Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

হুঁশ ফিরবে কবে?

এমনটাই তো হওয়ার কথা। মানব সভ্যতার উন্নয়নের দোহাই দিয়ে অসম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রকৃতির বুকে ইচ্ছেমতো ধ্বংসলীলা চালালে তার পরিণতি যে ভয়ংকর হতে পারে, সেই সহজ সত্য কথাটা যুগে যুগে বলে এসেছেন বিশেষজ্ঞ-বিজ্ঞানীরা। কিন্তু গোটা বিশ্বের শাসকেরা সেই সতর্কবার্তা কানে তোলেনি।

হুঁশ ফিরবে কবে?
  • ১৫ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

এমনটাই তো হওয়ার কথা। মানব সভ্যতার উন্নয়নের দোহাই দিয়ে অসম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রকৃতির বুকে ইচ্ছেমতো ধ্বংসলীলা চালালে তার পরিণতি যে ভয়ংকর হতে পারে, সেই সহজ সত্য কথাটা যুগে যুগে বলে এসেছেন বিশেষজ্ঞ-বিজ্ঞানীরা। কিন্তু গোটা বিশ্বের শাসকেরা সেই সতর্কবার্তা কানে তোলেনি। উলটে তারা দেখাতে চেয়েছে, এ লড়াইয়ে প্রকৃতি বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে। কিন্তু বাস্তব সত্য যে ঠিক তার উলটো, প্রকৃতির বদলার কাছে মানুষের স্বেচ্ছাচারী নির্মাণ যে আসলে খড়কুটোর মতো ভেসে যাচ্ছে—সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় সেই ভয়াবহ ছবিটা উঠে এসেছে। জার্মান ওয়াচ নামক একটি সংস্থার রিপোর্ট ‘ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স-২৬’-এর তথ্যে জলবায়ুজনিত বিপর্যয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্বের প্রথম ১০টি দেশের তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৯৫ থেকে ২০২৪ —এই তিন দশকের সময়কাল নিয়ে বিশ্বের ১৭৪টি দেশের উপর এই সমীক্ষা চালানো হয়। তাতে নবম স্থানে রয়েছে ভারতের নাম। মূলত গ্লোবাল সাউথের দেশগুলিই ঝুঁকির তালিকার শীর্ষে রয়েছে। জলবায়ুজনিত বিপর্যয় মানে এক চরম ও দীর্ঘস্থায়ী আবহাওয়ার পরিবর্তন, যা প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীবজগতের ব্যাপক ক্ষতি করে। এর মধ্যে রয়েছে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, অতিবৃষ্টি, মেরু অঞ্চল ও পর্বতে বরফ গলে যাওয়া, তীব্র ঝড়ের মতো ঘটনা—যা জীবন, সম্পদ ও বাসস্থানের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। 

Advertisement

প্রকৃতির উপর নির্বিচার মারণযজ্ঞ চালিয়ে কতটা বিপর্যস্ত ভারতের অবস্থা? রিপোর্ট বলছে, গত তিন দশকে ছোটো-বড়ো মিলিয়ে ৪৩০টি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে এ দেশে। তাতে শুধু প্রাণ হারিয়েছেন ৮০ হাজারের বেশি মানুষ। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও ১৭ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। শুধুমাত্র ২০২৪ সালে মৌসুমী বৃষ্টিপাতের কারণে বহু জায়গায় বৃষ্টিপাত হয়েছে। তাতে ৮০ লক্ষের বেশি মানুষ অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন। গত বছর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্যগুলি হল, মহারাষ্ট্র, গুজরাত ও ত্রিপুরা। ভারতের পার্বত্য এলাকায় ভূমিধস, নদী তীরবর্তী এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি, উপকূলবর্তী এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের ঘটনা তিন দশকে ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সমীক্ষায় প্রকাশ, গোটা বিশ্বে মূলত দু’ ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। এক, আকস্মিক কোনও ঘটনা তীব্র অভিঘাতের সৃষ্টি করেছে। দুই, লাগাতার ঘটে গিয়েছে বিপর্যয়। ভারত রয়েছে এই দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে। অর্থাৎ, একটি বিপর্যয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটি দুর্যোগ নেমে এসেছে। যেমন, এবছর আগস্ট মাসে পাঞ্জাবের বন্যা, উত্তর কাশীতে বিপর্যয়, উত্তরবঙ্গে ধস, বন্যা পরিস্থিতি দেখা গিয়েছে। আবার যশ, উমপুনের বিপদ সামলে এ বছর দেশ ‘মান্থা’ ঘূর্ণিঝড়ের সাক্ষী থেকেছে। এই ধরনের বিপর্যয়ের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে পরিকাঠামো, জীবিকা, কৃষি ও জনস্বাস্থ্যে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধ্বংসলীলাকে শুধুমাত্র প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলে দায় এড়ালে চলবে না। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে উন্নয়নের কাজ করার আগে জলবায়ুজনিত ঝুঁকির দিকটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। একথা ঠিক যে, জলবায়ুজনিত ঝুঁকির ক্ষেত্রে দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ এখনও সামনের সারিতে নেই। কিন্তু এই রাজ্যে হিমালয় কোস্ট লাইন ও ডেল্টা লাইন একসঙ্গে থাকায় ঝুঁকির সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। বিপর্যয়ের বলি শুধু ভারত একা নয়। রিপোর্ট বলছে, বিশ্বে গত তিন দশকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে ৯ হাজার ৭০০টি। মৃত্যু হয়েছে ৮ লক্ষ ৩২ হাজার মানুষের। ক্ষতির পরিমাণ ৪ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি ডলার। 
ভারতে বন্যা, হড়পা বান বা ভূমিধসের হাড়হিম করা ছবি দেখা গিয়েছে এ বছর। আবার সাম্প্রতিককালে প্রবল তাপপ্রবাহের সাক্ষী হয়েছে ইউরোপ, অসময়ে দাবানল লেগেছে আমেরিকায়। এইসব পরিস্থিতি নিয়ে নেচার ডট কম-এর প্রকাশিত গবেষণাপত্রে দাবি করা হয়েছে, ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে এমন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঘটনা আরও ভয়াল চেহারা নেবে। আরও ঘন ঘন ঘটবে এসব ঘটনা। ভারতের জন্য অস্বস্তিটা আরও বেশি। ইন্টার গভর্নমেন্ট প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে চলেছে হিমালয় লাগোয়া অঞ্চল ও উপকূলবর্তী এলাকা। তবে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী মানুষের কাজকর্ম। একদিকে আইন না মেনে পাহাড়ের কোলে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলছে যথেচ্ছ নির্মাণকার্য, অন্যদিকে পর্যটনের উন্নয়নের স্বার্থে ভূপ্রাকৃতিকভাবে স্পর্শকাতর এলাকায় নির্মাণ কাজের জেরে পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে যাচ্ছে। নদীর ধারে ঘেঁষে গড়ে উঠছে হোটেল, রাস্তা ইত্যাদি। নদীর স্বাভাবিক গতি রোধ করা হচ্ছে। এর ভয়ংকর পরিণতি দেখা গিয়েছে উত্তরাখণ্ড, হিমাচলপ্রদেশ বা দার্জিলিংয়ের মতো পাহাড়ি এলাকায়। এই অনিবার্য পরিণতি ঠেকাতে মিটিং, আলোচনা, পরিকল্পনা হচ্ছে অনেক। কিন্তু ওই পর্যন্তই! এ ব্যাপারে যতটা ধ্যান দেওয়া উচিত দেশের শাসকের তা তারা দিচ্ছে কই! দরকার অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ। অথচ তারা মেতে আছে ভোট রাজনীতিতেই। তাই অসম লড়াইয়ে প্রকৃতির কাছে ঘা খেয়েও সংবিৎ ফিরছে না। না প্রশাসনের, না মানুষের। ফলে আরও খারাপ দিন হয়তো আসতে চলেছে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ