


নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: মতুয়া ঠাকুরবাড়িতে‘অধিকার’ কায়েম নিয়ে দ্বন্দ্বের ঘটনা বারেবারে সামনে এসেছে। রবিবার থেকে ‘দখলদারি’তে লেগেছে রাজনৈতিক রং। এরজেরে অস্বস্তি বেড়েছে গেরুয়া শিবিরে। সোমবার সকালে ভাই তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরকে নিয়ে গাইঘাটার বিজেপি বিধায়ক সুব্রত ঠাকুরের মন্তব্য ঘিরে বেড়েছে দ্বন্দ্ব। দাদা সুব্রত ঠাকুরের কথায়, শান্তনু ঠাকুর নিজের স্ত্রীকে গাইঘাটা বিধানসভা থেকে প্রার্থী করতে চাইছেন। তাই আমার বিরুদ্ধে কুৎসা করা হচ্ছে। এখানেই থেমে থাকেননি সুব্রত। বললেন, বছরের পর বছর শান্তনু মতুয়া সংগঠনের টাকা নয়ছয় করছেন। আমি প্রথম থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছি। দুই ভাইয়ের এই দ্বন্দ্ব ‘পর্যবেক্ষণ’ করছেন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ মমতা ঠাকুর। তাঁর কথায়, ‘ছাব্বিশে খেলা হবে’! এই বিষয়ে শান্তনুবাবুর প্রতিক্রিয়া জানতে তাঁকে বারবার ফোন, টেক্সট এবং হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে করা হলেও, তিনি কোনও উত্তর দেননি। দুই ভাইয়ের এই দ্বন্দ্বে আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘অনুপ্রবেশ’ করতে না চাইলেও, এদিন দুপুরে ঠাকুরবাড়িতে এসেছিলেন বনগাঁ সাংগঠনিক জেলার বিজেপি সভাপতি বিকাশ ঘোষ। তিনি বলেন, দল বিষয়টি দেখছে।
ঠাকুরবাড়িতে ভাইয়ে-ভাইয়ে দ্বন্দ্বের ঘটনা নতুন কিছু নয়। দেশভাগের আগে অধুনা খুলনায় তৈরি হয় মতুয়া মহাসঙ্ঘ। দেশভাগের পর সঙ্ঘাধিপতি হন প্রমথরঞ্জন ঠাকুর। ১৯৮০ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর সঙ্ঘাধিপতি হন তাঁর বড় ছেলে কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর। ২০১০ সালে গঠিত হয় অল ইন্ডিয়া মতুয়া মহাসঙ্ঘ। মতুয়া সংগঠন থেকে ঠাকুরবাড়ির অধিকার-ক্ষমতা নিয়ে ওই সময়েও লড়াই ছিল কপিলকৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর ভাই মঞ্জুলকৃষ্ণ ঠাকুরের। কপিলকৃষ্ণ ছিলেন বামপন্থী। আর মঞ্জুল ছিলেন ডানপন্থী। ২০১৪ সালে কপিলকৃষ্ণ ঠাকুরের মৃত্যুর পর অল ইন্ডিয়া মতুয়া মহাসঙ্ঘের সঙ্ঘাধিপতি হন তাঁর স্ত্রী মমতা ঠাকুর। সঙ্ঘাধিপতি হিসেবে রিটার্ন ফাইল থেকে সবকিছুই এখনও তিনি করেন। ২০১৯ সালেই প্রথম বিজেপির টিকিটে বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হন মঞ্জুল পুত্র শান্তনু ঠাকুর। মতুয়াদের নিয়ে বিজেপির সংগঠনটা প্রথম শুরু করেন শান্তনুর দাদা সুব্রত ঠাকুর। একদিকে সাংসদ, পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী—ক্ষমতার আবর্তে থেকে ধীরে ধীরে ঠাকুরবাড়িতে প্রভাব বাড়াতে থাকেন শান্তনু। বাবা ও দাদাকে টপকে তিনিই বিজেপি প্রভাবিত অল ইন্ডিয়া মতুয়া মহাসঙ্ঘের সঙ্ঘাধিপতি হন। মহাসঙ্ঘাধিপতি হন সুব্রত।
শুধু নামেই গালভরা পদ, কিন্তু কোনও অধিকার বা ক্ষমতা নেই বলে অভিযোগ সুব্রতর। তাঁর দাবি, ক্ষমতা ও অধিকার কুক্ষিগত করে ঠাকুরবাড়িতে একচ্ছত্র হয়ে ওঠেন শান্তনু। গোটা বছর ধরেই মতুয়া সদস্য হওয়ার কার্ড পিছু লক্ষ লক্ষ টাকা ওঠে। এছাড়াও সারা বছর ভক্তদের প্রণামীর টাকাও রয়েছে। লক্ষ লক্ষ টাকার পুরোটাই শান্তনু ঠাকুর অধিকার ও ক্ষমতা প্রয়োগ করে আত্মসাৎ করছে। সম্প্রতি এসআইআর নিয়ে তোড়জোড় শুরু হতেই ময়দানে নেমে পড়েন শান্তনু ও সুব্রত। মতুয়াদের শংসাপত্র দিতে আলাদাভাবে ক্যাম্প শুরু করেন। মতুয়া কার্ড এবং ধর্মীয় শংসাপত্রের জন্য মোট ২০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে শান্তনুর ক্যাম্পে। আর সুব্রতর ক্যাম্পে নেওয়া হচ্ছে ১৬০ টাকা। সুব্রত বলেন, ঠাকুরবাড়িতে থ্রেট কালচার এবং দালালরাজ চালু করেছেন শান্তনু। মতুয়াভক্তদের টাকা সংগঠনের নাম করে নিয়ে নয়ছয় করছেন। কোনও হিসাব দেখাননি। ঘুরপথে তাঁর স্ত্রীর নামে মাতৃসেনা ট্রাস্টের অ্যাকাউন্টে টাকা চলে যাচ্ছে। প্রতিবাদ করায় অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। আমিই ঠাকুরবাড়িতে বিজেপিকে এনেছি। কিন্তু এখন আমার সঙ্গে যা হচ্ছে, তার বিহিত দরকার। আগামী বিধানসভা ভোটে গাইঘাটা থেকে নিজের স্ত্রী সোমা ঠাকুরকে বিজেপির প্রার্থী করবেন বলেই এসব হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে শান্তনুর স্ত্রী সোমা ঠাকুর বলেন,আমি ঠাকুরবাড়ির বউ হিসেবে বড়মার আদর্শকে অনুসরণ করে চলি। দাদাভাই কী বলেছেন, সেটা জানি না। পাল্টা মমতা ঠাকুরের দাবি, সুব্রতর সমস্ত অভিযোগ, ১০০ শতাংশ সঠিক।