Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অপ্রিয় হলেও সত্যি

ভালো থাকার চাবিকাঠি কী? নিঃসন্দেহে সর্বাগ্রে সুস্বাস্থ্য। এক্ষেত্রে উদাহরণ হতে পারেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই। নিয়মিত শরীর চর্চা, সঙ্গে সুষম ও পুষ্টিকর খাবার সহযোগে এই ৭৫-এর দোরগোড়াতেও যে প্রধানমন্ত্রীকে চাক্ষুষ করা যায়, তা অনেকের কাছেই দৃষ্টান্তস্বরূপ।

অপ্রিয় হলেও সত্যি
  • ২২ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ভালো থাকার চাবিকাঠি কী? নিঃসন্দেহে সর্বাগ্রে সুস্বাস্থ্য। এক্ষেত্রে উদাহরণ হতে পারেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই। নিয়মিত শরীর চর্চা, সঙ্গে সুষম ও পুষ্টিকর খাবার সহযোগে এই ৭৫-এর দোরগোড়াতেও যে প্রধানমন্ত্রীকে চাক্ষুষ করা যায়, তা অনেকের কাছেই দৃষ্টান্তস্বরূপ। এবার তাঁর অনুপ্রেরণায় রীতিমতো ‘স্বাস্থ্য বিপ্লব’ ঘটিয়ে সংসদের ক্যান্টিনে জায়গা করে নিতে চলেছে সেইসব স্বাস্থ্যকর খাবার, যেখানে কার্বোহাইড্রেট, সোডিয়ামের পরিমাণ থাকবে কম, অথচ তা হবে শরীরের জন্য উপকারী উপাদান ও ক্যালোরিতে সমৃদ্ধ। নতুন খাদ্য তালিকায় থাকছে রাগি, জোয়ার, বাজরার উপমা, রুটি, মুগ ডালের চিল্লা, গ্রিল মাছ, মুরগির মাংস, আনাজ, ফাইবার সমৃদ্ধ স্যালাড, প্রোটিন ভরা স্যুপ। থাকছে আমপানা শরবত, রোস্টেড টম্যাটো, গ্রিন টি বা ভেষজ চা ইত্যাদি। প্রতিটি খাদ্যের গায়ে ক্যালোরির পরিমাণেরও উল্লেখ থাকবে। ভারতীয় গণতন্ত্রে সংসদের গুরুত্ব অপরিসীম। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আইন প্রণয়ন, জাতীয় স্বার্থ জড়িত বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্কে অংশ নেওয়া, সরকারের কাজকর্মের উপর তীক্ষ্ণ নজর রাখা সাংসদদের প্রধান কাজ। সংসদের অধিবেশন চলাকালীন দীর্ঘ সময় ধরে মননের এই চর্চার জন্য শারীরিকভাবে সুস্থ থাকাটা জরুরি। তার জন্য নিঃসন্দেহে প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর খাবারের। সংসদের ক্যান্টিনে সেই স্বাস্থ্য সচেতন খাবারের বন্দোবস্ত করার জন্য অবশ্যই অভিনন্দন প্রাপ্য সরকারের। 

Advertisement

কিন্তু এখানেই একটা প্রশ্ন বড় আকারে দেখা দিয়েছে। এগারো বছর ধরে সরকারের শীর্ষ পদে থাকা নরেন্দ্র মোদি কি শুধু সাংসদদের প্রধানমন্ত্রী, না গোটা দেশের মানুষের? এর উত্তর নিয়ে কোনও বিরোধ না থাকলেও মোদি জমানায় আম জনতার স্বার্থরক্ষায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। স্বাস্থ্যই সম্পদ যেমন ধ্রুব সত্য, তেমনই খাদ্য নিরাপত্তাও দেশের সব মানুষের সমান অধিকার। পুষ্টিকর খাদ্যের কথা আপাতত কুলুঙ্গিতে তোলা থাক। ভারতের সব মানুষ কি দু’বেলা খেতে পান? বছর দুয়েক আগে রাষ্ট্রসঙ্ঘের দেওয়া তথ্য বলছে, ভারতে চারজন নাগরিকের তিনজনই যথেষ্ট পুষ্টিকর খাবার পান না। আমেরিকা বা ব্রিটেনের মতো উন্নত দেশে পেটভরে পুষ্টিকর খাবার খেতে অসমর্থ বড়জোর এক-দু’শতাংশ মানুষ। ভারতে ৭৪ শতাংশের সেই ক্ষমতা নেই। খাদ্য নিরাপত্তায় ভারত বাংলাদেশেরও পিছনে। বিপন্নতার সঙ্গে এই ছবি লজ্জারও। দেশে খাদ্য সঙ্কট যে তীব্র তার প্রমাণ মেলে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ৮১ কোটি মানুষকে রেশনের মাধ্যমে খাদ্যপণ্য দেওয়ার সিদ্ধান্তে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের একটি তথ্য জানিয়েছে, এ দেশে ১০০ কোটির বেশি মানুষ ইচ্ছামতো প্রয়োজনীয় খাদ্য কিনতে পারেন না। এই নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ‘মন কি বাত’ শোনা যায় না! 
মোদি জমানায় অপুষ্টি ও তার ফলাফলের চেহারাটাও খাদ্য নিরাপত্তার মতোই ভয়াবহ। রাষ্ট্রসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (ফাও) প্রতিবেদন অনুসারে ভারতে প্রায় ২০ কোটি অপুষ্টির শিকার মানুষ বসবাস করেন। এই সংখ্যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। যা ভারতীয় জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ। আর ক্ষুধা সূচকে বিশ্বের ১২৭টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০৫। অপুষ্টির হার সবচেয়ে বেশি শিশুদের মধ্যে। বয়সের তুলনায় কম ওজনের শিশু ভারতে ১৮.৭ শতাংশ। আর বয়সের তুলনায় কম উচ্চতাসম্পন্ন শিশুর হার ৩৫.৫ শতাংশ। অপুষ্টির কারণে এদেশে শিশু মৃত্যুর হারও নজরকাড়া। দুর্ভাগ্যের হলেও সত্যি যে, এই লজ্জাজনক পরিস্থিতি সত্ত্বেও ভারতে জাতীয় গড় আয়ের মাত্র ১ শতাংশ অর্থ স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করা হয়। হওয়া উচিত কমপক্ষে ৫ শতাংশ। ফলে প্রশ্ন তো উঠবেই। মূল্যবৃদ্ধিজনিত কারণে দেশের সাংসদদের বেতন একলাফে বেড়ে মাসে ১.২৪ লক্ষ টাকা করা হলেও কেন ১০০ দিনের কাজের মজুরি বাড়ে না, কৃষকরা ফসলের ন্যায্য মূল্য পান না— সেই প্রশ্ন উঠবেই। সাংসদদের সংখ্যাবৃদ্ধি ও সুখস্বাচ্ছন্দ্যের জন্য প্রায় ১২০০ কোটি টাকা খরচ করে নতুন সংসদ ভবন তৈরি হলেও কেন এখনও দেশের সব বাড়িতে পাকা শৌচাগার নেই, পানীয় জল পৌঁছয় না? কেন সকলের পাকা বাড়ি নেই, বিদ্যুৎ সংযোগ নেই— সেই প্রশ্নও উঠছে। সুস্বাস্থ্যের লক্ষ্যে সাংসদদের সুষম ও পুষ্টিকর খাবারের বন্দোবস্ত হওয়ায় আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু আচ্ছে দিনের স্বপ্ন দেখিয়ে আম জনতার জন্য কী জুটছে? দেশের একটা অংশের মানুষ কেন আজও দু’বেলা পেট ভরা খাবার পাবেন না— সেই প্রশ্নের উত্তর তো প্রধানমন্ত্রীকেই দিতে হবে। একটি জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রের কাজের অগ্রাধিকারের তালিকায় কোনটা থাকা উচিত তা তো সরকারের নীতি নির্ধারকদেরই ঠিক করতে হবে। আর প্রধানমন্ত্রীকে প্রমাণ করতে হবে, ভেদাভেদ নেই, দেশের সব মানুষ তাঁর কাছে সমান। সকলের প্রধানমন্ত্রী। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ