শিবাজী চক্রবর্তী, কলকাতা: উদভ্রান্তের মতো ছেলেটা ছুটছে। খালি পা। রেল লাইন, স্টোন চিপ, ভ্রুক্ষেপ নেই কোনওকিছুতেই। বিধাননগর স্টেশন পেরিয়ে আরও একটু। আরও..। ওই তো! ছোট্ট জটলা। মুখ থুবড়ে পড়ে একটা মানুষ। পড়ে থাকা ব্যাগটা চেনা মনে হচ্ছে না? শিরদাঁড়ায় ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। দু’ভাগ হয়ে জায়গা করে দেয় ভিড়। ত্রিনাথ ঘোষের রক্তমাখা, দলাপাকানো শরীর দেখে থমকায় ছেলেটা। অস্ফুটে বাবা বলার ফাঁকেই চোখের সামনে অন্ধকার। টাল খেয়ে পড়ার আগেই জড়িয়ে ধরেছিল কয়েকজোড়া শক্ত হাত। প্রতিটা মুহূর্ত যেন বিভীষিকা। ঘুমের মধ্যে আজও চমকে ওঠে তুষার। বালিশের পাশে যত্নে রাখা ফুটবল আঁকড়ে ধরে। বাবা হারানোর বেদনা, নির্ঘুম রাত, অভাব, যন্ত্রণার নীরব সাক্ষী ওই ফুটবলই।
আগরপাড়ার তুষার ঘোষের জীবনযুদ্ধ রুপোলি পর্দাকেও হার মানায়। গোঁফের রেখা স্পষ্ট হয়নি এখনও। তাতে কী! ছোট কাঁধে বড় দায়িত্ব হাজির। আগরপাড়ার ভাড়া বাড়িতে কোনওরকমে মাথা গুঁজে থাকা। মা ছাপোষা গৃহবধূ। চলছিল এভাবেই। কিন্তু ট্রেন দুর্ঘটনায় বাবার মৃত্যুর পর সব তছনছ। সংসার চালানোই দায়। দাদা তুহিন গোলকিপার। খেপের টাকা তুলে দেয় মায়ের হাতে। আর তুষার? বেঙ্গল সুপার লিগে উত্তর ২৪ পরগনার হয়ে ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে তরুণ উইং হাফ। কোচ লালকমল ভৌমিক মোহন বাগানের প্রাক্তনী। আগলে রাখতে জানেন। লালকমল বললেন, ‘তুষার অসম্ভব লড়াকু। দারুণ প্রতিভা। এই ছেলেটা লম্বা রেসের ঘোড়া।’ ঘরোয়া লিগে রাজস্থানের হয়েও দাপিয়ে খেলেছে লালকমলের ছাত্র।
এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী তুষার। হাড়ভাঙা প্র্যাকটিস, ম্যাচের পর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ে শরীর। তবু জিততে ওকে হবেই। ফুটবলকে পাশে রেখেই বইয়ের পাতা ওল্টায় ১৮ বছরের ছেলেটা। চিলতে ঘরে কান পাতলে অদৃশ্য ক্যাচলাইন ভেসে আসে— আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ, স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি।