সুদীপ্ত রায়চৌধুরী, চাকদহ: ‘ইভিএম মেশিনে নামগুলি দেখলেই গত পাঁচ বছরে আমাদের জন্য কে, কী করেছে, সব মনে পড়ে। তারপর সবটা আমাদের হাতে।’ বনগ্রাম রোডের ধারে এক চায়ের দোকানের নড়বড়ে টুলটাকে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে সেট করতে করতে কথাগুলি বলছিলেন দিলীপ পাল। পাশের বেঞ্চে বসেছিলেন রবি কর্মকার। থাকেন সিলিন্দায়। চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে তলানিটা রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে বললেন, ‘গতবার জেতার পর আর বিধায়কবাবুর দেখা মেলেনি। উনি তো থাকতেন হরিণঘাটায়। বাধ্য হয়ে যে কোনো দরকারে ছুটে যেতাম তৃণমূলের যীশুর কাছে। আমাদের কাউকে কখনও ও ফেরায়নি। সব সময় পাশে ছিল। এবারে আমাদের পালা।’
প্রবল গরম। মনে হতে পারে যেন ‘লু’ বইছে। চাকদহে ভোটের হাওয়া এবারে কোন দিকে, তারই একটা আভাস পেতে এই সফর। ঘোষিত পার্টিকর্মী না হলে অনেকেই নিজের মনের কথা অপরিচিতদের বলতে চান না। কিন্তু নদীয়া জেলার এই বিধানসভার অভিজ্ঞতা অনেকটাই আলাদা। চাঁদুরিয়া, ঘেঁটুগাছি থেকে তাতলা পঞ্চায়েতের বিভিন্ন এলাকা—সর্বত্র লোকের মুখে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী শুভঙ্কর সিংহের (যীশু) নাম। অন্য প্রার্থীরা? পালপাড়ার বাসিন্দা অনীক সরকারের কথায়, ‘বাকি দলগুলিও আছে। কিন্তু সারা বছর পাশে না থেকে শুধু ভোটের সময় ভোট চাইতে এলে কী লাভ? এবারে চাকদহে ফুল বদলে যাবে।’
গতবারের হারানো আসন পুনরুদ্ধারে ঘাসফুল শিবির যে অল আউট নেমে পড়েছে, তার প্রমাণ চোখে পড়েছিল ট্রেনে বসেই। শিমুরালি, পালপাড়া হয়ে চাকদহে ঢোকার আগে পর্যন্ত দেওয়ালে দেওয়ালে শুধুই তৃণমূল। শহরাঞ্চলেও সিপিএম, বিজেপির দেওয়াল লিখন বা হোর্ডিং দূরবীন দিয়েও চোখে পড়ে না। পুরসভা থেকে পঞ্চায়েত এলাকা, সর্বত্র উন্নয়নকে হাতিয়ার করে জোরকদমে প্রচার চালাচ্ছে তৃণমূল। ছাত্র-যুব-মহিলা ব্রিগেডের পাশাপাশি দলের সিনিয়র নেতারাও রোদ-গরম উপেক্ষা করে প্রার্থীর সঙ্গে পা মেলাচ্ছেন। শুভঙ্কর বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চাকদহে যেভাবে বিশেষ নজর দিয়েছেন, সেই কথাই মানুষজনকে বলছি। পথশ্রী প্রকল্পে একাধিক রাস্তা তৈরির অনুমোদন মিলেছে। চৌমাথা থেকে বসন্তকুমারী বালিকা বিদ্যালয় পর্যন্ত রাস্তায় প্রতি বছর বর্ষার সময় জল জমে থাকে। সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ীরা নাজেহাল হন। ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে সেই রাস্তাটি সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকাগুলিতেও প্রচুর ঢালাই রাস্তা হয়েছে। গঙ্গার পরিশ্রুত পানীয় জল বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিতে জলের লাইন বসছে। আবর্জনা সংক্রান্ত সমস্যা মেটানোর জন্য একটি প্লান্ট তৈরি করা হচ্ছে। এবারে জোড়াফুল ফুটিয়ে এই আসন দিদিকে উপহার দেবে চাকদহবাসী।’
উন্নয়নের আশ্বাসে ভোটারদের মন গলবে না বলে দাবি বিজেপি প্রার্থী বঙ্কিম ঘোষের। তিনি বলেন, ‘যেভাবে শাসকদলের হাতে থাকা চাকদহ পুরসভা রাজ্য সরকার ভেঙে দিতে বাধ্য হয়েছে, তা এখনকার মানুষজন দেখেছে। রেলগেটের কাছে দখলদারদের জন্য নিত্যদিন যানজট হয়। আমরা জিতলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হবে।’ বিদায়ী বিধায়ক জেতার দাবি করলেও এলাকার বাতাসে ভাসছে অন্য কথা। এতদিন কেন এই সমস্যাগুলি মেটাতে পদক্ষেপ নেননি, সেই প্রশ্ন উঠছে। গতবার জেতার পর সেভাবে আর তাঁকে পাননি চাকদহের মানুষজন। প্রচারে বেরিয়ে স্থানীয়দের সেই ক্ষোভের আঁচ পাচ্ছেন বাম থেকে রাম শিবিরে আসা এই নেতা। ক্ষোভ দানা বেঁধেছে গেরুয়া শিবিরের নীচুতলায়। বিজেপির দলীয় কার্যালয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে রাগে গজগজ করছিলেন এক মণ্ডল সভাপতি। নাম লেখা যাবে না শর্তে বললেন, ‘এবারে প্রার্থীকে জেতাতে বিহার ও উত্তরপ্রদেশের একাধিক হেভিওয়েট নেতাকে আনা হয়েছে। তাঁদের নির্দেশ মেনে চলতে হচ্ছে। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে আমরা যেসব সমস্যা মুখোমুখি হচ্ছি, সেগুলি কেউ শুনতেই চাইছেন না।’
নীচুতলার ক্ষোভ-বিক্ষোভের পাশাপাশি এসআইআর ইস্যুও ভাবাচ্ছে বিজেপিকে। মতুয়া অধ্যুষিত এই বিধানসভা এলাকায় তিন দফায় ২৯ হাজার ৮৩১ জনের নাম বাদ পড়েছে। গত নির্বাচনে বিজেপির জয়ের ব্যবধান ছিল ১১ হাজার ৬৮০। ফলে ভোটের অঙ্ক যে এবারে বেশ জটিল, তা মানছে সব শিবিরই। এসআইআর নিয়ে ভুক্তভোগী মানুষদের পাশে থাকতে এবারে বিশেষ টিম তৈরি করেছে তৃণমূল। পাশাপাশি, এই ইস্যুতে সাধারণ মানুষ যেভাবে হেনস্তা হয়েছেন, তা নিয়ে সর্বাত্মক প্রচারের স্ট্র্যাটেজি বাকি দলগুলির তুলনায় এগিয়ে রাখছে তৃণমূলকে। প্রচারে কয়েক যোজন পিছিয়ে থাকলেও বামেদের ভোট ঘরে ফেরানোর লক্ষ্যে ছুটছেন সিপিএম প্রার্থী নারায়ণ দাশগুপ্ত।
শেষ পর্যন্ত গণদেবতার রায় কার ঝুলিতে আসবে? উত্তর মিলবে ৪ মে। প্রচারে তৃণমূল প্রার্থী শুভঙ্কর সিংহ (যীশু)।-নিজস্ব চিত্র