এক
এই অসময় ট্রেনে এত ভিড় কেন? ট্রেনের নাম নিউ দিল্লি সোগারিয়া এক্সপ্রেস। সোগারিয়া কোথায়? রাজস্থানে। কোটা জেলায়। আজ রবিবার। নবরাত্রি শেষ হয়ে গিয়েছে আগেই। দীপাবলির দেরি আছে। সুতরাং এমনও নয় যে কোনও ধর্মীয় পরব চলছে। কিংবা তিথি নক্ষত্রে বিশেষ কোনও পবিত্র দিন, তাও নয়। তাহলে এই ভিড়? স্লিপার ক্লাসের সহযাত্রী ভগবান তিওয়ারি হাসলেন। বললেন, এই ভিড়ের বেশিটাই বাঙ্গালের মানুষ দেখছেন তো! কেন জানেন?
বললাম, বুঝতে পারছি না।
তিওয়ারি বললেন, কাল কী ছিল?
সামান্য কয়েক সেকেন্ড ভেবে বললাম, হ্যাঁ, লক্ষ্মীপুজো ছিল। তার সঙ্গে এই ভিড়ের সম্পর্ক কী?
উত্তরপ্রদেশের হাতরাসের বাসিন্দা ভগবান তিওয়ারি কাছে সরে এসে ফিসফিস করে বললেন, পুজোর দিন তো লক্সী মাঈয়া ব্রজধামে আসেন।
বললাম, আসেন মানে কী? ঈশ্বর তো সর্বত্রই আছেন। ব্রজধামেও আছেন। যাওয়া আসা থাকে নাকি?
ভগবান তিওয়ারি বিরক্ত। বললেন, একথা জেনে রাখুন। লক্ষ্মীদেবীকে তো বছরের অন্য সময় নিধুবনে ঢুকতে দেওয়া হয় না। বারণ আছে। বিশাখা অথবা ললিতা পাহারায় থাকে। এই একটি দিন তিনি গোপীদের শরীরেই প্রবেশ করেন। তাই নিধুবনে যে লীলা হবে এখন, সেই লীলায় ব্রজভূমের মাটিতে ধুলোয় মিশে যাবে লক্ষ্মীদেবীর পায়ের রেণু। তাই আজই যদি ব্রজরজরেণু সংগ্রহ করা যায়, তাহলে আজীবনের পুণ্য। কারণ আজ নিধুবনের ধুলোয় মিশে থাকবে লক্ষ্মীদেবীর পদরেণু। আপনি যাচ্ছেন তো। নিজেই দেখবেন আজকের পরিস্থিতি।
ভগবান তিওয়ারি আগেই শুনেছেন আমিও চলেছি বৃন্দাবন। তিনিও। তার মানে তো মথুরা স্টেশনে এই ট্রেন ফাঁকা হয়ে যাবে? ভগবান বললেন, নাও হতে পারে। যাদের ব্রজদর্শন হয়ে গিয়েছে, তারা আবার ফিরবে। হয়তো এই ট্রেনে অন্য কোথাও যাবে।
মথুরা স্টেশন আসছে সেই আগাম সংকেত কীভাবে পাওয়া যাবে? যখন দেখা যাবে ভূতেশ্বর নামক একটি নির্জন স্টেশন পেরিয়ে যাচ্ছে ট্রেন। ঝকঝকে কংক্রিটের বেঞ্চ। কেউ বসে নেই। কিছু রাধাচূড়া গাছ আর সিমেন্টের বেদি। প্রায় জনহীন। যেন এই পৃথিবীতে একটি জিনিসই অসীম, তার নাম সময়। আর দুনিয়ায় ব্যস্ততা নামক কোনও শব্দ নেই। যদিও এই ভূতেশ্বরই হয়ে ওঠে মাঝেমধ্যেই কলরব মুখর। কারণ এখানে আছে বেশ কিছু মন্দির। ঠিক পরের স্টেশনে ততোধিক শোরগোল আর কলরব। হাঁকডাক শুরু হয়ে যায় মথুরা স্টেশনে বৃন্দাবনে যাওয়ার জন্য। আর অবিরত শোনা যায় রাধে রাধে সম্বোধন।
অটো চালক পথচারীর গায়ের উপর উঠে যাচ্ছে। মুখে বলছে, রাধে রাধে। মথুরা থেকে বৃন্দাবনে অটো ভাড়া জন প্রতি ৪০ টাকা। দর কষাকষি আর রাগারাগিতেও মুখে উঠে আসছে রাধে রাধে। অর্থাৎ রাগ দুঃখ ক্ষোভ বিরক্তি সবই রাধারানির ইচ্ছা। বৃন্দাবনে রাধে রাধে ধ্বনি শুনে অভ্যস্ত কান। কিন্তু এই কৃষ্ণ জন্মভূমির মাটি মথুরাও রাধারানি জয় করে ফেলেছেন সেই প্রভাব স্পষ্ট। ভগবান তিওয়ারি আগে যাবেন জন্মভূমিতে। আজ এখানে থেকে কাল যাবেন বৃন্দাবন।
ও হ্যাঁ। ভগবান তিওয়ারি মথুরা স্টেশনের জনারণ্যে মিশে যাওয়ার আগে দ্রুত আবার কাছে এলেন। বললেন, চুরাশি ক্রোশের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছেন। মনে রাখবেন, এই মাটি থেকে ফেরার সময় যেন একটু হলেও অন্যরকম মানুষ হয়ে ফেরেন। ব্রজধূলি কপালে ঠেকাবেন। আর নিধুবনে গেলে ধুলো বেঁধে নেবেন রুমালে। দেখুন না কাজ হয় কি না! তবে নিধুবন শুধু নয়। যাবেন সেবাকুঞ্জ, বংশীবট, রাধাকুণ্ড, শ্যামকুণ্ড। আর অবশ্যই অক্রুর ঘাট। অবশ্য আপনি তো বলছিলেন আগেও অনেকবার এসেছেন। দিল্লি থেকে মাত্র এইটুকু পথ। দিল্লির লোক তো হামেশাই চলে আসে। জানি। এসব জায়গায় যাওয়া হয়ে গিয়েছে। তবু কেন বললাম জানেন? বৃন্দাবনধামে যখনই আসবেন ভেবে নেবেন এই প্রথমবার এলাম। কিছুই জানি না। কিছুই দেখিনি। শুধু ব্রজধাম নয়। যে কোনও তীর্থেই এই মনোভাব মাথায় রাখবেন। আমি ২১ বার বৃন্দাবন মথুরা এসেছি, সবই আমার জানা দেখা, এরকম ভাবা মানে অহংকারী মন। সব জানি, সব দেখেছি, এই ভাবকে দূর করে, কিছুই জানি না, কিছুই দেখিনি এই চিন্তা ঢুকিয়ে নেবেন মনে। ভগবান তিওয়ারি যাওয়ার আগে হাত ধরে বললেন, আপনি ভাবছেন, আপনাকে পেয়ে খুব বাণী দিচ্ছি। তা নয়। আমাকেও তো গুরু মহারাজা এসবই বলেছেন। আর বলে দিয়েছেন তুমি হবে পোস্টম্যান। যা যা ভালো কথা শুনে তোমার মনে হবে জীবনে চলার পথে কাজে আসছে, সেগুলোই সুযোগ পেলে কাউকে বলে দেবে। যাকে বলবে, সে সেই কথাগুলো কীভাবে গ্রহণ করবে, সেসব ভেবো না। ওটা তার আধারের যোগ্যতা। তোমার কাজ জানিয়ে দেওয়া।
ভগবান তিওয়ারি চলে গেলেন। দিল্লি থেকে ১ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট দূরত্বের মথুরা যাত্রাপথে মহিলাদের দলটি গাইছিলেন কৃষ্ণভজন।
হরিসুন্দর নন্দ মুকুন্দহরি
নারায়ণ হরি ওম হরি কেশবহরি।
তাঁরা এসে এবার স্টেশনের বাইরে উঠলেন ভাড়া করা বিক্রম গাড়িতে। এদিকে একটাই জায়গা আছে। এক মহিলা হাতছানি দিয়ে ডেকে বললেন, আরে উঠ যাও! এরপর আর জায়গা পাবে না। ওদিকে তো বাঁকেবিহারী বন্ধ হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি কর। বিকেলে আবার মন্দিরের দরজা খুলতে খুলতে সাড়ে চারটে পাঁচটা। এখন গেলে তাও দর্শন পাবে। নয়তো সারাদিন বসে থাকা। উঠে এস। ভারতের আধুনিক নগর সভ্যতার বাইরে যে এক গোপন ভারত লুকিয়ে থাকে, সেখানে সকলকে নিয়ে সকলকে ডেকে সকলকে সঙ্গী ভেবে একটি পথ চলার প্রাচীন ঐতিহ্য আছে। ধর্মস্থানগুলিই হোক অথবা ট্রেনের জেনারেল কামরায়, দেখা যাবে এই অলৌকিক দৃশ্যগুলি। হাতে হাত ধরে চলার প্রণোদনা।
বিহারের গয়া জেলার চান্না গ্রাম থেকে আসা ৮ জনের মহিলা দলের প্রধান যিনি তিনিও এক মহিলা। আপনাদের সঙ্গে কোনও পুরুষ নেই? একা একা ঘুরছেন? কল্পনা ভাদোরিয়া হেসে বললেন, তাদের লাগবে কেন? তারা দিওয়ালি আর ছটে ফিরবে। বেশিরভাগ বাইরে বাইরে কাজ করে। দিওয়ালি আর ছটপুজোয় আসে। তাই আসার আগে আমরা নিজেরই ঘুরে নিই। প্রতি বছর তো হয় না। অত টাকা আর সময় নেই। এই দু’বছর অন্তর চেষ্টা করি। বাবা বিশ্বনাথ আর বিন্ধ্যাচল দর্শন করে এলাম এখানে। ওই যে আমাদের সীতাদিদি। সীতাদিদি সব জায়গার আশ্রম চেনা। তাই সীতাদিদির সঙ্গে আসি আমরা। তুমি কোথায় উঠবে? জানতে চান কল্পনা। বললাম, জানি না। হয়তো ফিরে যাব রাতে। দিল্লি থাকি। তাই এখানে থাকার দরকার হবে না। একদিনে দেখা হয়ে যাবে।
সীতাদিদি ততক্ষণে চিৎকার করে বিক্রম চালককে বলছেন, ভাইয়া এ কোন রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছ? ভাঙাচোরা। কোমর ভেঙে গেল তো! এত বড় ভালো রাস্তা আছে। সেই রাস্তায় সোজা চল।
বিক্রম চালক বলল, আরে বহেনজি পাগলা বাবার আশ্রমে কী উৎসব আছে। তাই এই বড় রাস্তায় বাস, গাড়ি চলতে দিচ্ছে। অটো আর ই-রিকশ বন্ধ। আমাদের ঘুরে ঘুরে যেতে হচ্ছে। ঠিক নিয়ে যাব আস্তে আস্তে।
সীতাদিদি গজগজ করছেন। বললেন, তুই তো নিয়ে যাব বলছিস! এদিকে আমাদের তো পিঠ কোমর গেল রে! তোর মতো আমাদের জোয়ান বয়স নাকি!
একথা বলেই সীতাদিদি আমার দিকে ফিরলেন। চোখ বড় বড়। সেই যাকে সাহিত্যের ভাষায় বলে রোষ কষায়িত নয়নে তাকানো। বললেন, দিল্লি থাক তো কী হয়েছে? রাতেই যদি ব্রজধামে না থাক তাহলে তো পুণ্যলীলা দেখাই হল না। ও তার মানে ওনার এক কান আমার দিকেও ছিল?
বললাম, পূণ্যলীলা দেখা যায় নাকি? কোন লীলার কথা বলছেন? নিধুবন তো?
সীতাদিদি বললেন, নিধুবন তো আছেই। সর্বত্র রাধারানি বিরাজমান। কানহাইয়াকে পাগল করতে পারে যে, তার শক্তি কতটা? রাধাকুণ্ডে যেও বিকেলে। যমুনাজির তীরে বসে দেখবে কেমন সুন্দর পুজো হবে। রাধারানির চোখের জলে তৈরি মান সরোবরের সামনে প্রণাম করবে না? এসব কি অফিসের কাজের মতো হয় নাকি? এলাম, কাজ করলাম। চলে গেলাম। আমার তো পয়সা থাকলে এক মাস, দু’মাস থাকতাম। বারসানায় থাকতাম হোলিতে।
হেসে বললাম, দেখা যাক। সীতাদিদি বললেন, থাকবে কোথায়। বললাম, তাও জানি না। থাকার কোনও প্ল্যান তো নেই। চলে যাওয়ারই ইচ্ছা ছিল। তাই কিছু ঠিক করিনি। সীতাদিদি বললেন, গোকুল আশ্রমে চলে যেও। কোথাও যাওয়ার না থাকলে।
কল্পনা বললেন, সীতাদিদি সেই গল্পটা বল না।
জিজ্ঞাসূ দৃষ্টিতে সীতাদিদি তাকিয়ে। কল্পনা বললেন, সেই যে মান সরোবরের।
সীতাদিদি বললেন, আরে কতবার শুনবি!
কল্পনা বলে, আমার ওটা শুনতে ভালো লাগে। ততক্ষণে বাকি মহিলারা গুনগুন করে গান ধরেছে। কোনও একটা ভজন হয়তো। তবে শব্দগুলো বোঝা যাচ্ছে না। তারাও এবার গান থামিয়ে সীতাদিদির দিকে। প্রবল ধুলোয় ভরে গিয়েছে বিক্রমের অভ্যন্তর। প্রধান রাস্তা ছেড়ে পাড়ার রাস্তা ধরেছে বিক্রম অটো। নাকেমুখে ধুলো ঢুকছে। সকলেই মুখে আঁচল চাপা দিয়েছে। এদিকে হাসছেও জোর। অথচ এরকম সময়ে বিরক্ত হওয়ার কথা। একদিকে রাস্তা অমসৃণ। হেলতে দুলতে চলেছে। অটো। পাগলা বাবার মন্দিরে আজ ভিড় বলেই রাস্তা বন্ধ? নাকি বিক্রম চালক অজুহাত দেখিয়ে এসব রাস্তায় নিয়ে এল?
অবশ্য ওর লাভ কী? গয়া জেলার চান্না গ্রামের মহিলাদের কোনও বিরক্তি নেই। মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসছে। যেন চোখেমুখে ধুলো ঢুকছে, প্রবল ঝাঁকুনি, এসবই খুব মজার ব্যাপার। আসল ব্যাপার হয়তো অন্য। সারাবছর জমির কাজ। স্বামীরা বাইরে বাইরে থাকে। একা একা সংসার সামলানো। আর তারই মধ্যে পুত্রকন্যারা যে কথা শোনে খুব, এমনও নয়। বাবা বাইরে থাকলে মায়ের অবাধ্য হওয়া সহজ। সেই অন্তহীন এক গন্তব্যহীন রুটিন জীবন থেকে মুক্তি এই কয়েকটা দিন।
গ্রামীণ ভারতের নারীদের তাই সর্বত্র দেখা যায় ধর্মস্থানে বেড়াতে আসা মানে তাদের মুখে আলো লেগে থাকে। প্রবল ভিড়। ধাক্কাধাক্কি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। তাদের চোখের সামনে থেকে ভিআইপি পাস কিংবা বেশি টাকার দর্শন টিকিট কেটে শহুরে বাবু বিবির দল অনায়াসে অল্প সময়ের মধ্যে ঢুকে যায় দর্শন করতে। আর এই আসল ভারত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে। এ তাদের কাছে এক মুক্তির আস্বাদ। সংসারের চাপ থেকে মুক্তি। কয়েকজন নারী মিলে বেরিয়ে পড়েছেন কল্পনারা। তাই সেই পথে ধুলো, ঝাঁকুনি এসবই তো বাইরের জগতের এক স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িত। তাই হয়তো তাঁদের কোনও বিরক্তি দেখা যাচ্ছে না।
একটু ধাতস্থ হয়ে সীতাদিদি বললেন, নিধুবনে রাতে যখন রাধাকৃষ্ণ আর গোপীদের পুণ্য লীলা হয়, তখন তো কেউ দেখতে পারে না! কেউ মানে এমনকী দেবতারাও নয়। একবার তো মহাদেব চেষ্টা করলেন দেখতে। কিন্তু তাঁরও অনুমতি নেই। যমুনা তীরে এসে মহাদেব দুঃখিত হয়ে বসে আছেন। যুমনাজিই দেবাদিদেবকে পরামর্শ দিলেন। বললেন, একটা উপায় আছে। আপনি নিজেই গোপিনী সেজে নিধুবনের সামনে চলে যান। আপনাকে দেখে নিশ্চয়ই কৃষ্ণের গোপিনী মনে হবে। আর আপনি শুধুই যে সেই লীলা দেখবেন তাই নয়। আপনিও অংশ হবেন। পছন্দ হল কথাটা শিবের।
তাই করলেন। অর্থাৎ গোপিনী সাজলেন। আর তৎক্ষণাৎ শ্রীকৃষ্ণ খবর পেয়ে গেলেন যে এক নতুন গোপিনীর আগমন ঘটেছে ব্রজধামে। তিনি মহাখুশি। তৎক্ষণাৎ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চললেন। আর একথা শুনে রাধারানির মহা দুঃখ। এভাবে কৃষ্ণ চলে যাচ্ছে এক অচেনা গোপিনীর সঙ্গে দেখা করতে? রাধারানির কান্নায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছে চরাচর। আর তাঁর সেই চোখের জলে তৈরি হল মান সরোবর।
কল্পনার চোখ জ্বল জ্বল করছে। জিজ্ঞাসা করলাম, এই গল্পটাই এত পছন্দ কেন? কল্পনা হেসে বললেন, ওই যে মহাদেব ইচ্ছামতো গোপিনী হয়ে গেলেন। আর পেয়ে গেলেন যা চাইছিলেন। আমার ওই পালটে যাওয়াটা ভাবতে ভালো লাগে। কেমন জটাজূটধারী মহাদেব আস্তে আস্তে নারী হয়ে যাচ্ছেন।
বললাম, আপনি নিশ্চয়ই এরকম রূপান্তর টিভিতে দেখেছেন। তাই সেটা দেখে ভাবছেন।
কল্পনা বলেন, আমাদের টিভি নেই। ডিশ লাগাতে হবে। অনেক টাকা। মেয়ের মোবাইল আছে। সেখানে মাঝেমধ্যেই মহাদেবের নাটক দেখি।
নাটক? তার মানে বোধহয় সিরিয়াল। মান সরোবর কিংবা রাধাকুণ্ড, শ্যামকুণ্ড, গোবর্ধন, অক্রুর ঘাট সবকিছু নিয়েই কত রকম কাহিনি, প্রাচীন প্রচলিত আখ্যান রয়েছে। কিছু আখ্যান কোনও কোনও গ্রন্থে পাওয়া যায়। কিছু কিছু আবার পল্লবিত হয়ে বেড়ে চলে নানাবিধ উপকাহিনির স্রোতে। সীতাদিদির গল্প তাঁর গ্রামের মানুষের কাছে মাহাত্ম্য নিয়ে পৌঁছেছে। সেই কারণেই তো কল্পনা বললেন, আমি ওই মান সরোবর দেখতেই এসেছি। কেন জানো? চোখের জলের জলাশয় কেমন হয়? তার রং কী? যখন হাতে পড়ে তখন তো গরম থাকে চোখের জল। মান সরোবরের জল কি গরম? নাকি ঠান্ডা? কল্পনার কথা শুনে তার সঙ্গিনীরা হেসে ওঠেন উচ্চস্বরে। বলেন, পাগলের মতো কথা। বাঁকেবিহারী দর্শন ছেড়ে বলছে নাকি চোখের জলের পুকুর দেখতে এসেছে। আবার সকলে হেসে উঠল।
বিক্রম চালকের নাম রাধেশ্যাম। সেও হাসছে। বিক্রম চালক, অটো চালক, দোকানমালিক, কলেজ ছাত্র, সরকারি চাকুরে, উকিল যেই হোক। মথুরা বৃন্দাবনে ঘরে ঘরে নাম পাওয়া যায় এরকমই। রাধেশ্যাম, শ্যামবিহারী, কানহাইয়া। এটা সব তীর্থের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বারাণসীতে গেলে যেমন চলতে ফিরতে শোনা যায় ভোলানাথ, বিশ্বনাথ, কাশীনাথ, মহাদেব কুমার, শিবশম্ভু ইত্যাদি নামের সমুদ্র। যে তীর্থে যে দেবতার অধিষ্ঠান, সেই জনপদে তাঁর নামেই সন্তানদের নাম দেওয়ার রীতি।
বৃন্দাবন এসে গিয়েছে। কিছুটা ভাঙা রাস্তার পর আবার হাইওয়েতে বিক্রম নিয়ে উঠেছিল রাধেশ্যাম। একটি বড় ক্রসিং-এ দাঁড়াল সে। বাঁদিকে যে রাস্তা সোজা যাচ্ছে, ওটাই বাঁকে বিহারী মন্দির যাওয়ার পথ।
চান্না গ্রামের সীতাদিদি আর কল্পনা ভাদোরিয়ারা চলে গেলেন আর একটা ই-রিকশ নিয়ে। বাঁকে বিহারী দর্শন করবেন তাঁরা।
যাওয়ার আগে সীতাদিদি চিৎকার করে বললেন, জায়গা না পেলে চলে আসবে আশ্রমে। মনে আছে? নাম বলো তো?
হেসে বললাম, গোকুল আশ্রম!
পাল্টা হেসে চলে গেলেন একঝাঁক ভারতের সনাতন বিশ্বাস আর ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে ঘরসংসার স্বামীপুত্র সামলানো দশভুজার দল!
সীতাদিদি ব্রজধামে পা রাখার উত্তেজনায় ভুলে গেলেন এটা জানাতে যে গোকুল আশ্রম কোথায়? হয়তো অসংখ্য গোকুল আশ্রম আছে। নাকি দরকার মনে করেননি? তিনি জানেন, এই ভূমিতে তো কোনও যুক্তি, হিসেব নিকেশ, পরিকল্পনা আর ঠিকানার দরকার হবে না। মন থেকে চাইলেই পৌঁছে যাওয়া যাবে গন্তব্যে। শুধু ডাকতে হবে। তিনজন আছেন বৃন্দাবন আর জগতের পথ চেনাতে। তাঁরা তিন মূর্তি এই বিশ্বজগতের পথপ্রদর্শক। বৃন্দাবন ওই তিন শক্তির ধাম। গোবিন্দ, গোপীনাথ এবং মদনমোহন! এই তিন রূপের প্রকাশের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছিল বৃন্দাবন ধাম!
দুই
প্রথমেই বলে দিচ্ছি রুম নেই। তবে বাঙালি যখন, স্নান করা, জিনিস রাখার জন্য একটা ঘর খুলে দিচ্ছি। অবশ্য দেখতে পাচ্ছি তোমার জিনিস বলতে তো ওই কাঁধের ব্যাগটাই। ও লকারে রেখে দেব। বললেন, ভবস্বরূপ গৌতম। জায়গাটা কিশোরপুরা। গৌতমপাড়া। বাঁকেবিহারী মন্দিরের পিছনেই। সামনের রাস্তাটা ধরে এগিয়ে গেলে নিধুবন। অতএব রাস্তা ভিড়ে ঠাসা। ধর্মশালা নাকি?
ভব স্বরূপ গৌতম বললেন, একসময় ছিল। আজকাল আর ধর্মশালা বলি না। জিনিসপত্রের দাম এত বেশি হয়েছে, যে ধর্মশালার যে রেট দেওয়া উচিত, সেটা দেওয়া যায় না। তাই হোটেলও নয়, ধর্মশালাও নয়। বলতে পারেন একটা আস্তানা। পুজো টুজো দেওয়ার ব্যবস্থা, বৃন্দাবন ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য লোক দেওয়া এসব করে দিই। এই বাড়ির সামনের দেওয়ালে আছে একটি সাদা নেমপ্লেট। ঘাড় একটু উঁচু করে দেখতে হবে সেখানে বাংলায় বড় বড় করে লেখা— শ্রীধামবৃন্দাবনের তীর্থ পুরোহিত।
স্বর্গীয় রামচন্দ্র ব্রজবাসী। তস্য পুত্র হরিমাস্টার ব্রজবাসী। তস্য পৌত্র, শ্যামকুন্দর ব্রজবাসী।
আপনার নাম তো লেখা দেখলাম না? প্রশ্ন করলাম।
ভব স্বরূপ বললেন, আমি পুজোপাঠের কাজে ঢুকিনি। যাঁর নাম দেখলেন তিনি আমার পিতা। অন্য ভাইয়েরা, ভাইপোরা আছে এই কাজে। আমার ভালো লাগেনি। রেলে চাকরি পেয়ে গেলাম। চলে গেলাম। অন্তত একশো দেড়শো বছরের পুরনো বাড়ির জীর্ণ দশা। প্রবেশদ্বারে ব্যানারে লেখা গৌতম নিবাস। কিশোরপুরা।
আপনি এরকম বাংলা বলছেন?
ভব স্বরূপ বললেন, আমি তো বাঙালি।
আপনার পদবি তো...
হ্যাঁ। আমরা ছিলাম গাঙ্গুলি। এখানে আসার পর আমার বাপ পিতামহ হয়ে গিয়েছিলেন ব্রজবাসী। তারপর আবার নামের সঙ্গে গৌতম। গৌতম আসলে গোত্র। এই পাড়ার নামই তো গৌতম পাড়া।
বেশিরভাগ মানুষই গৌতম ঋষির গোত্র। ভব স্বরূপ বললেন, আপনাকে দেখেই বলে দিলাম যে, রুম নেই। কিছু মনে করবেন না। আমি স্পষ্ট কথায় বিশ্বাসী। স্নান করুন, জিনিস রাখুন। সামান্য দক্ষিণা দিয়ে দেবেন। রুম থাকলে দিয়ে দিতাম। আজ ভিড় অনেক। আরও হবে। নিধুবন, সেবাকুঞ্জ, বংশীবট আর বাঁকেবিহারীতে পা রাখার জায়গা পাবেন না। ৮৩ বছরের ভব স্বরূপ প্রবেশদ্বারে সারাক্ষণ সকাল থেকে বসে থাকেন একটা চেয়ার নিয়ে। সামনের রাস্তা দিয়ে ভক্ত আর পুণ্যার্থীরা হেঁটে গেলে তাঁদের ডেকে ডেকে জানতে চান পুজো, রুম ইত্যাদি নিয়ে। তবে আজ আর তা করার দরকার নেই। কারণ ঘরই নেই।
বললেন, আমি পুরোহিত বংশের ছেলে হয়েও বলছি, একটা কথা মনে রাখবেন। সাবধানে চলাফেরা করুন। বৃন্দাবনে চারজনকে নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। অবশ্য শুধুই বৃন্দাবন কেন। যে কোনও ধর্মক্ষেত্রেই এই মন্ত্র নিয়েই চলা উচিত। চারজন থেকে সাবধান। পান্ডা, পূজারি, বাঁদর আর ভিখারি। মনে রাখবেন। এরা যে কোনও সময় আপনাকে লুট করবে। সব পুরোহিত সব পান্ডাই এরকম তা নয়। কিন্তু বেশিরভাগ তাই। সুতরাং পুজো দেবেন নিজের সাধ্য অনুযায়ী। ভিক্ষা দেবেন বুঝেশুনে। আর বাঁদর থেকে সর্বদা সাবধান। খিদের মুখের খাবার কিংবা চশমা যে কোনও কিছুই ছিনিয়ে নেবে চোখের নিমেষে। ইয়ে চার খতরো সে সাওধান রহিয়ে হামেশা।
গৌতম আবাসে স্নান করে বেরিয়ে দেখলাম বাঁকেবিহারী দর্শন করা সম্ভব নয় এখন। বিকেলেই করা যাবে। তার আগে নিধুবন কাছেই আছে। আর অন্য কিছু প্রাচীন মাহাত্ম্যপূর্ণ মন্দিরও দেখার ইচ্ছা আছে। আগে যেসব দেখা হয়নি। নিধুবন সম্পর্কে যেসব কথা শোনা যায় সেগুলো সত্যি? জানতে চাইলাম ভবস্বরূপ গৌতমের কাছে। এখানেই জন্ম। অর্থাৎ ৮৩ বছর ধরে আছেন। তাও আবার নিধুবনের পাশের পাড়ায়। ভবস্বরূপ বললেন, সত্যি হতেও পারে। আবার বেশিটাই বানানো গল্প হতে পারে। সত্যি নয়, একথা জোর দিয়ে বলব কেমন করে? এটা তো ঠিকই যে বছরের কোনও কোনও সময় শোনা যায়, কেউ কেউ নাকি শুনেওছে ঘুঙুরের শব্দ। সকালে পাওয়া গিয়েছে লাল গোলাপি হলুদ রঙের উড়নি। কেউ কেউ বলে ওসব তো বাঁদর এনে ফেলেছে। কিন্তু বাঁদর তো আশ্চর্য কারণে মানুষের মতোই সন্ধ্যার পর আর নিধুবনে থাকে না। এদিকে নিধুবনের দরজা খোলা হয় ভোরে। পুজো হয়। তাহলে কারা ফেলবে? তাই একটা রহস্য যে নেই এটা বলব না।
আবার কী জানেন? বললেন, ভবস্বরূপ। বৃন্দাবনে যেমন পা রাখলেই পুণ্য হয়, তেমনই আবার সম্পূর্ণ ব্যবসার জায়গা হয়ে গেছে। এই যে নিধুবন এর ঠিকা অর্থাৎ বার্ষিক কন্ট্রাক্ট কত জানেন? ৭ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা!
অবিশ্বাস্য! বললাম, এত টাকার লিজ? এত টাকা আয় হয় নাকি?
ভবস্বরূপ বললেন, আপনাকে তো কেউই সঠিক অঙ্ক বলবে না। আমরা জানি যে কত কোটি কোটি টাকা আয় হয় এখান থেকে।
বৃন্দাবনের মতো ধর্মস্থানে মানুষের আগমন হবে, দক্ষিণা দেবে। আয় তো হবেই। সব তীর্থেই হয়। এটা তো স্বাভাবিক। তবে শুধুই নিধুবনের লিজ এত বেশি! এটা ঠিক বিশ্বাস হয় না যেন!
ভবস্বরূপ বললেন, আর এসবের কারণই হল ওই রহস্য! এই যে ধরুন তুলসী বন ছিল নিধুবনে। এখন যে গাছগুলো আছে সেগুলি যে সব তুলসী গাছ তা নয়। কিন্তু দেখতে তুলসীর মতো। তাহলে সেই অন্য গাছগুলো কী গাছ? অন্য কোথাও দেখা যায় না কেন? তবে আমার যেটা খারাপ লাগে তা হল, বাঙালি আর বাংলার সঙ্গে সম্পর্ক যেন ক্ষীণ হয়ে গেল বৃন্দাবনের। অথচ বৃন্দাবনকে কে চিনিয়েছেন? কে আবিষ্কার করেছেন? মহাপ্রভু এখানে এসে বৃন্দাবনের আবার হৃতগৌরবকে প্রকট করেছেন। তিনি একাই এই কৃতিত্বের দাবিদার। নিজের অনুগামী ছয় গোস্বামীকে পাঠিয়েছিলেন তিনিই। কিন্তু শ্রীচৈতন্য না থাকলে বৃন্দাবন হারানো গৌরবের সাধারণ শহর হিসেবেই থেকে যেত। এক ও একমাত্র তিনিই রক্ষা করলেন। পুনর্জন্ম দিলেন। আজ দেখুন। একথা এই উত্তর ভারতীয়রা স্বীকার করে? আমি নিজেই তো এঁদের বলি সেকথা। স্রেফ বাঁকেবিহারী নিয়ে ব্যবসা করে কিছু মানুষ। ভক্তদের আকুলতা, আবেগ আর নিবেদন নিয়ে ছেলেখেলা করা হয়। ভবস্বরূপ গৌতম উত্তেজিত। তারপর শান্ত হয়ে বললেন, আপনারই দেরি হয়ে যাবে। যান দুটোর পর আবার নিধুবন বন্ধ হয়ে যাবে।
বৃন্দাবন সম্বন্ধে চৈতন্য চরিতামৃতেই বিস্তারিত বলা হয়েছে। বৃন্দাবনকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন দু’জন। প্রথমজন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের প্রপৌত্র। মথুরার রাজা বজ্রনাভ। মুষলপর্বে যদুবংশ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর যখন কৃষ্ণ সাম্রাজ্যের আর কোনও স্মৃতি রইল না তখন বজ্রনাভ স্বপ্নাদেশ পেলেন। যেখানে তাঁকে নির্দিষ্ট করে বলা হল, বৃন্দাবনে যমুনাতীরে কোন কোন স্থানে কোন কোন মন্দির হওয়া দৈব নির্ধারিত। সেইমতোই মহারাজা বজ্রনাভ বৃন্দাবন জুড়ে বসিয়েছিলেন সেই মূর্তিগুলি। গিরিধারী, বংশীধারী কৃষ্ণমূর্তি আর বলরাম মূর্তি। যাঁদের বলা হয় আদিবিগ্রহ। প্রতিটি মূর্তির আদলে এবং আত্মায় স্থাপিত হয়েছিল কৃষ্ণের সর্বাঙ্গের রূপ। কিন্তু সেই বিগ্রহ কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। এবার আবির্ভূত হলেন ধরাধামে আর এক মহাপুরুষ। আর এক অবতার। বৃন্দাবনে এলেন শ্রীচৈতন্যদেব। কেঁদে কেঁদে তিনি কৃষ্ণকে খুঁজছেন। অক্রুর ঘাটে ধ্যান করলেন।
বৃন্দাবন তখন জঙ্গল আর পাহাড়ে পূর্ণ এক ভূমি। আর যমুনা নদী। রয়েছে কিছু সরোবর। কিন্তু মহাপ্রভুকে এখানে নবদ্বীপ আর নীলাচল থেকে টেনে এনেছে এক দৈবী চেতনা। কে এই মহাপ্রভু। রাধারানি আর শ্রীকৃষ্ণের সম্মিলিত তনু। কেন বেছে বেছে অক্রুর ঘাটে এসে ধ্যান করলেন তিনি? কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে অক্রুর ঘাটে নেমে স্নান করেছিলেন দ্বাপর যুগের দুই ভাই। কৃষ্ণ ও বলরাম। কেন তাঁরা এই পথেই অগ্রসর হয়েছিলেন? সেও যেন পূর্ব নির্ধারিত। একের পর এক হত্যাকারী পাঠিয়েও তো কোনও লাভ হয়নি কংসের। যাঁকে মেরে ফেলার জন্য তিনি পাঠিয়েছিলেন অঘাসুর, বকাসুর, প্রলম্বাসুর, বৎসাসুরদের, তারা সকলেই ব্যর্থ ও পরাজিত। এমনকী কালীয় কিছু করতে পারল না। সুতরাং গোকুলে যে সত্যিই একজন কেউ বড় হচ্ছে তাকে হত্যা করার জন্য সেকথা কংস ভালোই জানেন। উপায় কী?
নারদ মুনি একটি উপায় বাতলেছেন। বললেন, একটা ধনুর্ভঙ্গ প্রতিযোগিতার আয়োজন করুন। দেবাদিদেব মহাদেবের ধনু যে ভাঙবে তিনিই ঘোষিত হবেন সর্বশ্রেষ্ঠ বীর হিসেবে। আর সকল রাজা মহারাজা বীরশ্রেষ্ঠদের ডাকা হোক। সুতরাং সকলকেই যখন ডাকা হচ্ছে তখন এই সুযোগে কৃষ্ণ আর বলরামকেও আমন্ত্রণ করা হোক। তাঁদের কাকা অক্রুরকে বলা হল আপনিই নিয়ে আসবেন ভাগ্নেদের।
অক্রুর রাজি হলেন। তবে তিনি জানতেন যে কেন কংস এভাবে ধনুর্যজ্ঞ মহোৎসবের আয়োজন করেছেন। আর কেনই ডেকে নিচ্ছেন কৃষ্ণ ও বলরামকে। কিন্তু জ্ঞানী অক্রুরের নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল এবং তিনি মনেপ্রাণে কামনা করছেন যে, কৃষ্ণ ও বলরাম আসুন এবং কংসকে ধ্বংস করুন। কারণ কৃষ্ণ বলরামের অলৌকিক দৈবশক্তির কথা তিনিও জানেন।
দুই ভাইকে কংস ডেকেছেন। কিছু যদি অঘটন ঘটে। অতএব বৃন্দাবনে যেন কান্নার রোল পড়ে গেল। নন্দ আর যশোদার ঘরে তো রীতিমতো যেন শোকপালন চলছে। কৃষ্ণ বৃন্দাবন থেকে চলে যাওয়া মানে বৃন্দাবনের আলো নিভে যাওয়া। তাই আবার কবে ফিরবেন কে জানে! অতএব সেই শোকের মধ্যেই কাকা অক্রুর মথুরার দিকে দুই ভাইকে আনার সময় একবার ইচ্ছা করলেন যমুনায় নেমে স্নান করে নেবেন। সেই মতোই তিনি স্নান করতে নামলেন।
এদিকে অক্রুর দেখে গেলেন যে, দুই ভাই রথে বসে আছেন। আবার সেই তিনিই দেখতে পাচ্ছেন তাঁর পাশেই যেন দুই ভাই যমুনায় মহানন্দে স্নান করছেন। এটা কীভাবে সম্ভব? তিনি আবার চক্ষুকর্ণবিবাদভঞ্জন করতে রথের দিকে তাকালেন। দেখলেন আশ্চর্য কাণ্ড। ওই তো রথেই বসে আছেন সেই দুই ভাই। তাহলে কোনটা সত্য? কারা আসল কৃষ্ণ বলরাম? এসব ভেবে অক্রুরের মনে বিভ্রান্তি আসার পরিবর্তে বরং প্রশান্তি এল। তিনি তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারলেন যে, কারা তাঁর সঙ্গে এসেছেন। অর্থাৎ এদের কতটা দৈবশক্তি আছে। অতএব তিনি এবার নিশ্চিন্ত। কোনওরকম দ্বিধা অথবা আশঙ্কা নেই। অক্রুর মনে মনে এই দুই ভাইয়ের স্তব করেছিলেন। প্রণাম করেছিলেন। অনুভব করেছিলেন যে, দুষ্টের শাসন আর শিষ্টের পালন করার জন্য আগত এই মহাপ্রাণ দুই ভাই এসেছেন। আর পাপী কংস স্রেফ নিজের মৃত্যুকে নিজেই আমন্ত্রণ করে আনছেন। তাঁর সেই ধনু উৎসব নিজের মরণ উৎসবে পরিণত না হয়!
এই হল আখ্যান। আর বৃন্দাবনে আজও বিরাজমান সেই অক্রুর ঘাট। এহেন অক্রুর ঘাটে এসে চোখ বন্ধ করে ভক্তদের ধ্যান করার নির্দেশিকা রয়েছে শাস্ত্রে। অক্রুর ঘাটে স্নান করার পর থেকে দ্বাপরে শ্রীকৃষ্ণের দ্বিতীয় স্তরের সামাজিক লীলার অভ্যুত্থান ঘটেছিল। বৃন্দাবন থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল রাধারানি আর গোপিনীদের সঙ্গে লীলার মাধ্যমে, সেই যাত্রা অতঃপর এক মহকালপঞ্জিতে প্রবেশ করে। জন্ম দিয়েছিল মহাভারতের ভবিষ্যতের।
অক্রুর ঘাটে স্নান করার পর মথুরায় প্রবেশ করার আগে রাজবেশ পরার বাসনা হয় শ্রীকৃষ্ণের। দুই ভাই সামনেই দেখতে পেলেন একজন ধোপার বাড়ি। ধোপার নাম দুর্মুখ। সে ঠিক তখনই নানারকম রাজপরিধান নিয়ে যাচ্ছিল রাজবাড়ি। অর্থাৎ কংসের প্রাসাদে। তাঁর কাছে পোশাক চেয়ে প্রত্যাখাত হলেন কৃষ্ণ। ব্যস! আর বিলম্ব নয়। তাঁকে প্রহার করে প্রায় অর্ধমৃত করে কৃষ্ণ রাজবেশ হরণ করে পরে নিলেন। এই নিয়তি নির্ধারিত ঘটনা হওয়ারই ছিল।
কারণ এই দুর্মুখই সীতা ও রাবণকে কেন্দ্র করে প্রচার করেছিল সীতার সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য। রামচন্দ্র পরে সেকথা জানতে পেরে তাঁকে অভিশাপ দেন। শুধু এক জন্মের অভিশাপগ্রস্ত নয়। তারও আগে নারদের কৌপীন চুরি করে এই দুর্মুখ প্রথমে রামচন্দ্রের ধোপা হয়। এরপর আবার রামচন্দ্রের অভিশাপে কংসের রাজপ্রাসাদের ধোপা হয়েছে। সুতরাং দ্বাপরে নব অবতার কৃষ্ণের হাতে তাঁর জীবন সংবরণ নিয়তি নির্দিষ্টই ছিল।
মথুরায় প্রবেশ করার পর কাকা অক্রুরকে কৃষ্ণ বলেছিলেন, আপনি এবার চলে যান। কংসকে বলুন আমরা এসে গিয়েছি। আমরা বরং মথুরা পুরী একটু ভ্রমণ করি। কিন্তু ভ্রমণ নয়। কৃষ্ণের মনে ছিল অন্য এক ইচ্ছা। তিনি সেই স্থানে হাজির হলেন যেখানে সেই ধনু রাখা আছে। যে ধনুকে ভঙ্গ করতে হবে। কিন্তু সেই ক্ষণ তো আসেনি এখনও। আগামী কাল হবে সেই ধনুর্যজ্ঞ। তাহলে এখন কী?
সামনেই রাখা ধনুটি আরও কাছের থেকে দেখতে চাইছেন শ্রীকৃষ্ণ। এগিয়ে গিয়ে দেখলেন বহুরত্ন দিয়ে সাজানো সেই ধনু। কিন্তু তাঁকে স্পর্শ করতে দেওয়া হবে না। রক্ষীরা বলল, এখনই চলে যান এখান থেকে। শ্রীকৃষ্ণ বললেন, আমি আমন্ত্রিত। তোমাদের রাজাই আমাকে আহ্বান করেছেন। আমাকে চলে যেতে বলছ কেন? রক্ষীদের বক্তব্য, যখন ধনুর্যজ্ঞ হবে, তখন আপনি আসবেন। এখন কেন? আমাদের উপর নির্দেশ আছে, যাতে এখানে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া না হয়।
শ্রীকৃষ্ণ সব বাধা অগ্রাহ্য করে অগ্রসর হলেন বাম হাতে তুলে নিলেন অনায়াসে সেই ধনু। অসীম ওজনের ধনুতে জ্যা রোপণ করলেন আরও সহজে। টংকার দিতেই ধনু ভেঙে গেল। অবিশ্বাস্য! দুই ভাইয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল রক্ষীবাহিনী। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ আর বলরাম হলেন ত্রিভুবনের শক্তিশালী দুই আত্মা। সুতরাং নিমেষে সব রক্ষী ভূপতিত। তাঁরা এরপর নির্বিকার ভঙ্গিতে ফিরে এসে ঘুমিয়ে পড়লেন। কোথায় হয়েছিল এই ধনুর্যজ্ঞ? কোথায় হয়েছিল কংস বধ? একথা এখন আর মথুরা বৃন্দাবনে নিশ্চিত করে কেউ জানে না। তবে কেউ কেউ বলে ওই দ্বারকাধীশ মন্দির। যা মথুরা স্টেশন থেকে বেরিয়ে সোজা এগিয়ে গেলে ডানদিকে, সেটাই নাকি এই মাহাত্ম্যপূর্ণ স্থান ছিল।
সুতরাং এই তাবৎ লীলার প্রথম সূত্রপাত হিসেবে অক্রুর ঘাটকেই ধরা হয়। অতএব মহাপ্রভূ বেছে বেছে বৃন্দাবনে এসে বাৎসল্য ঘাটের কাছে অক্রুর মন্দিরকেই নিজের বাসস্থান হিসেবে পরিগণিত করলেন। সারাদিন সারারাত তাঁর হা কৃষ্ণ হা কৃষ্ণ ধ্বনির ক্রন্দন। তিনি কি শুধুই কৃষ্ণপ্রেমে উন্মত্ত হয়েই এসেছেন বৃন্দাবন? একেবারেই নয়। মহাপ্রভুর হাত ধরে রাধাকৃষ্ণের লীলাস্থলের যাতে আবার পুনরাবিষ্কার হয় এই ছিল তাঁর লক্ষ্য। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য এক সমাজ সংস্কারক ছিলেন। তাঁকে নিছক বৈষ্ণব ধর্ম প্রবক্তা, কৃষ্ণপ্রেমে আকুল এক ভক্তহৃদয় হিসেবে দেখা যাবে না। কারণ তিনি তো ভক্ত নয়। তিনি হলেন স্বয়ং অবতার। মহাপ্রভু রাধা কৃষ্ণের মিলিত তনু।
নিধুবনের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় হঠাৎ দেখা গেল ডানদিকে শ্রীচৈতন্য মঠ। প্রধান দরজা বন্ধ। তবে কিয়দংশ খোলা। কৃষ্ণদাস কবিরাজ চৈতন্যচরিতামৃতে বলেছেন, শ্রীকৃষ্ণ যখন দ্বারকায় ছিলেন, তখন স্ফটিকস্তম্ভে নিজের অপরূপ তনুর চিত্র দেখে ভাবছেন এই যে এরকম এক শরীর, এই তনু দেখে একমাত্র রাধারানি অনুভব করেন এক অলৌকিক অনুভব। দিব্যভাবের সঞ্চার হয় বলেন রাধারানি। কিন্তু কেমন সে ভাব? আমার রূপ দেখে রাধারানি ঠিক কী অনুভব করেন?
আমার রূপ কী চোখে দেখেন তিনি এটা একমাত্র রাধারানিই জানেন। এমনকী আমিও সেই মন আর হৃদয়ানুভূতির সন্ধান পাব না। পাই না। আমি সেবা গ্রহণ করি। কিন্তু রাধারানি জানেন সেবা প্রদান করার সুখ কী। সর্বত্রই এই নিবেদিতপ্রাণ সখী অথবা দেবতার প্রতি ভক্তের সমর্পণ আছে। সমর্পণ পেয়ে কেমন লাগে সেই অনুভব তো বোঝা যায়। কিন্তু যে নিজেকে সমর্পণ করছে, তার মনের ভাবটি কেমন হচ্ছে? কেন সে এভাবে সেবা করে সুখ পায়? অতএব এটাই জানতে হবে। তাই রাধারানির ভাব ও কান্তির সঙ্গে নিজের দেহতনুকে মিশ্রিত করে নব অবতারে ধরাধামে এলেন শ্রীকৃষ্ণ। তিনিই মহাপ্রভূ। না, ভুল বলা হল। মহাপ্রভু তো একা শ্রীকৃষ্ণ অবতার নন। শ্রীকৃষ্ণ এবং রাধারানি। এই দুইয়ের যোগফল। অর্থাৎ মহাপ্রভুর শরীরের অন্যতম আত্মা হয়ে শ্রীকৃষ্ণ উপলব্ধি করতে পারলেন রাধার মনের ভাব ঠিক কী ছিল! বৃন্দাবনের তাবৎ লীলাসহচরেরাই কিন্তু নবদ্বীপ ধামেও অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
রায় রামানন্দ এবং স্বরূপ দামোদর মহাপুরী। তাঁরা মহাপ্রভুর সঙ্গী কেন গম্ভীরায়? কারণ তাঁদের দু’জনের মধ্যেই অবতীর্ণ হয়েছিলেন রাধারানির দুই প্রিয় সখী। বিশাখা ও ললিতা, সেই বিশাখা ও ললিতা। যাঁরা ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ ও রাধারানির নিত্যলীলার প্রহরী। নিধুবনের দ্বাররক্ষক। তাঁদের অমান্য করে অথবা চোখ এড়িয়ে স্বয়ং লক্ষ্মীদেবী যেতে পারেননি নিধুবনের লীলা চাক্ষুষ করতে। নিধুবনে রহস্যময় লীলা দেখার বড় শখ ছিল লক্ষ্মীদেবীর। এলেন এক সন্ধ্যায়। বললেন, আমাকে নিধুবনে প্রবেশ করতে দাও। বিশাখা বললেন, তা হয় না। এখানে কারও প্রবেশাধিকার নেই। লক্ষ্মীদেবী বললেন, যে কেউ আর আমি সমান নয়। আমি নিজেই লক্ষ্মীদেবী।
বিশাখা হাসলেন। বললেন, ওই যে শব্দ শুনছেন, ওই হাস্য পরিহাস, ওই গানের ছন্দ। ওই যে রাধারানি আর গোপিনীদের মিলিত লাস্য। এসবই স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ আর রাধারানির সম্মিলিত লীলা। আর আপনি স্বর্গবাসী একজন লক্ষ্মী। আমাদের এই নিধুবনের প্রত্যেক গোপিনীই একজন করে লক্ষ্মী। অতএব আপনাকে আগে গোপিনী হতে হবে। তাঁদের অনুগত হতে হবে। সেজন্য তপস্যা প্রয়োজন। এত সহজে কি শ্রীকৃষ্ণের গোপিনী লীলার অংশ হওয়া যায়?
লক্ষ্মীদেবী যেখানে এক কঠোর তপস্যায় নিয়োজিত করলেন নিজেকে সেই জায়গাই হল ওই বংশীবট। পাশেই বেলবন। যেখানে সাধনায় বসেন স্বয়ং মা লক্ষ্মী। তারপর তিনিই হয়ে ওঠেন শ্রীকৃষ্ণ লীলার এক আত্মার অংশ। সুতরাং আজ বোঝা গেল কেন এই জনসমুদ্র বৃন্দাবনে! গতকাল ছিল পূর্ণিমা। লক্ষ্মীপুজো। আর আজ তাই নিধুবনের ব্রজরেণুর স্পর্শ পেতে ভক্তদের আকুল স্রোত! ওই তো দেখা যাচ্ছে প্রধান দ্বার নিধুবনের। প্রবেশ করলাম আমিও।
তিন
চোখ থেকে অবিশ্রান্ত জল পড়ছে সাধনা দাস, আল্পনা মণ্ডল আর চিত্রা বিশ্বাসের। মেদিনীপুরের পটাশপুরের ঠাকুরদা গ্রামের একটি দলের সঙ্গ নিয়ে এই তিন নারীও এসেছেন দেওঘর থেকে। তাঁদের বাড়ি তারকেশ্বর। সঙ্গে আছেন স্বামী ও ছেলেরা। বেরিয়েছিলেন পুজোর আগে। দেওঘরে পুজো দিয়ে এখানে এসেছেন। এরপর যাবেন হরিদ্বার। এই সেই নিধুবন! কাঁদছেন তাঁরা। বাঁদরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ওয়াকওয়ে। পুণ্যার্থী ও পর্যটকদের দুই দিকে এবং মাথার উপরে ওই বাঁশের বেড়া। যখন তখন সেই বেড়ার উপর ঝাঁপ দিয়ে পড়ছে বাঁদের দল। আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। তবে আজকের আতঙ্কের নাম ভিড়। সামান্যতম ঠেলাঠেলি হলে কী হবে সেটা ভাবতেই যেন এক আশঙ্কার স্রোত মেরুদণ্ড দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। চিৎকার করে একটি দল ওই ভিড়ের মধ্যেই জয়ধ্বনি দিচ্ছে, রাধে... রাধে...। সমস্বরে ভক্তদের একাংশ প্রতিধ্বনিত করছে রাধে রাধে। এই সেই নিধুবন। দু’জন নারীকে দেখা যাচ্ছে মুখে কাপড় বেঁধে ঝাড়ু দিচ্ছেন। অবিরত। যাতে একটিও পাতা পড়ে না থাকে। এই নিধুবন নিয়েই জগৎজুড়ে জল্পনা। রহস্য। আর কৌতূহল। এই যে চারদিকে একই দৈর্ঘ্যের, একই প্রস্থের একইরকম দেখতে গাছগুলি, এই বন একদা ছিল তুলসীবন। আজও তুলসী আছে। যাকে বলা হয় বনতুলসী। তবে দেখতে তুলসীর মতো অথচ তুলসী নয় এরকম গাছও অনেক।
নিধুবনের রহস্য কী? প্রতিদিন সন্ধ্যার পর এখানে আর সাধারণ মানুষ থাকতে পারবে না। দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। নিধুবনের মধ্যেই রয়েছে একাধিক মন্দির। তবে যা নিয়ে মূল আকর্ষণ ও আগ্রহ সেটি হল রংমহল। রংমহল নিধুবনের কাছেই। সন্ধ্যার পর শ্রীকৃষ্ণ এবং রাধারানির সঙ্গে গোপিনীর দল নিধুবনে উপস্থিত হন। প্রতিদিনই হয় অলৌকিক রাসলীলা। আর সেই লীলার সমাপ্তির পর রংমহল মন্দিরে প্রবেশ করেন শ্রীকৃষ্ণ। এখানেই তিনি নিদ্রা যান।
আর এই বিশ্বাস এতটাই তীব্র, প্রথা ও রীতিই হয়ে গিয়েছে যে, রংমহল মন্দিরে প্রতিদিন শয্যা সাজিয়ে রাখতে হয়। শয্যাপার্শ্বে থাকে জলের পাত্র। মাখন। নিমের দাঁতন। পরিধানের পোশাক। পান। রাধারানির জন্যও একই ব্যবস্থা। প্রতিদিনই সকালে এসে সেই রংমহল মন্দিরে প্রবেশ করার পর পুরোহিতদের কেন যে আজও মনে হয় কেউ সত্যিই ব্যবহার করেছেন এই সব উপকরণ! কারণ সাজানো উপাদানকে দেখা যায় অবিন্যস্ত হয়ে পড়ে আছে। কেউ যেন ব্যবহার করেছে। এটা কীভাবে হয়?
নিধুবন আর রংমহলকে ঘিরে বহু আশ্রম। বহু মন্দির। বহু বাড়ি। কখনও সখনও তাঁদের কাছে শোনা যায় যে, তাঁরা শুনেছেন ঘুঙুরের শব্দ।
যুক্তি আর বাস্তবসম্মতভাবে এটা কি হওয়া সম্ভব? নিত্যগিরিধারী মোহন্ত বললেন, একটা অবাস্তব আর অসত্যকে এতকাল ধরে কি বয়ে নিয়ে চলা সম্ভব? এত বড় একটা বাগান। কোনও পাখি রাতে থাকবে না? এরকম হয় নাকি? সারাদিন ধরে বাঁদরের উপদ্রবে আমরা টিকতে পারি না। ভক্তদের সতর্ক থাকতে হয়। অথচ সেই বাঁদরদের কোনওরকম অস্তিত্বই থাকে না রাত হলে। অথচ ওই নিধুবনই তো সবথেকে আদর্শ জায়গা বাঁদরদের রাত কাটানোর পক্ষে। নিরাপদ। অর্থাৎ পশুপাখি কেউই থাকে না। পশুপাখিদের তো কেউ বলে দেয়নি যে, এখানে একটা অলৌকিক ঘটনা ঘটে। তোমরা রাধাকৃষ্ণের জয়ধ্বনি কর।
নিধুবনের লাগোয়া পাড়ার বাসিন্দা একনাথ শর্মা একটি মিষ্টির দোকানের মালিক। বাঁকেবিহারী কিংবা রাধারমণ মন্দিরে পুজো দিতে যাওয়ার সময় তাঁর মিষ্টি সন্দেশ নিয়ে যায় ভক্তের দল। একনাথ বলছিলেন, কিছু কিছু ব্যাপার বেশ আশ্চর্য লেগেছে জানেন? অলৌকিক কি না জানা নেই। বৃন্দাবনে আপনি শুনবেন অন্তত তিনজনের কথা। যাদের একজন পাগলা বাবা। এক বিখ্যাত পাগলা বাবা সাধক আছেন। তিনি নন। আর একজন ছিলেন। সেই মানুষ প্রথম যখন সংসার ছেড়ে আধ্যাত্মিকতার পথে হাঁটেন, তখন স্থির করেছিলেন, প্রথমেই নিধুবন কিংবা সেবাকুঞ্জে রাধেশ্যামের লীলা প্রত্যক্ষ করবেন। সেই মানুষটি আসলে নিজেকে সন্ত হরিদাসের স্তরে নিয়ে যেতে চাইছিলেন।
বলতেনও নাকি যে, যদি সন্ত হরিদাস শ্রীগোবিন্দের দর্শন এখানেই পান, তাহলে আমি কেন পাব না? এই বলে তিনি গোপনে নিধুবনের দরজা ফাঁক করে দেখার চেষ্টা করেছিলেন। আর তারপর থেকেই তাঁর আর মাথা ঠিক হয়নি। মথুরা রোডের এক যুবকের কথা শোনা যায়, পুজো দিয়ে সে সন্ধ্যার পর বেরয়নি নিধুবন থেকে। কোথাও লুকিয়ে ছিল। যদিও তাকে বের করে দেওয়া হয়। কিন্তু তারপর আবার বেশি রাতে ফিরে আসে সে। ছেলেটির কৌতূহল সাংঘাতিক পর্যায়ে পৌঁছয়। দরজা বন্ধ। চারদিকে প্রাচীর। সুতরাং দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু তবু উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কী হল সেই ছেলের? সে কী দেখেছে অথবা আদৌ কিছু দেখেছে কি না এসব কথা বলার মতো অবস্থাই ছিল না। কারণ ঠিক কয়েকদিন পর জানা গেল তার গলা থেকে শব্দ বেরয় না। সে নাকি বোবা হয়ে গিয়েছে।
কিন্তু এই যে কথাগুলো প্রচলিত এদের কাউকে কেউ কি প্রত্যক্ষ করেছে? নাকি সবটাই গল্পকথা?
একনাথ বললেন, এখন দেখবেন কেউই এখানে আর বলবে না সত্যিই এরকম কেউ কিছু দেখেছে কি না। অথবা সত্যি. রাতে নাচের শব্দ শোনা যায় কি না। কেন জানেন? এমনও এখানে হয়েছে, যে হয়তো এই আখ্যানগুলো নিয়ে সাধারণ আড্ডায় হাসাহাসি করেছে কেউ, কিংবা এসব সত্য নয় বলে উড়িয়ে দিয়েছে, তাদের মধ্যে কয়েকজনের জীবনে এমন কিছু সর্বনাশ ঘটেছে, যে সকলেই ধরে নেয় এটা নিয়ে বিরূপ কথা বলাই সঙ্গত নয়। আমরাও কিন্তু স্বীকার করি যে, হয়তো অন্য কোনও কারণে তাদের ওইসব সমস্যা হয়েছিল। কিংবা কারও হয়তো দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এসব কথা দ্রুত লোকমুখে ছড়ায়।
আর মানুষ কিন্তু এরকম অলৌকিক কথা বিশ্বাস করতেই পছন্দ করে। একটা কথা বলি। এত বড় একটা তুলসীবন। কোনও জায়গা থেকে ঢোকার উপায় নেই। তাও মাঝেমধ্যেই শোনা যায় লাল হলুদ উড়নি পাওয়া গিয়েছে। বাঁদরও নিয়ে আসতে পারে মানছি! কিন্তু মানুষও তো বিশ্বাস করে যে কৃষ্ণ কানহাইয়ার লীলা বোঝা সত্যিই দুষ্কর। আমারই তো দিদির ছেলেকে অপারেশন না করলে পা বাদ যাবে বলেছিল ডাক্তার। সেই অপারেশনে সাড়ে ৬ লক্ষ টাকা লাগবে। আমাদের এত টাকা কোথায়? প্রাণপণে দিদি পড়ে রইল রাধাকুণ্ড আর শ্যামাকুণ্ডে। দিনের পর দিন। বিশ্বাস করবেন! অপারেশন দরকার হয়নি। এবার এটার মধ্যে কোনও অলৌকিক কিছু নাই থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের মধ্যে তো একটা ভক্তি আর বিশ্বাস রয়ে যাবেই। তাই না! আর কত মানুষ কত বিজ্ঞানী কত সমাজকর্মী কত যুক্তিবাদী বহু বছর ধরে আসছেন। অথচ দেখুন এই মিথ বন্ধ হচ্ছে না!
কেউ সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করছেন। কেউ দু’হাত তুলে কীর্তনের সঙ্গে নৃত্য করছেন। নিধুবনের মধ্যে থাকা মন্দিরে রাধেশ্যামের মন্দিরে সামনের চত্বরে ভিড়ে ঠাসা। আর এসবের পাশাপাশি চলছে কথকতা। রাধা ও শ্যামের কাহিনি বর্ণন। চিত্রা, সাধনা আর আল্পনাদের কষ্ট হয় না? এই যে প্রবল চাপে যে কোনও সময় পদপিষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা? অবাক বিস্ময়ে দেখা যাচ্ছে তাঁরা যেন নিজেদের সঁপে দিয়েছেন গিরিধারী নন্দলালা আর রাধারানির পাদপদ্মে। কোনও দেহবোধ নেই। চোখ ভেসে যাচ্ছে জলে। আর সেই জল হাত দিয়ে ধরে ধরে করতলে রাখছেন চিত্রা আর সাধনা।
নিজের চোখের জল নিজের করতলে রাখার কারণ কী? বৃন্দাবনে কোনওদিন যে আসতে পারব এ তো ভাবিনি। বললেন, চিত্রা। শ্রীগোবিন্দ যদি ডাক পাঠান, জর্নাদন যদি ইচ্ছা না করেন, এই আত্মা যদি রাধারানির থেকে সাড়া না পায়, তাহলে কেউ কি পারে ব্রজধামে আসতে? আমাদের সাত জন্মের ফল গোপীনাথ, শ্রীগোবিন্দ আর মদনমোহনকে দেখতে পেলাম। নিধুবন সেবাকুঞ্জ আর বংশীবটে ঘুরতে পারলাম।
নিধুবন একটি পরিক্রমা। প্রবেশপথ থেকে শুরু হবে। তারপর বনের মধ্যে থেকেই পরিক্রমা চলবে। একেবারে যখন শেষ হবে, সেই সময় সকলকেই দেখা যাচ্ছে উবু হয়ে বসে পড়তে। কী করছে তারা? আল্পনা, সাধনা, চিত্রাদের দেখা গেল কোনওমতে বেড়ার বাইরে হাত বাড়িয়ে তুলে নিলেন একমুঠো মাটি। নাকি ধুলো? অতীব যত্নের সঙ্গে থাকা এক সাদা কাপড়ে সেই ধুলো বেঁধে নিলেন তাঁরা। তারপর প্রণাম করলেন।
রাধারানি শ্রীগোবিন্দ আর গোপিনীদের পদতলের স্পর্শ পেয়েছে এই মাটি। এই ধুলো। আর কাল ছিল লক্ষ্মীপুজো। সুতরাং সকলের বিশ্বাস, এই ধুলোয় মিশেছে স্বয়ং শ্রীলক্ষ্মীদেবীরও পদস্পর্শ। যে লক্ষ্মীর পা আমরা ঘরের পুজোয় আলপনা দিয়ে আঁকি, ঘরে আহ্বান করি পা এঁকে তাঁকে। মন্ত্রোচ্চারণ করে বলি এসো মা লক্ষ্মী বোসো ঘরে..। আজ সেই লক্ষ্মীদেবীর পায়ের রেণু তুলে নিচ্ছেন ওই যে ভারতের গ্রামগঞ্জ শহর থেকে আসা লক্ষ্মীরা।
তারপর রাধেশ্যাম মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে আভূমি প্রণাম করার পর অশ্রুসিক্ত মুখে হাসি ছড়ায় চিত্রা আল্পনাদের। মন্দিরের দেওয়াল ঘেঁষে বসেন তাঁরা। করতলে রাখা চোখের জলে মিশিয়ে দেন কিছুটা করে নিধুবনের ধুলো আর মাটি। তারপর সেই মিশ্রণ তর্জনীতে তুলে কপালে আঁকলেন তিলক। এই হল আমাদের পুণ্যভূমির চন্দনফোঁটা বুঝলেন তো! চোখের জলে হাসি মিশেছে লক্ষ্মীমন্ত নারীদের!
চোখের জলে পবিত্র ধুলোর সৌভাগ্য মেশানোর এই অলৌকিক দৃশ্য দেখে বাঁকেবিহারীর মন্দির থেকে যেন আচমকা ভেসে আসে ঘণ্টাধ্বনি! বাতাসে উচ্চারিত জয়ধ্বনি—হাতি ঘোড়া পালকি, জয় কানহাইয়ালাল কী!
নিধুবনে ছায়া নামে হেমন্তের!
চার
দরজা অর্ধেক খোলা। ওই যে চৈতন্যমঠের ভক্তি সুধাসন্ত মহারাজ বসে আছেন। ঢুকে সামনে যেতেই ইশারা করে বললেন, দোতলায় আসুন। এখন আরতি হবে। তারপর মন্দির বন্ধ। তাই আগে আসুন দর্শন করে যান। শ্বেতপাথরের মেঝে। শ্বেতপাথরের বেদি। চৈতন্য মহাপ্রভুর চিরাচরিত সেই কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা মূর্তি নয়। যেন রাজবেশ। তবে কীর্তন ভঙ্গিটি বিদ্যমান। সুধাসন্ত মহারাজ ১৩ বছর ধরে আছেন এখানে। তারও আগে ছিলেন রাধাকুণ্ডে। তবে এবার অবশেষে ঘরে ফেরা। নবদ্বীপ চলে যাবেন। স্বরূপগঞ্জে। বহুদিন হয়ে গেল। সন্ত মহারাজ একটা প্রশ্ন করব?
৮৪ বছরের স্থিতপ্রজ্ঞ মানুষ। তাকালেন পূর্ণদৃষ্টিতে। বললেন, কী জানতে চান?
এই যে নিধুবনকে নিয়ে রহস্যময় আখ্যানের জন্ম হয়, কতরকম অবিশ্বাস্য কথা শোনা যায়। সত্যি বলতে কী এই যুগে, এত সব মানুষের মধ্যে লৌকিক এক জগতের অভ্যন্তরে এরকম কাহিনিগুলি কেন শোনা যায়? কই এত তো তীর্থস্থান আছে, এমনকী দ্বারকা কিংবা পুরী, সর্বত্র বহু অলীক রূপকথার মতো গল্প শোনা যায়। কিছু সত্যি। কিছু হয়তো অসত্য। অথবা কাল্পনিক। কিন্তু বেছে বেছে নিধুবন সম্বন্ধে এই যে সন্ধ্যার পর শ্রীকৃষ্ণ আর রাধারানি এসে লীলা করেন বলে শোনা যায় কিংবা কেউ দেখে ফেলেছে অথবা দেখার চেষ্টা করেছে বলে তাঁর ক্ষতি হয়েছে, এর কারণ কী? এই নিধুবনকে নিয়েই শুধু এই কাহিনি আবর্তিত হয় কেন?
সন্ত মহারাজ বললেন, বৃন্দাবনের গোবিন্দজির মন্দির ছিল সাততলার সমান বুঝলে। মোগল আমলে। তা সেই সময় কোনও ভবন যদি সাততলার সমান হয়, তাহলে, বুঝতে পারছ কত উচ্চতা ছিল? আর এরকম কংক্রিটের জঙ্গলও ছিল না। বৃন্দাবন মানে তো জঙ্গলই। হাজারও গাছের মেলা। এহেন এক বৃন্দাবনে সাততলা মন্দিরের উপর সন্ধ্যাকালে যে প্রদীপ জ্বালানো হতো, সেটা দেখা যেত আগ্রা থেকেও। এত দূর থেকেও প্রদীপ দেখতে পাওয়া অলৌকিক নয়? কিন্তু ঘটনা তো সত্যি। কেন বল তো!
তিনিই বললেন, ওই প্রদীপের প্রজ্বলিত আলো আগ্রা থেকে দেখা যায়, এটা জানতে পারলেন সম্রাটও। আলমগির আওরঙ্গজেব থাকতেন বটে এখানে সেখানে। মানে দিল্লি আর আগ্রায় তো তিনি আর থিতু থাকতেন না। সারাক্ষণই বাইরে বাইরে। আগ্রায় একবার এসে তিনি জানতে পারলেন ওই প্রদীপ নিয়ে খুব আলোচনা। কোন আলো ওটা? যা এতদূর থেকে দেখা যাচ্ছে? তাঁকে জানানো হল, বৃন্দাবনের গোবিন্দজির মন্দির থেকে আসা আলো।
সন্ত মহারাজ বললেন, একথা শুনেই তো মাথায় আগুন জ্বলে উঠল আওরঙ্গজেবের। আর নির্দেশ এল ওই আলোর উৎসকে ভেঙে ফেলতে হবে। সেই শুরু। একের পর এক মূর্তি আর মন্দির ভাঙা শুরু হল। বৃন্দাবন বহুবার মাটিতে মিশে গিয়েছে। আবার সে উঠে দাঁড়িয়েছে।
রাজা মির্জা জয় সিং মোগল দরবারেই কাজ করতেন। তিনি পাঠালেন এক বার্তাবাহককে। মন্দিরে। বললেন, বৃন্দাবনে মন্দির ভাঙা আরও বাড়বে। এখনই সব মূর্তি সরিয়ে ফেলতে হবে। নয়তো সব ধ্বংস হবে।
একথা মন্দিরের পুরোহিতদের কাছে আসা মাত্র প্রধান পুরোহিত শিবরাম গোস্বামী প্রত্যেক মন্দির পুরোহিতদের বললেন, যে যেভাবে পারবেন সামনে থাকা আপনাদের প্রধান মূর্তিকে নিয়ে পালান। তাই করা হল। কাপড়ে জড়িয়ে, রাতের অন্ধকারে পুরোহিতরা পালাতে শুরু করলেন। কোথায় যাবে? কোথায় গেলে আশ্রয় পাওয়া যাবে এসব ভাবলে চলবে না। আগে পালাও। অতএব জয়পুরে যাওয়া হল। রাজপুতদের তখনও পর্যন্ত অন্তত সরাসরি আক্রমণ করছে না মোগল সেনা।
দ্রুত সেই মূর্তি সরিয়ে ফেলা হল জয়পুরে। এই মন্দিরও তো নির্মাণ করেছিলেন জয়পুরের মহারানা ভগবান দাসের পুত্র মানসিংহ। জয়পুরে আবার সরিয়ে নেওয়া হল।
সুধা সন্তদাস বলছেন, জয়পুরের এক রাজকন্যার বিয়ের ব্যবস্থা হচ্ছে। তিনি বললেন, আমার পক্ষে সেটা সম্ভব নয়।
কেন নয়? জানতে চাইলেন মহারানি।
রাজকন্যার উত্তর শান্ত ভঙ্গিতে। আমার সঙ্গে তো বিয়ে হয়ে গিয়েছে একজনের।
সে কী? কার সঙ্গে? সর্বনাশ।
রাজকন্যার উত্তর— মদনমোহনকে বিয়ে করেছি।
মহারানি মুখ চেপে ধরলেন। বললেন, মানে? এসব কথা কেউ শুনলে ভাববে তুই পাগল হয়ে গিয়েছিস।
কিন্তু কথা তো সত্যি!
ঠিক আছে— তুই যদি না দেখে বলে দিতে পারিস যে কে মদনমোহন, তাহলে তোর কথা মেনে নেব। রাজকন্যার চোখ বেঁধে দেওয়া হল। তাঁকে নিয়ে আসা হয়েছিল পাঁচটি মূর্তির সামনে। চোখ বাঁধা অবস্থায় রাজকন্যা বুঝে গিয়েছিলেন মদনমোহনদেব কে। কিন্তু তবু সমাজের কথা ভেবে তাঁর বিয়ে হল। করোলির রাজপরিবারে। রাজকন্যা সেখানেই নিয়ে গেলেন মদনমোহনকে। আর সেই থেকে প্রকৃত মদনমোহন করোলিতে রয়ে গিয়েছেন।
এরকম বহু পরীক্ষা দিয়েছে বৃন্দাবন। বললেন সুধাসন্ত। আপনার প্রশ্ন হল, কেন নিধুবনের লীলা। তাই তো? শুনুন। অস্তিত্বের দুটো অংশ। দেহ। যা পাঞ্চভৌতিক। আর অন্যটি আত্মা। যা অস্তিত্বের চিৎ অংশ। চিৎ অংশ মানে চেতন। মানুষের জন্য একথা প্রযোজ্য। কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দেহ আর আত্মা দুই-ই চেতন। মিলেমিশে একাকার। মহাপ্রভুর কথা তো আপনি জানেন। কেন মহাপ্রভু হয়েই জন্মগ্রহণ করতে হল রাধাশ্যামকে? কারণ এককভাবে কৃষ্ণরূপ অস্তিত্বকে পূর্ণ প্রকট করতে পারবে না। উপলব্ধিও হবে না। তাই রাধারানি ও কৃষ্ণ মিলিতভাবে চেতনায় পর্যবসিত। আর তাই কলিকালেও নিধুবনে সেই লীলা চলছে।
কৃষ্ণ শরীর এবং আত্মা পরিত্যাগ করেছেন দ্বারকায়। কিন্তু বৃন্দাবনকে তিনি ভুলবেন কীভাবে? তিনি এসেছিলেন মহাপ্রভু রূপ নিয়ে। মহাপ্রভুর মধ্যে দিয়েই যেন কৃষ্ণ রাধার প্রকৃত স্বরূপকে উপলব্ধি করতে দিলেন মর্ত্যবাসীকে। আর তাই নবদ্বীপ নীলাচল গিয়েও শান্ত হননি মহাপ্রভু। তাঁকে বৃন্দাবনেও যেতে হল।
ব্রহ্মাণ্ডের ১৪টি লোক রয়েছে। আমরা ঠিক মাঝখানে ঝুলে রয়েছি। ভূলোকের নীচে রয়েছে তল, অতল, বিতল, তলাতল, রসাতল, পাতাল, সুতল। আবার উপরে রয়েছে ভূ, ভূবঃ, স্ব, মহঃ, জন, তপ, সত্য। সত্যলোকে ব্রহ্মার বাস। মহঃ লোকে ঋষিদের বাসস্থান। আর স্ব অর্থাৎ স্বর্গ দেবতাদের। আর এই ১৪ লোকের উপর বয়ে যাচ্ছে বিরজা নদী।
কটা যুগ বলুন তো? সুধাসন্তদাস প্রশ্ন করলেন।
বললাম, আজ্ঞে চার যুগ। এমনই তো জানি। আমাদের তো পুরাণ শাস্ত্র পাঠ নেই। তাই হয়তো আরও কিছু ব্যাখ্যা আছে। সেটা কী?
মহারাজ বললেন, চার যুগ তো বটেই। কিন্তু যদি মনে করেন প্রত্যেকটি কলির পর আবার সত্য ও দ্বাপর যুগে পুনরায় শ্রীকৃষ্ণ আসবেন, একথা কিন্তু ভাবলে চলবে না। ২৮ চতুর্যুগের পর দ্বাপরে আসেন আবার শ্রীকৃষ্ণ। আর ঠিক সেরকমই প্রতি ২৮ চতুর্যুগের পর প্রথম কলিতে আসবেন মহাপ্রভু বারংবার।
যে মানুষ নিজের দায়িত্ব আর কাজে নিমগ্ন থাকে সেই ভগবৎ দর্শন করবে। ওরকম কোনও ফাঁকি দেওয়া কিংবা তীর্থে তীর্থে আড়ম্বর করে ঘোরা এসব কাজে আসে না, বুঝলেন। চিরঘাটে এক বৃদ্ধা বসে বসে জাঁতা পিষছেন। কখন যে সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছেন শ্রীকৃষ্ণ, সেটা জানতেই পারেননি। দেখবেন কীভাবে? তিনি তো নিজের কাজেই মগ্ন হয়েছেন। মন প্রাণ দিয়ে কাজ করছেন। স্বয়ং ভগবান তাঁকে ডেকে বললেন, আমি এসেছি। তুমি দেখলেই না? সেকথা শুনে তাকিয়ে বৃদ্ধা দেখেন তাঁর আরাধ্য। এই যে নিধুবনে সন্ত হরিদাসের ভগবৎ দর্শন হল, সে কি এত সহজে হয়? ওরকম এক সাধক হতে হবে।
কত যে জন্ম কেটে যাবে ওই সাধনার নখের যোগ্য হতে! সুধাসন্ত মহারাজ চোখ মুছলেন আবেগে। বললেন, সুতরাং নিধুবন হল বৃন্দাবনের লীলার এক প্রতীক। লীলা কোথায় নেই? ইচ্ছে হল আর নিধুবনে একটু উঁকি দিলাম, আর অলৌকিক দর্শন হয়ে গেল? মনের কামনা বাসনা দূর করতে হবে না? জাগতিক ইচ্ছাযুক্ত হয়ে থাকলে কোনওদিন দৈবানুভূতি হবে না। বৃন্দাবনে এসেছেন তো! দেখতে পাচ্ছেন না, রাধারমণ মন্দির, গোপীনাথ মন্দির, মদনমোহন, বাঁকেবিহারী, রাধারানির রাধাকুণ্ড শ্যামকুণ্ডে পরিক্রমা করেও সব অজ্ঞান মানুষের দল সাংসারিক আলোচনা করছে। কূটকচাল করছে। এসেছে ব্রজধামে। কিন্তু সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে সেই মনটাকেই, যে মন অন্ধকার এক কুয়োয় বাস করে সারাবছর। তাই যে গল্প গ্রামে শহরে নিজের বাড়িতেই করে সারাবছর ধরে, দেখবে ভগবান দর্শন হয়ে গেল আবার সামনের চাতালে বসে সেই গল্পই করছে সকলে।
অক্রুর মন্দিরে থাকা মহাপ্রভু যমুনা তীরের ইমলিতলায় ধ্যান করতেন। কৃষ্ণ ভজনার স্থান। ইমলি মানে হল তেঁতুল। এই ইমলিতলার মাহাত্ম্য জানো তো? রাধারানি আর শ্রীগোবিন্দের লীলাখেলার অঙ্গ। কৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে দ্রুত যাচ্ছিলেন রাধারানি। কৃষ্ণ অভিসারে যাওয়ার সময় তাঁর কোনও হুঁশ নেই। ইমলিতলায় তেঁতুল পড়েছিল। সেখানে পা পিছলে পড়ে গেলেন রাধারানি। আঘাত পেলেন। যাওয়ার বিলম্ব হল। কৃষ্ণকে অন্তত কিছু সময়ের জন্য তো কম দেখতে পাবেন এই পড়ে যাওয়ার জন্য!
অতএব রাধারানি অগ্নিমূর্তি। অভিশাপ দিলেন ৮৪ ক্রোশের মধ্যে আর তেঁতুল হবে না কোনওদিন। খুঁজে দেখবেন। মথুরা বৃন্দাবন মণ্ডলকে তো শাস্ত্রে ৮৪ ক্রোশ বলা হয়। সেখানে তেঁতুল গাছ পাবেন। কিন্তু পাকা তেঁতুল পান কি না দেখবেন! যা সচরাচর অন্যত্র পাওয়া যায় সেই তেঁতুল কেন পাওয়া যায় না? এ কি লীলা নয়? জানতে চান সুধাসন্ত মহারাজ।
বিকেল হয়ে আসছে। রাধারমণ আশ্রম সরগরম। একই সঙ্গে দুই কথকতার আসর। গোল হয়ে ঘিরে আছেন ভক্তের দল। একটি বাংলায়। অন্যটি হিন্দিতে। মাঝেমধ্যেই উঠছে ভক্তকুলের আকুল জয়ধ্বনি। রাধে রাধে কিংবা জয় হো বাঁকেবিহারী। আর এসবের থেকে দূরে রাধারমণ মন্দিরের আবছা আলোছায়া এক মন্দিরগর্ভে গোপীনাথের বন্দনা করছেন চোখ বুজে তিন নারী। চোখ থেকে বইছে জলের ধারা। থামছেন না তাঁরা।
ভক্ত ভক্তি কৃষ্ণপ্রেম তত্ত্বের নির্ধার
বৈষ্ণবের কৃত্য আর বৈষ্ণব আচার
কৃষ্ণভক্তি কৃষ্ণপ্রেম সেবা প্রবর্তন
লুপ্ততীর্থ উদ্ধার আর বৈরাগ্য শিক্ষণ।
এই নারীদের এই নিবেদনের মধ্যেও মিশে রয়েছে ব্রজধামের পুণ্যভূমের অমোঘ উচ্চারণ। ঠিক এটাই করেছিলেন রূপ গোস্বামী, সনাতন গোস্বামীদের মতো মহাপ্রভুর ছয় প্রেরিত গোঁসাই। লুপ্ত তীর্থ উদ্ধার। যা মানব সভ্যতার ভক্তি আন্দোলনে এক নয়া যুগের সূচনা করেছিল। সবই ছিল শ্রীবৃন্দাবনে। কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া সেই গুপ্ততীর্থকে প্রকট করলেন মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য নামক এক যুগাবতার বাঙালি পুরুষ।
ওই যে নিধুবন। ওই যে সেবাকুঞ্জ। ওই যে মান সরোবর। প্রতিটি পুণ্য স্পর্শ একটি করে যেন জন্ম দেয়। ওই যে শ্যামকুণ্ডের কাছেই মানসপবন ঘাট। পাশেই সুবল কুঞ্জ। রাধারানির ভাইয়ের কুঞ্জ। রাধাকুণ্ড ছেড়ে কীসের টানে মানসপবন ঘাটে স্নান করেন রাধারানি? অষ্ট সখীর অধীনে আট কুঞ্জ আজও বিদ্যমান। আজও কি নেই রাধারানি আর শ্রীকৃষ্ণের অশরীরী উপস্থিতি। স্বয়ং ভগবানই যে বলে গিয়েছিলেন, বৃন্দাবনং পরিত্যাজ্যং পাদমেকং ন গচ্ছামি। তিনি বৃন্দাবন পরিত্যাগ করতে পারবেন না কোনও কালেই।
কিন্তু এহেন বৃন্দাবন তো তিনি ত্যাগ করেছেন! দ্বারকায় চলে গেলেন। তাহলে? প্রশ্ন আসে ভক্তের মনে। যমুনাতীরের আরতির আগে পাঁচ প্রহরের কথকতায় রামস্বরূপ গোস্বামী হেসে বলেছিলেন, কজন কৃষ্ণ ছিলেন বৃন্দাবনে? দু’জন। একজন বসুদেব নন্দন। অন্যজনের পরিচয় ছিল নন্দনন্দন। একই দেহ। কিন্তু দুই জনক। তাই তো? আদতে এই দুই সত্তাই তিনি বহন করে চলেন অনন্তকাল ধরে। বৃন্দাবনে আত্মার একটুকরো না রেখে তিনি কি যেতে পারেন দ্বারকায়? অতএব শ্রীকৃষ্ণহীন কখনও হয়নি ব্রজধাম। অপ্রকট হয়েছেন। কিন্তু রয়ে গিয়েছে তাঁর অস্তিত্ব। আর অপ্রকট কাদের কাছে? প্রাকৃত মানুষের কাছে। প্রকৃত ভক্তদের কাছে তো নয়! আর তাই প্রতিনিয়ত প্রতিটি বনে বনে, ঘাটে ঘাটে, তীরে তীরে তাঁর আবির্ভাব ঘটে। রাধারানিকে নিয়ে। অকস্মাৎ মধ্যরাতে বিনা মেঘে বিদ্যুৎ ঝলসে ওঠে আজও। নিধুবনের অভ্যন্তরে আলোক স্ফুরণে অলৌকিক রাসলীলার উদ্ভাস নিয়ে সেই বিদ্যুৎ ফিরে যায় পুনরায় হয়তো বৈকুণ্ঠে। রহস্যময় অবতারলীলার অলীক আখ্যান ভাসে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের মধ্যে।
স্বামী অচ্যুতানন্দের বৃন্দাবন মথুরা তীর্থ ভ্রমণের বিবরণে জানতে পারি, শ্যামকুণ্ড সংস্কার করতে গিয়ে রঘুনাথ দাস বাবাজি স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বয়ং যুধিষ্ঠির এসেছেন। তাঁকে বলছেন, ডানদিকের পাঁচটি গাছ কেট না। আমরা পঞ্চপাণ্ডব বৃক্ষরূপে অধিষ্ঠিত আছি ওই পাঁচ গাছ হয়ে। কেন? রঘুনাথ দাস বাবাজি বুঝতে পারেননি। কৃষ্ণলীলা আস্বাদন করতে। সেই থেকে শ্যামকুণ্ড আর চারকোনা করা হল না।
সাধু রামঠাকুর বর্ণিত ব্রজের সংজ্ঞা ছিল, ব্রজ শব্দের অর্থ ব-রজ। অর্থাৎ রজহীন তথা প্রকাশহীন। তাই কি ব্রজধামের চালিকাশক্তি শ্রীকৃষ্ণের অপ্রাকৃত লীলা আজও অদৃশ্যভাবে হয়ে চলেছে প্রাকৃতজনের আড়ালে? সেই লীলাসন্ধানই কি এই নশ্বর জীবনের ব্রত নয়?
এখন সন্ধ্যা। মন্দিরে মন্দিরে আরতির ঘণ্টাধ্বনিতে ভেসে যাচ্ছে মাধুর্যধাম বৃন্দাবন। ঠাকুরজি ধর্মশালার সামনে দিয়ে তীর্থ দর্শনে বেরনো বেলগাঁও মহামণ্ডল আশ্রমের শোভাযাত্রার দিকে তাকিয়ে থাকেন আশ্রম আর মন্দিরগুলিতে সকাল সন্ধ্যা ঝাড়ু দেওয়া, ঘর বারান্দা মোছার কাজ নিয়ে কোনওমতে খিদে মেটানো প্রৌঢ়া বিধবারা।
সারাদিনের ব্রজদর্শন সেরে হাজার হাজার ভক্ত পুণ্যার্থী ফিরছে মথুরা স্টেশনে। তাদের পায়ে লেগেছে ব্রজধুলিকণা। মনে লেগেছে রাধেশ্যামের মায়াবী পরশ। কাল ছিল লক্ষ্মীপুজো। বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ কমলা রঙের দৈব চাঁদ হয়তো এখন নেমে আসছে রুদ্ধদ্বার নিধুবনের রহস্যলীলাবনে!