


দেবেশ মজুমদার: যুগ যুগ ধরে সাহিত্য থেকে সিনেমা সর্বত্রই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ভূতেরা। রবীন্দ্রনাথের ‘মণিহারা’ গল্পের মণিমালার কাহিনি পড়তে পড়তে শিহরন জাগে বুকে। পরশুরামের ‘কারিয়া পিরেত’ বা ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ‘লুল্লু’র কথা পড়তে পড়তে পাঠকের ঠোঁটের কোণে হাসি ফোটে। লীলা মজুমদারের আকাশ বুড়িকেও খুব ভালো লাগত ছোটবেলায়। পড়তে পড়তে ভাবতাম কী করে আকাশ বুড়ির কাছে যাওয়া যায়। এখন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্পেও অনেক ভালো ভূতের দর্শন পাই আমরা। ভূত, প্রেত কিংবা আত্মায় বিশ্বাস করুন বা না করুন ভৌতিক আকর্ষণ থেকে মানুষ বেরতে পারে না কিছুতেই। ভূতেদের কদর বেড়ে চলেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। দেশে এবং বিদেশে। তাই ভূতেদের জন্য আছে বিশেষ দিনও। হ্যালোউইন থেকে ভূত চতুর্দশী, বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তেই রয়েছে ভূত দিবস পালনের রেওয়াজ। এমনকী বছরের প্রায় একই সময় সারা বিশ্বজুড়ে পালিত হয় এই উত্সব। প্রতিবছর ২ নভেম্বর মৃতদের আত্মার শান্তি কামনা করে ‘অল সোলস ডে’ পালন করেন সারাবিশ্বের ক্যাথলিক খ্রিস্টানরা, ইংল্যান্ড ও আমেরিকার হ্যালোউইন আর বাঙালির ভূত চতুর্দশী।
শারদীয়ার মন খারাপের দিন পনেরো কাটতে না কাটতেই কৃষ্ণপক্ষের সূচনা। কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর পরদিনেই ভূত চতুর্দশী। পৃথিবী জুড়ে এই সময়েই পালিত হয় অল সোলস ডে, আত্মার দিন বা প্রেতাত্মার দিন। আমেরিকার হ্যালোউইন আর আমাদের ভূতচতুর্দশী। হ্যালোউইন পালিত হয় সেদেশে মৃত আত্মার শান্তি কামনায়। ঠিক যেমন আমরা আমাদের মহলায়ায় প্রিয়জনের মৃত আত্মার প্রতি স্মৃতিতর্পণ জানিয়ে পিতৃপক্ষের অবসান ঘটিয়ে দেবীপক্ষের শুরু করি। তবে হ্যালোউইনের সঙ্গে ভূতচতুর্দশীর অনেক অমিল রয়েছে। যার মধ্যে একটি বড় অমিল হল তারিখ। প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর পালন করা হয় হ্যালোউইন, অপরদিকে তারিখ নয় বরং তিথির হিসেব মেনে কালীপুজোর ঠিক আগের দিন পড়ে ভূত চতুর্দশী। নানা ধরনের ভূত সেজে ভয় দেখানো এবং ভয় পাওয়ার জন্যই এত জনপ্রিয় হ্যালোউইন, এই রীতি নেই ভূত চতুর্দশীতে।
হ্যালোউইনের রাতে যেমন মিষ্টি কুমড়ো কেটে ভূতের মুখ বানিয়ে তাতে আলো জ্বালানো হয়। তেমনই ভূত চতুর্দশীতে বাড়ির চতুর্দিকে জ্বালানো হয় প্রদীপ। হিন্দু পুরাণে আছে, এই দিন সন্ধ্যা নামার পরপরই মৃত আত্মারা নাকি ঘুরে বেড়ায়। তাদের আত্মার শান্তি কামনায় চোদ্দো রকম শাক (ওল, কেঁউ, বেতো, সরিষা, কালকাসুন্দে, নিম, জয়ন্তী, শাঞ্চে, হিলঞ্চ, পলতা, শৌলফ, গুলঞ্চ, ভাটঁপাতা, সুষনি) রান্না করে বা ভেজে খাওয়ার রীতি রয়েছে। আর সন্ধেবেলায় বাড়িতে চোদ্দো প্রদীপ জ্বালার নিয়ম। কোথাও যেন কোনও অন্ধকার না থাকে। চোদ্দো শাক ভাজা আর চোদ্দো প্রদীপ জ্বালানোর পেছনে কিন্তু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। বলা হয়, হেমন্তকালের শুরুতে পোকার উপদ্রব দূর করে বাড়িতে জ্বালানো হয় চোদ্দো প্রদীপ। আবার ঋতুর পরিবর্তনের কারণে এই সময়টা অসুখ বিসুখ হয় বেশি, তাই চোদ্দো রকমের শাক খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ে।
চোদ্দো প্রদীপ নিয়ে নানা রকমের গল্প আছে। ভূত চতুর্দশীর রাতে নাকি নিজের বাড়িতে সফর করতে আসেন পরলোকগত চোদ্দো পুরুষ। তাদের আসা আর যাওয়ার পথ আলো করে রাখতেই জ্বালানো হয় এই প্রদীপ। আবার এমনও শোনা যায়, এই দিনে ‘চামুণ্ডা’ রূপে চোদ্দো ভূত দিয়ে ভক্তদের বাড়ি থেকে অশুভ শক্তি দূর করতে নেমে আসেন মা কালী। তাকে স্বাগত জানাতেই নাকি প্রদীপ জ্বালানোর ব্যবস্থা।
ভূতচতুর্দশী নিয়ে পুরাণের গল্পটা হল— দানবরাজ বলি যখন স্বর্গ, মর্ত ও পাতাল দখল করে নিলেন, তখন তার আক্রোশ থেকে পার পেলেন না দেবতারাও। বলির তাণ্ডব ঠেকাতে দেবগুরু বৃহস্পতি ভগবান বিষ্ণুকে একটি উপায় বাতলে দিলেন। বামনের ছদ্মবেশে তখন নেমে এলেন বিষ্ণু, তিন পা সমান জমি ভিক্ষা চাইলেন রাজা বলির কাছে। দানবরাজ বামনরূপী বিষ্ণুকে চিনতে পেরেও না বোঝার ভান করে রাজি হলেন চুক্তিতে। দুই পা দিয়ে স্বর্গ ও মর্ত দখল করে ফেললেন বিষ্ণু। এরপর নাভি থেকে বের হয়ে এল আরেক পা, যা রাখলেন বলি রাজার মাথার উপর। সঙ্গে সঙ্গেই পাতালে নেমে গেলেন দানবরাজ বলি। সেই থেকে পাতালই হল তার আবাস। তবে ভগবানের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করায় বলির জন্য একটি বিশেষ সুযোগ দিলেন বিষ্ণু। প্রতি বছর পৃথিবীতে তিনি পুজো পাবে মানুষের কাছ থেকে। সেই থেকে কালীপুজোর আগের রাতে বলি রাজা পাতাল থেকে উঠে আসেন পুজো নিতে, তার সহচর হিসেবে থাকে শত সহস্র ভূত, প্রেতাত্মা এবং অশরীরী।
দানবরাজ বলির পৃথিবী সফরকে কেন্দ্র করে উৎসব চলে কেরলেও। তবে এই উৎসবে ভয়ের বদলে থাকে আনন্দ। ওনাম উৎসব উপলক্ষ্যে দশ দিন ব্যাপী চলে নাচ-গান, ঘর সাজানো আর খাওয়াদাওয়া। কেরলবাসী বিশ্বাস করে, বছরের একটি দিন পাতাল থেকে মহারাজ বলি আসেন তার প্রজাদের দেখতে, যাদের তিনি একসময় শাসন করতেন। তাই রাজার সফর উপলক্ষ্যে বিশাল আয়োজন করেন তারা। তবে অক্টোবরে নয়, ওনাম উৎসব হয় আগস্ট-সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে।
লাতিন আমেরিকায় অল সোলস ডে পরিচিত ডে অব দ্য ডেড নামে। মেক্সিকো ও স্পেনে এই দিনকে বলা হয় দিয়া দে লোস মুয়েরতোস। নভেম্বর মাসের ১ ও ২ তারিখে পালিত হয় মৃতদের দিন। প্রতি পরিবার প্রিয়জনদের সমাধিক্ষেত্রে শ্রদ্ধা জানানোর পর মেতে ওঠে উত্সবে। ম্যাকাব্রেলি প্যারেড, কঙ্কালের সাজে উত্সব পালন করে লাতিন বিশ্ব। প্রায় হাজার বছরের পুরনো এই রেওয়াজ।
চীনে এই উত্সবের নাম তেঙ্গ চেইহ। তবে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে নয়। চাইনিজ বছরের শেষে পালিত হয় তেঙ্গ চেইহ। এই উত্সবকে লণ্ঠন উত্সবও বলা হয়। বিভিন্ন পশুপাখির আকারে তৈরি করা হয় লণ্ঠন। সেই লণ্ঠন জালিয়েই দূর করা হয় অশুভ শক্তি।
জাপানে এই উৎসব বলা হয় ফেস্টিভ্যাল অব হাঙরি গোস্টস। সারা গরমকাল জুড়ে জাপানে পালিত হয় ওবোন ফেস্টিভ্যাল। সারারাত ধরে আগুন জ্বালিয়ে রাখেন জাপানিরা। রাস্তায় যেখানে সেখানে লাল লণ্ঠন সত্যিই দেখার মতো দৃশ্য তৈরি করে।