Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নাম বাদ গেলে কী হবে? স্পষ্ট করা হোক

নিয়মটি অত্যন্ত সহজ। কোনও জটিলতা নেই। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় যার নিজের কিংবা পিতামাতার নাম আছে, তাদের কোনও নথিপত্র কাগজ দেখাতেই হবে না। বিএলও যে ফর্ম বাড়িতে এসে দিয়ে যাচ্ছে, সেটি পূরণ করে দিলেই হয়ে গেল। নিশ্চিন্ত। নতুন সংশোধিত ভোটার তালিকায় স্বাভাবিকভাবেই নাম উঠে যাবে।

নাম বাদ গেলে কী হবে? স্পষ্ট করা হোক
  • ৭ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: নিয়মটি অত্যন্ত সহজ। কোনও জটিলতা নেই। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় যার নিজের কিংবা পিতামাতার নাম আছে, তাদের কোনও নথিপত্র কাগজ দেখাতেই হবে না। বিএলও যে ফর্ম বাড়িতে এসে দিয়ে যাচ্ছে, সেটি পূরণ করে দিলেই হয়ে গেল। নিশ্চিন্ত। নতুন সংশোধিত ভোটার তালিকায় স্বাভাবিকভাবেই নাম উঠে যাবে। 

Advertisement

কিন্তু যাদের নাম কিংবা পিতামাতার কারও নামই ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নেই? তাদের কাছে নোটিশ যাবে। ২০০২ সালের তালিকায় কেন নাম নেই, পিতামাতাও কেন তালিকায় নেই, এসব প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। যে ১১টি প্রমাণপত্রের কথা বলা হয়েছে, সেগুলি দেখাতে হবে। যদি নির্বাচন কমিশন মনে করে সব কাগজপত্র সঠিক এবং বৈধ, তাহলে তাদের নামও অন্তর্ভুক্ত হবে তালিকায়। 
আর যাদের প্রমাণপত্র গ্রাহ্য হবে না, বৈধ হিসেবে গণ্য হবে না, তাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ চলে যাবে। অর্থাৎ তারা আর ভোটার থাকবে না ভারতের। এ পর্যন্ত সবটাই প্রাঞ্জলভাবে বোঝা গেল। এবং নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্য নিয়েও কোনও সন্দেহ নেই। পরিচ্ছন্ন ভোটার তালিকা নির্মাণ করাই তো দরকার। 
কিন্তু যে প্রশ্নগুলির উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না, সেগুলির দিকে আলোকপাত করা যাক। প্রথম ও সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, কোনও প্রমাণপত্র বা কাগজেই যদি কাজ না হয়, তাহলে যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ চলে যাবে, তাদের নিয়ে শেষ পর্যন্ত কী করা হবে? নির্বাচন কমিশন তাদের বেনাগরিক ঘোষণা করতে পারে না। ওই অধিকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের। নির্বাচন কমিশন শুধু জানাতে পারে যে, এরা ভারতের ভোটার নয়। কারণ যথার্থ কাগজপত্র নেই। 
তাহলে ভোটাধিকার হারানোর পরের ধাপ কী হবে? এটা এখনও স্পষ্ট করেনি নির্বাচন কমিশন 
এবং কেন্দ্রীয় সরকার। এই যে দিকে দিকে যখন তখন ভয়ে আতঙ্কে বিভিন্ন আত্মহত্যার মর্মান্তিক সংবাদ আসছে, এটা প্রতিহত করতে কেন্দ্রীয় সরকারের কিন্তু এখনই উচিত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা যে, নাম বাদ চলে গেলে কী কী করা হবে। সরকারের কাছে একটা কোনও প্ল্যান নিশ্চয়ই আছে? সেই প্রক্রিয়াটি সবটাই জানিয়ে রাখা হোক। তাহলে অন্তত অনিশ্চয়তার আতঙ্কে মানুষ দিন কাটাবে না। 
এটা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে, কারও নাম যদি বাদ যায়, সেটি বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়েরই মূলত। অর্থাৎ ২০০২ সালের আগে পরে যখনই কেউ ভারতে আসুক, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম নেই এবং অন্য কাগজপত্র দেখিয়েও যদি প্রমাণ করা না যায়, তাহলে নাম বাদ চলে যাবে। এবার তাদের ভারতে কী স্ট্যাটাস হবে? 
যারা বাদ চলে যাবে, তাদের কাছে ভারতের যেসব আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড, রেশন কার্ড এসব রয়েছে, সেগুলি কি সাধারণভাবেই বাতিল হয়ে যাবে? নাকি সেগুলি একইরকম থাকবে? এদের পরবর্তী কর্তব্য কী? তারা যে যেখানে রয়েছে, সেখানেই থাকতে পারবে? নাকি ডিটেনশন সেন্টার হবে? 
তাদের চিহ্নিত করা হবে অবৈধ ভোটার এবং ভোটার তালিকায় নাম না থাকা মানুষ হিসেবে? এরপর তাদের কী করণীয় হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর কেন্দ্র দিয়ে দিলে কিন্তু অনেক আতঙ্ক কমে যায় এখনই। অন্তত জানা থাকবে যে, কী কী হতে চলেছে। নচেৎ প্রবল বিভ্রান্তি এবং রাজনৈতিক জলঘোলা চলতেই থাকবে মানুষের আতঙ্ক বাড়িয়ে। 
বলা হচ্ছে হিন্দু হলে সিএএ অনুযায়ী আবার এদের আবেদন করতে হবে নাগরিকত্বের জন্য। সিএএ আবেদন কি বাংলাদেশ থেকে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যে কোনও সময় এলেই করা যায়? নাকি এই আবেদন করারও একটি বিশেষ শর্ত আছে? এদেশে আসার পর ভারতের কেন্দ্রীয় বিদেশ মন্ত্রকের ট্রাইবুনালে কি জানাতে হয় যে, আমরা আশ্রয়প্রার্থী? যারা যারা ওই আবেদন করেছিল, একমাত্র সেইসব হিন্দুই কি পাবে সিএএ অনুযায়ী নাগরিকত্ব? 
নাকি বাংলাদেশ থেকে যে হিন্দুরাই এসেছে, তারা আবেদন করলেই পেয়ে নাগরিকত্ব যাবে? এই প্রশ্ন সকলের মধ্যে গুঞ্জরিত। তাই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক আর একবার বিভ্রান্তি কাটাতে এই বিষয়টি স্পষ্ট করে ঘোষণা করে দিক। বঙ্গবিজেপির নেতাদের কথা শুনেই কিন্তু স্পষ্ট যে, তারাও আসলে ১০০ শতাংশ জানেই না কী হতে চলেছে ভবিষ্যতে! 
যারা সিএএ অনুযায়ীও আবেদন করে নাগরিকত্ব পাবে না, তাদের বেআইনি নাগরিক চিহ্নিত করা 
হলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? সাধারণ নিয়ম হওয়ার কথা তাদের পুশ ব্যাক করা হবে। অর্থাৎ সীমান্তে গিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হবে। এক্ষেত্রে ভারত সরকার যাদের বেআইনি নাগরিক তকমা দেবে, তাদের সকলকে বাংলাদেশ সরকার বিনা বাক্যব্যয়ে কি ফিরিয়ে নেবে? আন্তর্জাতিক  নিয়মটি ঠিক কী? এটাও স্পষ্ট করে দেওয়া হোক। অর্থাৎ বাংলাদেশ যদি বলে, আমরা তো মনে করি না ওরা বাংলাদেশ থেকে গিয়েছে ভারতে। অতএব আমরা কেন ওদের ফিরিয়ে নেব? এরকম পরিস্থিতি হলে ভারত সরকারের কী করণীয়? 
পরবর্তী  প্রশ্ন, যাদের নাম বাদ যাবে, যতদিন না তাদের নিয়ে কোনও একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হবে এবং পদক্ষেপ গ্রহণ করবে কেন্দ্রীয় সরকার, ততদিন পর্যন্ত এই বাদ যাওয়া মানুষদের স্ট্যাটাস কী হবে? তারা কি ভারত ও রাজ্য সরকারের সবরকম সরকারি পরিষেবা পাবে? তারা বাংলাদেশ থেকে এসে যদি নিজেদের বাড়িঘর তৈরি করে সেখানে বসবাস করছে, তাহলে সেখানেই কি যথারীতি বসবাস করতে পারবে? 
ধরা যাক সরকারি, বেসরকারি কর্মরত অনেকের পরিচয় জানা গেল যে, তারা বাংলাদেশ থেকে আগত এবং ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম নেই, এবং নামও বাদ গিয়েছে, তাদের নিয়ে কী করবে সরকার? তারা ওই চাকরি করতেই থাকবে? তাদের পুত্রকন্যারা স্কুল কলেজে পড়তেই থাকবে?  যাদের বাংলাদেশ থেকে এসে ভারতের নাগরিকদের সঙ্গে বিবাহ হয়েছে, তাদের নাম যদি তালিকা থেকে বাদ পড়ে, তাহলে তারা কি ভারতের নাগরিক থাকবে না? ভারতীয় নাগরিকের স্ত্রী হিসেবে নথিভুক্ত থাকার পরও তাদের স্ট্যাটাস কী হবে? 
এই প্রতিটি প্রশ্ন লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রবলভাবে তাড়িত করছে। অসম্ভব টেনশন তৈরি হয়েছে 
দিকে দিকে। 
অসংখ্য মানুষের মনে উদিত হওয়া এই প্রতিটি প্রশ্নের স্পষ্ট এবং স্বচ্ছ জবাব দেওয়া দরকার এখনই। একদিকে বিএলও যেমন ফর্ম দিচ্ছে এবং ফেরত নিচ্ছে, তেমন চলুক। কিন্তু এবার নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে যৌথভাবে গোটা প্রক্রিয়াটির সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ঘোষণা করে দেওয়া হোক যে, এরপর কী কী করা হবে। 
অর্থাৎ নাম বাদ যাওয়ার পর কী পদ্ধতি। কার কী কী অধিকার বজায় থাকবে যথারীতি। কার অধিকার থাকবে না। যেটাই সরকার পরিকল্পনা করেছে আইন অনুযায়ী, সেটাই জানিয়ে দিক। তাহলে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কটা অন্তত কমবে। 
সমস্যা হল নির্বাচন কমিশনের এই ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় সবথেকে বেশি যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, সেটি হল, নাগরিকত্ব হারানো। ভারতীয়দের মধ্যেও আতঙ্ক রয়েছে। অর্থাৎ কী জানি বাবা কোন কাগজ চাইবে, সেই কাগজ আছে কি না, যদি না থাকে কী করব! ইত্যাদি। 
মোদি সরকারের একটি বিস্ময়কর নেশা রয়েছে। সেটি হল জনগণকে ভয় দেখিয়ে তাদের দারুণ মজা হয়। নোটবাতিল হোক, এই কার্ড সেই কার্ড লিংক করা হোক, করোনা ভাইরাসের সার্টিফিকেট সঙ্গে রাখতে হবে হোক ইত্যাদি। একটু অজুহাত পেলেই  সরকার নাগরিকদের ভয় দেখায়! অস্থিরতা তৈরি করে। 
সরকার নির্বাচিত হয় মানুষকে অভয় দেওয়ার জন্য। এই যে আমরা সরকারে এসেছি। আমরা তোমাদের সমস্যা দূর করব। কিন্তু এই সরকারটির প্রিয় খেলাই হল মানুষকে ভয়ে ভয়ে রাখা! কী কারণ কে জানে! অবৈধ নাগরিকদের নাম বাদ দিয়ে দিন। পাঠিয়ে দিন অন্য দেশে। কিন্তু বৈধ নাগরিকদের আতঙ্ক হলে তাদের পাশে একটু দাঁড়াবেন তো রে বাবা! হাবিজাবি বিষয়ে এত কথা বলেন সারা বছর ধরে। আর এই প্রশ্নগুলির সহজ উত্তর দিয়ে বিভ্রান্তি মিটিয়ে আতঙ্ক সমাপ্তি করতে পারছেন না! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ