নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: ২৩৩টি দেশের মধ্যে ৪৪টি দেশ ২০২০ সালের পর থেকে সেন্সাস করতে পারেনি। কারা সেই তালিকায়? ইয়েমেন, সিরিয়া, মায়ানমার, ইউক্রেন, শ্রীলঙ্কা, আফ্রিকার একঝাঁক দেশ ইত্যাদি। এই সেন্সাস না থাকা দেশগুলির মধ্যে বিশেষ নাম—ভারত। বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দাবি, ১১ বছরের সুশাসনের ঘোষণা এবং বিকশিত ভারতের নানাবিধ স্লোগান দিলেও সেন্সাস করতে পারেনি মোদি সরকার। পাঁচ বছরেও না। বারবার পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে জনগণনা। ২০২৪’এর অক্টোবর মাসে বলা হয়েছিল, ২০২৫ সালেই হবে সেন্সাস। বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক যে তারিখ ঘোষণা করল, তাতে চলতি বছরের উচ্চবাচ্য নেই। বরং আসন্ন জনগণনার নাম দেওয়া হয়েছে, পপুলেশন সেন্সাস ২০২৭। অর্থাৎ, প্রায় দু’বছর পর মার্চ মাসে শুরু হবে সেন্সাসের কাজ। শুধুমাত্র উত্তরাখণ্ড, কাশ্মীর, লাদাখ এবং হিমাচল প্রদেশের মতো হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত রাজ্যগুলিতে ২০২৬ সালের অক্টোবর মাস থেকে শুরু হবে জনগণনার কাজ। নজর করার মতো বিষয় হল, মার্চ মাসে প্রায় সব রাজ্যে বোর্ড পরীক্ষা হয়। প্রায় গোটা মাস ইনভিজিলেশন, আর তারপর খাতা দেখা। শিক্ষক-শিক্ষিকারা ওই সময়টা চরম ব্যস্ত থাকেন। ফলে ১ মার্চ সেন্সাস শুরু হলে শিক্ষকরা কীভাবে সময় দেবেন? এই প্রশ্ন কিন্তু উঠছে। বিগত সব সেন্সাস ১ এপ্রিল শুরু হয়েছিল। সুতরাং আদৌ কি ‘রেফারেন্স তারিখ’ ১ মার্চ হবে? নাকি তারিখের ফের বদল আসন্ন?
যদিও পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, আরও দেরি করাটা কেন্দ্রের পক্ষেই অস্বস্তির। সঠিক সংখ্যক ভারতবাসীর কাছে সরকারি সুবিধা না পৌঁছনোর অভিযোগ লাগাতার উঠছে। সেন্সাস রিপোর্ট হাতে না আসা পর্যন্ত সেই অঙ্কের উত্তর মিলবে না। ভারতের সেন্সাস শেষবার হয়েছিল ২০১০ সালে। রিপোর্ট প্রকাশিত হয় ২০১১’তে। অর্থাৎ সেন্সাস-২০১১ হল শেষতম সরকারিভাবে কাগজে-কলমে দেশের জনসংখ্যার হিসেব। ১৫ বছর ধরে জনসংখ্যা ঠিক কত বেড়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান ভারত সরকারের কাছে নেই। আপাতত আরও তিন বছর এভাবেই চলবে। কারণ ২০২৮ সালের আগে রিপোর্ট প্রকাশিত হবে না। সেন্সাস রিপোর্ট প্রকাশিত না হলে ডিলিমিটেশনও সংঘটিত করা সম্ভব নয়। আর যতদিন না ডিলিমিটেশন হচ্ছে ততদিন কোন আইন চালু হবে না? মহিলা সংরক্ষণ আইন, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে যা মোদি সরকার সংসদে পাশ করিয়ে নিয়েছে। আইনও হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সেন্সাস বিলম্বে তা কার্যকর হয়নি। কবে চালু হবে এই সংরক্ষণ, তাও অনিশ্চিত।
কেন সেন্সাসে দেরি? নতুন কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে জাতিগণনাকে। রাহুল গান্ধী, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদব, এম কে স্ট্যালিনের মতো মহাজোট ‘ইন্ডিয়া’র বিভিন্ন দল দীর্ঘদিন ধরেই কাস্ট সেন্সাসের দাবিতে সরব। কিন্তু মোদি সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। উল্টে এই দাবি যারা করছে, তাদের বিরুদ্ধে বিভাজনে উস্কানির অভিযোগ তোলা হয়েছে। কিন্তু লোকসভা ভোটে অপ্রত্যাশিতভাবে খারাপ ফল হওয়ায় নরেন্দ্র মোদি ১৮০ ডিগ্রি অবস্থান বদল করেছেন। এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কাস্ট সেন্সাস হবে। এখন আবার সেই বিজেপি ও কেন্দ্র কাস্ট সেন্সাসকে মাস্টারস্ট্রোক আখ্যা দিচ্ছে! এক্ষেত্রে অবশ্য শরিক রাজনীতিও রয়েছে। কারণ, বিহারে নীতীশ কুমার আগে থেকেই জাতিগণনা সেরে ফেলেছেন। ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির ভিত যে এতে মজবুত হবে, তা নিয়ে সংশয় ছিল না নীতীশের। জোটের ভরসায় সরকারে আসার পর সেই রাজনীতিই মাস্টারস্ট্রোক হয়ে দেখা দিয়েছে নরেন্দ্র মোদির কাছে। অথচ, জাতিগণনার কোনও ব্যবস্থা সেন্সাস প্রক্রিয়ায় নেই। তাই এই সিদ্ধান্ত কার্যকরে সবার আগে ১৯৪৮ সালের সেন্সাস আইনের সংশোধন করতে হবে। জওহরলাল নেহরু ঐক্যবদ্ধ ভারতের স্বপ্নে ব্রিটিশ শাসনের চালু করা যে কাস্ট সেন্সাসের বিপক্ষে ছিলেন, সেটাই আবার ফিরবে। ২০২৭’এ।