Bartaman Logo
২৮ মে, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

সেকাল ও একালের পুজো

আমরা যারা আগের প্রজন্মের মানুষ, তাদের চোখে দুই প্রজন্মের ব্যবধান ধরা পড়াটা প্রায় অবশ্যম্ভাবী। সেকাল আর একালের পুজোর ফারাকটা আমাদের মতো আগের প্রজন্মের মানুষের কাছে সহজেই ধরা পড়ে। আরও আশ্চর্য, সেকালের সবকিছুর জন্যে একটা মন খারাপ করা ভাব থেকেই থাকে।

সেকাল ও একালের পুজো
  • ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০

সমীর গোস্বামী: আমরা যারা আগের প্রজন্মের মানুষ, তাদের চোখে দুই প্রজন্মের ব্যবধান ধরা পড়াটা প্রায় অবশ্যম্ভাবী। সেকাল আর একালের পুজোর ফারাকটা আমাদের মতো আগের প্রজন্মের মানুষের কাছে সহজেই ধরা পড়ে। আরও আশ্চর্য, সেকালের সবকিছুর জন্যে একটা মন খারাপ করা ভাব থেকেই থাকে।

Advertisement

আমাদের অল্পবয়সে বাইরে খাওয়ার কোনও চল ছিল না। ঘুগনি, ঝালমুড়ি, বুড়ির চুল (সুগার ক্যান্ডি) এইরকম কিছু ছাড়া, আর খাবারও তখন বাজারে আসেনি। তবে মিষ্টি ছিল। প্রকৃত ছানার মিষ্টি পাওয়া যেত।
কিন্তু আসলে যেটা বলার জন্য এত উপক্রমণিকা, সেটা হচ্ছে, দুর্গাপুজোর বেশ কয়েকদিন আগে থেকে পাড়ার প্রায় সব বাড়িতেই নাড়ু, মোয়া, গজা, নিমকি ইত্যাদি বানানোর গন্ধে ম-ম করত।
আমাদের মা-ও কতরকমের খাবার বানাত তার ইয়ত্তা নেই। গুড়ের নাড়ু তো বানাতই, তার সঙ্গে চিনির পাক দিয়েও নাড়ু বানাত। সেটা গোল না পাকিয়ে, বরফি করত। আর হতো মোয়া। মুড়ি, খই, চিঁড়ের মোয়া। ছিল তিলের নাড়ু, চিনির রসে ফেলে গজা বা নোনতা নিমকি বানানো। না বানালে যে চলবে না! আত্মীয়-স্বজন পরিচিতজনদের আসা-যাওয়া পুজোর সময়। বিশেষ করে বিজয়া দশমী ও তার পরেও বেশ কয়েকটা দিন লেগেই থাকত। তখন তো আর হোয়াটসঅ্যাপ বা মুঠোফোনে বিজয়া জানাবার সুযোগ ছিল না।
এই প্রসঙ্গে দুটো জিনিস জানাতে একেবারে ভুলেই গেছি। বিজয়া দশমীর দিন মা অনেক সময় বাড়িতে ঘুগনিও বানাত। অনেকে তার টানেও আসত। সঙ্গে আকর্ষণ ছিল নাড়ু। এই নাড়ুর জন্য মাসখানেক আগে থেকে, অর্থাৎ যখন দামটা একটু সস্তা, তখন থেকে আমাদের খাটের তলাটা নারকেলে ভরা থাকত। মনে আছে সেগুলো একসঙ্গে কাটারি দিয়ে ছাড়াতে গেলে হাতে ফোস্কা পড়ে যেত।
আর এখন খাবার বানাতে হয় না। মানে অত হ্যাপা পোহাতে হয় না। লোকজন এলে, অনলাইনে অর্ডার দিলে, প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ডেলিভারি বয়’-রা দিয়ে যায়।
এখন মোয়া, নিমকি কেউ ছুঁয়েও দেখবে না। পেস্ট্রি, প্যাটিস, পিৎজা, বার্গার, হট ডগ (প্রথমবার শুনে চমকে উঠেছিলাম) ইত্যাদি। এখন বিজয়া দশমীতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এইসব দেওয়া হয়। মিষ্টিও দেওয়া হয়। কিন্তু ঠিক বাঙালি মিষ্টি নয়। কাজু বরফি।
তবে ঠাকুরের ভোগে অবশ্য খুব একটা পরিবর্তন এখনও আসেনি। আশ্চর্য, প্রথমেই চলে এসেছি খাওয়ার ব্যাপারে।
আরে, পুজোর ব্যাপারটাই চাপা পড়ে যায় আর কী!
দু-প্রজন্মের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে অনেকেই হয়তো রেগে উঠবেন। কিন্তু স্পষ্ট কথা বলতে খুবই ইচ্ছে করে। তখনকার সঙ্গে এখনকার পুজোর ফারাক হচ্ছে নিষ্ঠার সঙ্গে আড়ম্বরের।
আমার গ্রামে বাড়ি বলে, গ্রামের পরে মফস্‌স঩লে চলে আসায় এবং পরে কলকাতায় থাকায় ফলে, কলকাতার পুজোও দেখার সুযোগ হয়েছে।
সেকালে গ্রামের পুজো বলতে, মূলত বাড়ির পুজোই বোঝাত। বিত্তশালীরাই করতেন। ওই বাড়ির তল্লাটের গরিব মানুষ চাষি-ভূষিরা, যারা বাবুদের জমি চাষ করত, তারা ওই বাবুর পুজোকেই নিজেদের পুজো বলে মনে করত। অঞ্জলি দান বা আরতির সময় ভিড় জমাত। চারদিন পাত পেড়ে ভোগ খেত।
দিন-কাল পাল্টেছে। বাবুদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়েছে। এখন পারিবারিক পুজোগুলো বেশিরভাগ শরিকি পুজো। ফলে এখন আর চারদিন খাওয়ানো হয় না। বড়জোর একদিন, অথবা থালা-বাটি নিয়ে এসে ভোগ-প্রসাদ নিয়ে যাও।
কোনও কোনও গ্রামে মন্দিরে বা দুর্গা-মণ্ডপেও পুজো হতো।
বাবা যখন ডেলি-প্যাসেঞ্জারির ধকল সইতে না পেরে গ্রাম থেকে তল্পিতল্পা বেঁধে শহরে ভাড়া-বাড়িতে চলে এলেন, তখন বছরে অন্য সময়ে তো বটেই, দুর্গাপুজোর সময় অবধারিতভাবে বাড়ি পালাতাম। বাবা ‘বাড়ি যাব’-ই বলত। কারণ শহরের বাড়িটা ছিল ভাড়া বাড়ি।
তখন গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। এসেছিল অনেক পরে। হ্যারিকেন, হ্যাজাক, টর্চ ইত্যাদি ছিল ভরসা। লোকে রাতের অন্ধকারে অনেক আগে শুয়ে পড়ত এবং অনেক ভোরে উঠত।
স্টেশন থেকে আমাদের গ্রাম তিন মাইল (তখন মাইলের হিসেব) ভেতরে। মাটির রাস্তা। যখনকার কথা বলতে চাইছি, তখন গ্রামে উন্নতি হয়েছে। গোরুর গাড়ির বদলে, সাইকেল রিকশয় স্টেশন থেকে গ্রামে যাওয়া যায়। গ্রামে না পৌঁছনো পর্যন্ত সারা রাস্তাটায় কোনও কোনও জায়গায় দু-চার ঘর লোকের বাস ছাড়া, বাকি রাস্তাটা শুনশান। দু-পাশ গাছ-গাছালিতে ছাওয়া। রাস্তার একপাশ দিয়ে বয়ে চলেছে এক নাম না জানা নদী।
শহরে থাকার সময় আমরা যখন দেশের বাড়ির পুজোয় যেতাম, তখন বাবার দায়িত্ব ছিল সব ছোটদের জামা-প্যান্ট ইত্যাদি নিয়ে যাওয়া। বাবা-মা ছোটদের সব একইরকম পোশাক কিনে নিয়ে যেতেন। সেক্ষেত্রে আমাদের অন্যরকম করার জো ছিল না। আর ঠাকুমার জন্য নিয়ে যেতে হতো একটা ভালো কোম্পানির বিস্কুটের বাক্স। বাক্সটা লম্বা ধরনের হতো। তার মধ্যে বিস্কুট জড়িয়ে থাকত অজস্র সরু কাগজের টুকরো। এভাবে যে কেন রাখা হতো, তা জানি না।
এই ঘটনা উল্লেখ করলাম কারণ, তখনকার যৌথ পরিবারের সঙ্গে এখনকার ছোট পরিবারের বিস্তর ফারাক বোঝাতে।
এই প্রসঙ্গে দুটো ঘটনার কথা পাশাপাশি উল্লেখ করলে বোধহয় সেকাল-একালের পরিবর্তনটা বুঝতে সুবিধা হবে।
পুজোয় আমরা যখন দেশের বাড়ি যেতাম, স্টেশন থেকে দুটো সাইকেল রিকশতে চেপে যেতাম। বাড়ি যাওয়ার পথে বাবার চোখে-মুখে লেগে থাকত আনন্দের ছটা। গ্রামে ঢোকার আধ মাইলটাক আগে একটা গঞ্জ ধরনের জায়গা আছে— নাম আকন্দপুকুর। বেশ কয়েকটা দোকান ছিল। চায়ের দোকানে যাঁরা বসে থাকতেন, তাঁরা বাবার ডাকনাম ধরে জিজ্ঞেস করতেন, ‘কী রে এলি?’ বাবাও সোৎসাহে উত্তর দিতেন, ‘হ্যাঁ।’
এবার একটু পরিবর্তনের গল্পটা বলি।
বেশ কয়েক বছর পরের কথা। বাবা মা দু’জনেই তখন মারা গিয়েছেন। আমি আমার দুই ছেলেমেয়েকে একবার আমাদের গ্রামের পুজো দেখাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। ওদের জন্মকর্ম কলকাতায়। ওরা যেতেই চাইছিল না। অনেক বুঝিয়ে রাজি করালাম।
গ্রামে তখন বিদ্যুতের আলো। পিচের রাস্তা। বাস, অটো চলছে। তবুও আমি ধারা বজায় রাখার জন্য দুটো সাইকেল রিকশই করলাম। বাবার সময় আমরা যেমন ঘন ঘন গ্রামে যেতাম, তার ছেদ ঘটেছে। উপায়ও ছিল না। যাইহোক। পুজোর সময় সবার একসঙ্গে ছুটিতে গ্রামে গেলাম। রাস্তার দু’ধারে অনেক বাড়ি-ঘর হয়ে গিয়েছে।
সেই আকন্দপুর নামে গঞ্জ ধরনের জায়গাটা দোকান-পসারে ছয়লাপ। আলো ঝলমল করছে রাতেও। খুব বড় না হলেও বাজার বসেছে। চায়ের দোকানে অনেক লোক রয়েছে। তারাও আমাকে চেনে না, আমিও তাদের চিনি না। ফলে বাবাকে যেমন আসার কথা জিজ্ঞেস করত, আমাকে কেউ করল না। বরং এমনভাবে তাকিয়েছিল, আমি যেন কোনও এক আগন্তুক ঢুকেছি। রাস্তা ছাড়িয়ে কিছুদূর যাওয়ার পরে দেখলাম একটা বারোয়ারি পুজো। লাইটে সাজানো হয়েছে, মাইকে গানও চলছে, কিন্তু প্যান্ডেল ফাঁকা। পরে প্রশ্ন করে জেনেছিলাম, পুজোর উদ্যোক্তা ছেলে-মেয়েরা সব গাড়ি ভাড়া করে রাতে ঠাকুর দেখতে শহরে গেছে। সকালে ফিরে আসবে।
ছোটবেলায় আমরা যখন পুজোর গ্রামে যেতাম, তখন ছোট ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে ছিল আমাদের বেজায় ভাব। আমরা দুপুরে স্নান-খাওয়ার সময়টুকু ছাড়া সকাল থেকে প্রায় সন্ধেবেলা পর্যন্ত কাটাতাম দুর্গামণ্ডপে। আর আমার ছেলে-মেয়ের সঙ্গে যেহেতু কারও জানাশোনা নেই, তাই ওরা কিছুক্ষণ থেকেই বাড়ি ফিরে আসত।
এখন জানলাম মন্দিরের ঠাকুর মণ্ডপে এবং বাবুদের বাড়ির পুজো দুটো ছাড়া, আরও ছ’টা বারোয়ারি পুজো হচ্ছে। এর মধ্যে দুটো বারোয়ারি পুজো আবার সরকারি অনুদানও পাচ্ছে।
গ্রামের বারোয়ারি পুজোগুলোও বেশ জমকালো করে হয়। তবে সন্ধেবেলায় অল্পবয়সিদের মধ্যে সেজেগুজে রাত জেগে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার প্রবণতা বেশ বেড়েছে।
এবার একটু কলকাতা শহরের পুজোর কথায় আসি। আগেও কলকাতার পুজোয় বেশ দেখনদারি করে প্যান্ডেল হতো। আলো দিয়ে সাজানো, মাইক বাজানো সবই ছিল, কিন্তু এখন বিশালতায় আগেকার সাজ-সজ্জার কোন তুলনাই চলে না।
এখন পুজোর অনেক আগে থেকেই প্যান্ডেলের খুঁটিপুজো সাড়ম্বরে অনুষ্ঠান করে হতে থাকে।
এখন তো পুজো প্যান্ডেলের সাজ-সজ্জা হয় ‘থিমে’র ওপর নির্ভর করে। বিভিন্ন প্যান্ডেল বিভিন্ন থিমের ওপর গড়া। লাইটেরও কতরকম জৌলুস। মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে ‘আহা কী বাহার!’ প্যান্ডেলটার কাছে গিয়ে সবকিছু যে খুঁটিয়ে দু’দণ্ড দেখব, তার অবকাশ পাওয়া যায় না। একেই তো অনেকক্ষণ লাইন দিয়ে পা ব্যথা। শুধু লাইনই বা কেন? তার আগে তো গাড়ি ছেড়ে অনেকটা হেঁটে আসতে হবে। কারণ ভিড়ের চাপ এড়াতে পুলিশি ব্যবস্থায় অনেক দূরে পার্কিংয়ের আয়োজন।
প্যান্ডেল-লাইট-ঠাকুরের রূপ দেখে বিদেশিরাও মুগ্ধ হয়ে ছবি তোলে।
এছাড়া বনেদি বাড়ির সাবেকি পুজোগুলোও আছে। সেগুলোও বেশ জমিয়ে হয়। গ্রামের বাড়ির পুজোগুলোর মতো নয়। গ্রামের বাড়ির পুজোগুলোতেও কিন্তু বেশ জমে যায়। কারণ আত্মীয়স্বজনে ভরে যায়।
এখন কলকাতার পুজোয় আরেকটা নতুন বৈশিষ্ট্য যোগ হয়েছে। ফ্ল্যাট বাড়ির মানে কমপ্লেক্সগুলোর পুজো খুব জমিয়ে হয়। ফ্ল্যাটের সবার অংশগ্রহণ থাকে। চারদিন জমিয়ে একসঙ্গে ভোগ খাওয়া। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া! এসব নিয়ে বেশ জমে যায়।
তবে দুর্গাপুজোর বোধহয় তুলনা চলে না। সেকালেই হোক বা একালেই হোক বাঙালি দেশ-বিদেশে যেখানেই থাকে দুর্গাপুজোতে মাতবেই।
প্রার্থনা করি এবারের দুর্গাপুজোও খুব জমে উঠুক। আনন্দে মাতোয়ারা হোক সমগ্র বাংলা।

সম্পর্কিত সংবাদ