পি চিদম্বরম: আজ বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জি জিনপিং। অন্যরা হলেন ভ্লাদিমির পুতিন এবং বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। ভালো হোক বা মন্দ, তাঁদের কথা এবং কাজের প্রভাব বিস্তৃত সেখানেও—যেখানে তাঁদের সরকার চলে বা তাঁরা যে দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সেই গণ্ডি ছাড়িয়েই। নরেন্দ্র মোদি তাঁদেরই একজন হয়ে উঠতে চান—তাঁর দল দাবি করে যে, তিনি ইতিমধ্যেই তাঁদের মধ্যে অন্যতম—কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা
আমেরিকা বা চীনের তুলনায় ভারতের অর্থনীতি (আকারের দিক থেকে) খর্বকায়। মাথাপিছু আয়ের নিরিখে রাশিয়া এবং ইজরায়েলের তুলনায় ভারতের অর্থনীতি খুবই ক্ষুদ্র। নিম্নোক্ত তথ্য দ্রষ্টব্য:
আমেরিকার অর্থনীতি ভারতের চেয়ে ৭ গুণ বড়ো এবং চীনের অর্থনীতি বড়ো সাড়ে ৪ গুণ। ভারত সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল বৃহৎ অর্থনীতি হতে পারে, কিন্তু আমাদের জিডিপি দ্বিগুণ করতেও আরও ১০ বছর সময় লাগবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের জিডিপি বৃদ্ধির হার তুলনায় কম। কিন্তু সেই কম বৃদ্ধির হারেও বৃহত্তর ভিত্তিতে এই অবসরে তাদের অর্থনীতির আকৃতি আরও বড়ো হয়ে যাবে। তার ফলে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এবং ভারত ও চীনের মধ্যে জিডিপির পরম ব্যবধান (অ্যাবসোলিউট গ্যাপ) আরও চওড়া হয়ে যেতে পারে। রাশিয়া এবং ইজরায়েলের জিডিপির আকার তুলনামূলকভাবে ছোটো হতে পারে তবু তারা ধনী দেশ। রাশিয়া ও ইজরায়েলের মাথাপিছু আয় ভারতের তুলনায় যথাক্রমে ৬ গুণ এবং ১৮ গুণ বৃহৎ। শুধু ভারতের বর্তমান শাসকরা ছাড়া, দুনিয়ার প্রতিটি নেতাই এই হিসেবটা সম্পর্কে অবগত।
জি-২ চমক
ভারতকে সম্মান করে সারা বিশ্ব। সবচেয়ে জনবহুল দেশ, এবং এর গণতন্ত্র, ইতিহাস, প্রাচীন সংস্কৃতি, শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার বিশেষ ভূমিকা, বাজারের আকার এবং সম্ভাবনার জন্যই ভারতের এই গুরুত্ব। ভারত একটি সুপারপাওয়ার বা পরাশক্তি—এই সম্মানের নেপথ্যে এমনকিছু নেই। বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিশ্বের দেশগুলির নিজ নিজ অংশীদারিত্ব রয়েছে। ভারতের অবস্থান এই যে, ‘যদি তুমি ভারতের বন্ধু হও তাহলে তোমাকে পাকিস্তানের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হতে হবে।’ ভারতের এই মনোভাব উপেক্ষা করেই তারা ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখবে।
এছাড়া দুনিয়া দ্রুত পালটে যাচ্ছে। ২০২৩ সালে, ভারত ঘোষণা করেছিল যে তারা জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজক। জি-২০ সভা এবং নেতাদের শীর্ষ সম্মেলন একটি বার্ষিক অনুষ্ঠান মাত্র। এর জন্য আয়োজক দেশ পর্যায়ক্রমে নির্ধারিত হয়। ২০২৪ সালে আয়োজক ছিল ব্রাজিল। চলতি নভেম্বর মাসে দক্ষিণ আফ্রিকা এই শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করবে। তারপর ২০২৬ সালের আয়োজক দেশের নাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। জি-২০ আয়োজন করা কোনও বড়ো বিষয় নয়; অন্যকোনও দেশ এটি নিয়ে মোটেই হইচই করে না।
জি-২০-এর চেয়ে জি-৮ এবং জি-৭ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখন, আমাদের কাছে আছে নতুন একটি জিনিস, সেটা হল জি-২। জিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের আগে এবং পরে, ডোনাল্ড ট্রাম্প মিস্টার জিনপিংকে সমান মর্যাদায় উন্নীত করেছেন! এই জিনিসটা তিনি নরেন্দ্র মোদির ক্ষেত্রে কখনোই করবেন না। ডোনাল্ড ট্রাম্প সোজাসাপটা বলে দেওয়ার লোক, জি জিনপিং যথারীতি রহস্যময়। ভারত বহু-মেরু বিশ্ব সম্পর্কে যাই বলুক না কেন, পৃথিবীতে সুপারপাওয়ার বা পরাশক্তি মাত্র দুটিই, রাশিয়া খুব পিছনে। বিগতদিনের ‘মার্কিন নিরাপত্তার সামনে অস্তিত্বগত হুমকি’ রহস্যজনকভাবে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। নয়া বন্ধুত্বের সঙ্গে, পথিপার্শ্বেইে পরিত্যক্ত হবে ‘কোয়াড’।
একটি বাস্তবতা পরীক্ষা করুন:
যুক্তরাষ্ট্র রেয়ার আর্থ এবং সয়াবিন নিয়ে চীনের সঙ্গে একটি মিনি-ট্রেড এগ্রিমেন্ট করেছে এবং
দুটি দেশ সম্ভবত টিকটক ইশ্যুরও সমাধান করবে। ২০২৫ সাল বরাবর মার্কিন-ভারত বাণিজ্য চুক্তি আলোচিত হয়েছে কিন্তু এখনও কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে একটি শুল্কযুদ্ধ ছিল (এক দেশ অন্য দেশের উপর প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপ করেছে)। কিন্তু, বুসানে বৈঠকের পর, নেতারা স্পষ্টতই একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছেন। তার উপলক্ষ প্রযুক্তি স্থানান্তর, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং পোর্ট ফি-সহ কিছু বিষয়। ঠিক হয়েছে উভয় দেশই পারস্পরিক শুল্ক হ্রাস করবে। ভারতের উপর যে শাস্তিমূলক শুল্ক চেপেছে সেটা কমানোর ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু কোনও পদক্ষেপ করেনি।
চীনা সংস্থাগুলির উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। রাশিয়ার তেল ক্রয়নীতি বহাল থাকলে ভারতীয় কোম্পানিগুলির উপরেও ওই নিষেধাজ্ঞা চাপবে।
• আমেরিকা চীনের পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার হ্রাস করেছে। একইভাবে, ২০১৯ সালে ভারত যে জেনারেলাইজড সিস্টেম অফ প্রেফারেন্সেস (জিএসপি) ভোগ করেছিল তা বাতিলকরণ চূড়ান্ত বলেই মনে হচ্ছে।
শীতল পরিস্থিতিতে
নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শেষ দেখা হয়েছিল গত ১৪ ফেব্রুয়ারি। এরপর, তিনবার মোদি-ট্রাম্প বৈঠক হতে পারত। প্রথমটি কানাডায় জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের পর। নরেন্দ্র মোদিকে ওয়াশিংটনে ‘স্টপ ওভার’ নেওয়ার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি তা গ্রহণ করেননি। আমার মনে হয়, ঠিকই করেছিলেন মোদিজি। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, গাজা শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের সময় মোদিজি মিশর সফরে যাননি। তৃতীয় সুযোগ ছিল ২০২৫ সালের অক্টোবরে। কুয়ালা লামপুরে ছিল আসিয়ান এবং ওই সম্পর্কিত শীর্ষ সম্মেলন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে, নরেন্দ্র মোদি ওই সমাবেশে ভার্চুয়ালি ভাষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আমার মনে হয়, এই সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় যে নরেন্দ্র মোদি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথোপকথনও এড়াতে আগ্রহী।
অনেকবারের মতো, ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, যুদ্ধ বন্ধে ভারত ও পাকিস্তানকে বাধ্য করতে ‘নো ট্রেড (বাণিজ্য বন্ধ করে দেব)’ হুমকি দিয়েছিলেন তিনি। আর তার জন্যই পাক-ভারত যুদ্ধ মাত্র চতুর্থ দিনে থেমে গিয়েছিল। ট্রাম্পের এই উপর্যুপরি দাবিটি নরেন্দ্র মোদি কিন্তু প্রকাশ্যে কিংবা সংসদেও নাকচ করে দেননি। তাছাড়া, নরেন্দ্র মোদি কখনও জি জিনপিংকেও মুখ ফুটে বলেননি যে, লালফৌজ ভারতীয় ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করেছে এবং তারা এখনও অবৈধ দখলদার।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জি জিনপিংয়ের মধ্যে আলিঙ্গনের ঘটনা জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং তাইওয়ানের সঙ্গে ভারতকেও অস্থির করে তুলেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত কার্যত একটি বন্ধুহীন দেশ। পশ্চিম এশীয় দেশগুলি ভারতকে বাদ দিয়েই, নিজেদের মধ্যে এবং ইজরায়েলের সঙ্গে নতুন ‘ব্যবস্থা (অ্যারেঞ্জমেন্ট)’ তৈরি করে নিচ্ছে। এখন কিছুটা নম্রতা অর্জনের এবং নীতি নির্ধারণের পথে ফেরার সময় আমাদের।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত