে সাঁঝবেলায় জ্বেলেছি সারি সারি মোমবাতি। ছাদে, বারান্দায়। বাজি পুড়িয়েছি। এর একদিন পরে ভাইফোঁটা। ধনতেরস কিন্তু আমার বাল্যস্মৃতির ঝাঁপিতে নেই।
ডঃ সুকুমার সেন বাংলার সংস্কৃতিতে দু’টি ধারাপ্রবাহের উল্লেখ করেছেন। একটি হল সেই সংস্কৃতি যা ভারতে নেই বা ভারতের অন্যত্র ফোটেনি। অর্থাৎ সেই সংস্কৃতি, যা বাংলার একান্ত নিজস্ব, যে সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যে বাঙালি স্বতন্ত্র। আর দ্বিতীয়টি হল ভারতীয় সংস্কৃতির ধারা, যা অপরিবর্তিত রূপে বাংলার সংস্কৃতিতে মিশেছে বা বাংলার আবহে রূপান্তরিত হয়ে তার একটি বঙ্গীয় রূপ তৈরি হয়েছে। ধনতেরস দ্বিতীয় গোত্রীয়। 
১৯৫১-’৫২ সালে বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি’র ‘পূজা-পার্বণ’ ও পুলিনবিহারী সেন রচিত ‘বাংলার পালপার্বণ’-এ  বাঙালির ধনতেরস উদ্‌যাপনের কোনও উল্লেখ নেই। ধনতেরসের কথা ডঃ নীহাররঞ্জন রায় প্রণীত ‘বাঙালির ইতিহাস (আদি পর্ব)’ গ্রন্থেও নেই। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এ ধনতেরস শব্দটিকে লিপিবদ্ধ করেননি। ঐতিহ্যগতভাবে ধনতেরস যে কখনও বাঙালির ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’-এর অন্তর্ভুক্ত ছিল না, এসব তার অকাট্য প্রমাণ। সাহিত্য সমাজের দর্পণ। বাঙালির উৎসবের অনুষঙ্গ নানা ভাবে এসেছে তার সাহিত্যে। চর্যাপদের সময় থেকে শুরু করে স্বাধীনোত্তর কাল পর্যন্ত প্রসারিত বিপুল আয়তনের বাংলা সাহিত্যেও ধনতেরস উৎসব পালনের কোনও উজ্জ্বল অস্তিত্ব নজরে পড়ছে না। ধনতেরস বাংলার সংস্কৃতি প্রবাহে মিশে যাওয়া উত্তর ও পশ্চিম ভারতীয় সংস্কৃতির ধারা। এই সম্মিলন ঘটেছে হাল আমলে। বিশ শতকের শেষের দিকে। বিশ্বায়ন প্রসূত বিপণন ব্যবস্থা ও হিন্দি সংস্কৃতির আগ্রাসী আধিপত্যের কারণে। তবে ধনতেরসের নেপথ্যে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান যতটা না গ্রহণ করেছে বাঙালি, তার চেয়ে বেশি গ্রহণ করেছে কার্তিকের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশীতে কেনাকাটার সংস্কৃতি। এ প্রসঙ্গে পরে আসব। আপাতত দেখা যাক ধনতেরসের নেপথ্যে পৌরাণিক কাহিনি ও প্রচলিত কিংবদন্তি কী আছে।
একদা দেবগণ সুমেরু পর্বতের শিখরে বসে অমৃতপ্রাপ্তির মন্ত্রণা করছিলেন। ব্রহ্মার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নারায়ণ বললেন, দেবগণ ও অসুরগণ এক হয়ে সমুদ্রমন্থন করুন, তা হলে অমৃতের সন্ধান পাওয়া যাবে। 
ব্রহ্মা ও নারায়ণের আদেশে নাগরাজ বাসুকী মন্দার পর্বত উৎপাটন করলেন। নাগরাজকে সঙ্গে নিয়ে দেবতারা সমুদ্রের কাছে গিয়ে বললেন, অমৃত চাই। আমরা আপনাকে মন্থন করব। 
সমুদ্র বললেন, বেশ। তবে অমৃতের অংশ আমি যেন পাই। 
দেবাসুরের অনুরোধে কূর্মরাজ মন্দার পর্বতকে পিঠে ধারণ করলেন।
ইন্দ্র বজ্র দিয়ে পর্বতের তলদেশ সমান করে দিলেন। তারপর মন্দারকে মন্থনদণ্ড ও বাসুকীকে রজ্জু করে দেবাসুরে সমুদ্রমন্থনে মেতে উঠল।
অসুরেরা নাগরাজের মুখের কাছটা ও দেবতারা নাগরাজের পুচ্ছ ধরল।
বাসুকীর মুখ থেকে ধোঁয়া ও আগুনের সঙ্গে যে নিঃশ্বাসবায়ু নির্গত হল, তা মেঘে পরিণত হয়ে দেবাসুরের উপরে জলবর্ষণ করতে লাগল। সমুদ্রের গর্ভ থেকে মেঘগর্জনের ন্যায় শব্দ উঠতে লাগল। মন্দারের ঘর্ষণে বহু জলজন্তু নিষ্পিষ্ট হল। পর্বতের গাছপালা পাখপাখালি-সহ নিপতিত হল। বাঘ-সিংহ-হাতি-ঘোড়া হল অগ্নিদগ্ধ। নানাপ্রকার বৃক্ষের নির্যাস, ওষধির রস এবং কাঞ্চন দ্রব্য সমুদ্রের জলে পড়ল। সেই রস মিশ্রিত জল থেকে তৈরি হল দুধ ও ঘি।
তারপর সাগর থেকে চন্দ্র উঠলেন। ঘৃত থেকে উঠলেন লক্ষ্মী। সুরা দেবী, শ্বেতবর্ণ উচ্চৈঃশ্রবা অশ্ব এবং নারায়ণের বক্ষের ভূষণ কৌস্তুভমণির উদ্ভব হল। সর্বকামনাপূরক পারিজাত ও সুরভী ধেনুও উঠে এল। লক্ষ্মী, সুরা দেবী, চন্দ্র ও উচ্চৈঃশ্রবা দেবগণের কাছে গেল। অনন্তর ধন্বন্তরি দেব অমৃতপূর্ণ কমণ্ডলু নিয়ে উঠলেন। অমৃত চাই, অমৃত চাই — শোরগোল পড়ে গেল দেবতা ও অসুরদের মধ্যে। এই কাহিনির শেষাংশ আর বিস্তারিত বর্ণনার প্রয়োজন নেই। সকলেই জানেন কী করে দেবতারা কৌশলে অসুরদের অমৃতলাভ থেকে বঞ্চিত করেছিলেন। মা লক্ষ্মীর আবির্ভাবে স্বর্গ শ্রীময়ী হল। দেবতাদের আধিপত্য অটুট রইল।  
সমুদ্র থেকে উত্থিত ধন্বন্তরির এক হাতে ছিল অমৃতপূর্ণ কমণ্ডলু, আরেক হাতে ছিল আয়ুর্বেদ সংহিতা। যে তিথিতে লক্ষ্মীদেবী ও ধন্বন্তরি সমুদ্রমন্থনের ফলে ক্ষীরোদসাগর থেকে উত্থিত হয়েছিলেন, সেই তিথিটি হল কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী। তাই কেউ কেউ বলে ধন্বন্তরি ত্রয়োদশী। এই দিনটি ধনত্রয়োদশীও বটে। ক্ষীরোদসাগর থেকে মা লক্ষ্মীরও উত্থান ওই তিথিতে। তাই মানুষের বিশ্বাস, ওই দিনে মা লক্ষ্মীর আরাধনা করলে অক্ষয় হয় ধনদৌলত।   
ধনদৌলত সকলেই চায়। সাধারণ গৃহী মানুষের জীবনসাধনা হল সুখের সাধনা। আজীবন সুখ খোঁজে সে। বিত্ত দেয় সুখ। অতএব সুখ খরিদ করতে প্রয়োজন কাঞ্চনমূল্যের। মা লক্ষ্মী সুখ-সমৃদ্ধির দেবী। তিনি গৃহে অচঞ্চলা হলে সতত স্বর্গসুখ বিরাজ করে গার্হস্থ্য জীবনে। তাই তো মা লক্ষ্মীর প্রতি গৃহীর আকুল আবেদন, এসো মা লক্ষ্মী বোসো ঘরে, আমারই ঘরে থাকো আলো করে। স্বাস্থ্যও সম্পদ। মানুষের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাই গৃহস্থের ধনসাধনার আরেক দিক হল স্বাস্থ্যসাধনা। আর প্রচলিত বিশ্বাস এই যে, স্বাস্থ্যসাধনায় মোক্ষলাভের জন্য চাই ধন্বন্তরির কৃপা। তিনিই তো আয়ুর্বেদের দেবতা। আমাদের নীরোগ রাখেন তো তিনিই। ক্ষীরোদসাগর থেকে এক হাতে অমৃত কমণ্ডলু ও আরেক হাতে আয়ুর্বেদশাস্ত্র নিয়ে তাঁর আবির্ভাব। অমৃত হল অমরত্বের প্রতীক। আর সাধারণ মানুষকে রোগব্যাধির প্রকোপ থেকে দূরে রাখতে চাই আয়ুর্বেদ। তাই অনেকে মনে করেন ধনতেরস মূলত সুস্বাস্থ্য কামনার দিন। অটুট, অক্ষয় স্বাস্থ্য ও দীর্ঘ আয়ু্লাভের আকুলতাই এর মাহাত্ম্য। 
এ তো গেল পৌরাণিক আখ্যানের কথা, ধনতেরসের দিনে ধন অর্জনের প্রতি মানুষের আকর্ষণ একটি কিংবদন্তির আড়ালে প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে। উত্তর ভারতীয় একটি উপকথা অনুসারে রাজা হিমের ষোলো বছরের ছেলের জীবনে ছিল এক অভিশাপ। রাজপুত্রের কোষ্ঠীবিচার করে রাজজ্যোতিষী নিদান দিয়েছিলেন, বিয়ের চার দিনের মাথায় সাপের কাপড়ে রাজপুত্রের মৃত্যু হবে। অনেকটা যেন মনসামঙ্গলের কাহিনি। বেহুলা-লখিন্দরের গল্প। তবে লখিন্দরকে দংশন করেছিল কালনাগ। পরে মনসার কৃপায় তার পুনর্জন্ম হয়। কিন্তু এই কিংবদন্তি অনুসারে রাজা হিমের পুত্রের ক্ষেত্রে অন্যথা ঘটল। বিধির বিধান খণ্ডন হল নববধূর বুদ্ধিমত্তায়। বাসরঘরেই মৃত্যু হবে তার স্বামীর। এ কথা জানতে পেরে নববধূ সেই অভিশপ্ত দিনে তার স্বামীকে ঘুমোতে দিল না, শয়নকক্ষের দরজায় জড়ো করে রাখল তার সমস্ত সমস্ত গয়না ও অনেক সোনা-রুপার মুদ্রা। সেই সঙ্গে সারা ঘর আলোকিত করল প্রদীপের আলোয়। স্বামীকে জাগিয়ে রাখতে সারারাত তাকে গল্প শোনাল, গান শোনাল নববধূ। শয়নকক্ষের দরজায় এসে মৃত্যুর দেবতা যমের চোখ ধাঁধিয়ে গেল আলো আর গয়নার জৌলুসে। যম এসেছিলেন সাপের রূপ ধরে। শয়ন কক্ষের দরজা পর্যন্ত পৌঁছলেন ঠিকই কিন্তু হিমের পুত্রকে দংশন করা হল না। সোনার উপর বসে গল্প আর গান শুনে মোহিত হলেন। সময় অতিবাহিত হয়ে গেল। অভীষ্ট লক্ষ্য অসম্পূর্ণ রেখেই চলে গেলেন যম। নববধূর বুদ্ধিমত্তায় প্রাণে বাঁচলেন রাজপুত্র। পরের দিন সেই আনন্দে পালন করা হল ধনতেরস। 
এই উত্তর ভারতীয় কিংবদন্তিতে দেখা যাচ্ছে ঘরের দুয়ারে রক্ষিত গয়না ও সোনা-রুপার মুদ্রা বিভ্রান্ত করেছিল যমরাজকে। সম্পদ-ঐশ্বর্যের জৌলুসে যমরাজের চোখ ঝলসে গিয়েছিল। এ হল যমকে পরাভূত করার লড়াই। যমের সঙ্গে পাঞ্জা কষা। তার জন্য দৌলত প্রয়োজন। তাই হয়তো বহু মানুষ আজও বিশ্বাস করে ধন ত্রয়োদশী তিথিতে ধন সংগ্রহ করলে যমরাজের করাল দৃষ্টি পড়বে না পরিবারের উপরে, প্রিয়জনের উপরে। এছাড়া প্রচলিত বিশ্বাস এই যে, ধনতেরসের দিনে কেনাকাটা করলে অর্জিত সম্পদ তেরো গুণ বেড়ে যায়। দেখা যাচ্ছে বাণিজ্য ও বিপণনের সঙ্গে ধনতেরসের একটা নিবিড় যোগ রয়েছে। বিশ্বায়ন কালে বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংস্থার আগ্রাসী বিজ্ঞাপন কৌশল ধনতেরসকে বাঙালির কাছে সুপরিচিত করেছে। বাঙালি ধনতেরসের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান যতটা না গ্রহণ করেছে তার চেয়ে বেশি গ্রহণ করেছে ধনতেরসের দিনে কেনাকাটার সংস্কৃতিকে। সেটা শহর কলকাতা বা ছোটখাট মফস্‌সল শহরের নামী-অনামী গয়নার দোকানের উপচে পড়া ভিড়ের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। ইদানীং ধনতেরসে কেনাকাটার হুড়োহুড়ি যা দেখি, ছেলেবেলার স্মৃতি হাতড়ে সে ছবি খুঁজে পাচ্ছি না।

Advertisement

ধনতেরসে সোনা কেনে মানুষ। সোনা সমৃদ্ধির প্রতীক। ধনতেরস উপলক্ষ্যে ক্রীত পণ্যসামগ্রীর মধ্যে সোনাই সবচেয়ে জনপ্রিয়। তা অলঙ্কার হতে পারে বা মুদ্রাও হতে পারে। ধনতেরসে সোনার দোকানগুলোতে ভিড় তাই উপচে পড়ে। মনোরম আলোকসজ্জায় সোনার দোকানগুলো সাজিয়ে তোলে ব্যবসায়ীরা। কিন্তু সবার তো সোনা কেনার সামর্থ্য থাকে না। তারা করবে কী? উৎসব সবার, শুধু বিত্তবানের জন্য নয়। অতএব সোনা কেনার সামর্থ্য নেই তো কী হয়েছে, রুপো কেনো। ধনতেরসে রুপো কেনাও নাকি শুভ। তাই ধনতেরস উপলক্ষে রৌপ্য অলঙ্কার, দেব-দেবীর রুপোর মূর্তি এসবের বিক্রিও কম নয়। অক্ষয় সমৃদ্ধি মানসে ধনতেরস। সোনা-রুপো কেনার তাৎপর্যটা সহজেই অনুমেয়। সোনা ও রুপো হল এমন সামগ্রী যা গৃহীর কাছে গচ্ছিত থাকে। সেই অর্থে এর লয়ক্ষয় হয় না। সময়ের সঙ্গে সোনা-রুপোর মূল্য কেবল বেড়েই চলে। গৃহীর বিনিয়োগ সার্থক হয়। রুপো কেনার সামর্থ্য না থাকলে যেকোনও ধাতব বস্তু কেনা যেতে পারে। ধনতেরসে যেকোনও ধাতু ক্রয়কেই শুভ বলে মনে করা হয়। 
এ তো গেল সোনা-রুপোর কথা। বাজার চায় ব্যবসা। বিক্রেতা চায় ক্রেতা। বিজ্ঞাপনী অভিব্যক্তিতে বণিক হয়ে ওঠে আগ্রাসী। হেতু একটা পেলেই হল। ক্রেতাকে কেনাকাটায় মাতিয়ে দাও। তাহলেই বাজিমাত। অনুষঙ্গ খুঁজে বেড়ায় বাজার। সে সরস্বতী পুজো, দোলযাত্রা, বাংলা নববর্ষ, রথযাত্রা, দুর্গোৎসব, স্বাধীনতা দিবস, সাধারণতন্ত্র দিবস, প্রভু যিশুর জন্মদিন, প্রভু শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন যাই হোক না কেন। সমস্ত পার্বণেই খবরের কাগজের পাতাজোড়া বিজ্ঞাপনে চটকদার ভাষা নজর কাড়ে — ‘ডাবল ধামাকা’, ‘বাম্পার সেল’, ‘চিত্তাকর্ষক ছাড়’, ‘সুবর্ণ সুযোগ’ ইত্যাদি। 
তাহলে ধনতেরসই বা পিছিয়ে থাকে কেন! কেনাকাটাই বা সোনা-রুপোর গয়নাগাটি আর ধাতব বাসনকোসনে আটকে থাকে কেন। ধনতেরস দিনটি শুভ। অতএব নতুন টিভি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদি কেনার উপযুক্ত সময় ধনতেরস। যারা ইলেকট্রনিকস দ্রব্যাদি ও হোম অ্যাপ্লায়েন্সেসের কারবার করেন তাদের শোরুমগুলোতে ভিড় উপচে পড়ে। ধনতেরসের দিনে গভীর রাত পর্যন্ত কেনাকাটা চলে। কর্তা-গিন্নি তৃপ্ত হয়ে বাড়িতে ফেরে লটবহর নিয়ে। বিজ্ঞাপনে মিলায় বস্তু...।
ঝাঁটাও কেনেন কেউ কেউ। পুরনো ঝাড়ু বিদায় করে নতুন ঝাড়ু কিনলে নাকি ইতিবাচক শক্তি আসে। যেকোনও উৎসবে নতুন জামাকাপড় কেনার সংস্কার থাকে। ধনতেরসও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রমাণ কাপড়ের দোকানে ভিড়। শপিং মলে গিজগিজ করছে লোকজন। ক্যাশ কাউন্টারের সামনে লম্বা ভিড়। যদি প্রশ্ন করা যায়, ক্রেতা তুমি করছ কী? উত্তর মিলবে, নতুন জামা,কাপড়, জুতো, হোম অ্যাপ্লায়েন্সেস, ঘরের খুঁটিনাটি জিনিস— যা পাচ্ছি, তাই কিনছি। আজ ধনতেরস! বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ খাতে নয়া সংযোজন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ