Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

চূড়ান্ত দ্বিচারিতা

দ্বিতীয় দফায় হোয়াইট হাউসের দখল নেওয়ার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প শুধু ‘মেক আমেরিকা গ্রেট আগেইন (ম্যাগা)’ ধুয়ো তোলেননি, ভোটের অঙ্কে কমলা হ্যারিসকে সহজে পিছনে ফেলতে ‘হিন্দুত্ব’ এবং ‘ইন্ডিয়া’ তাসও খেলেছিলেন বিশেষ চতুরতার সঙ্গে। তাতে তাঁর স্বঘোষিত মিত্র নরেন্দ্র মোদি একেবারে গলে গিয়েছিলেন।

চূড়ান্ত দ্বিচারিতা
  • ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

দ্বিতীয় দফায় হোয়াইট হাউসের দখল নেওয়ার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প শুধু ‘মেক আমেরিকা গ্রেট আগেইন (ম্যাগা)’ ধুয়ো তোলেননি, ভোটের অঙ্কে কমলা হ্যারিসকে সহজে পিছনে ফেলতে ‘হিন্দুত্ব’ এবং ‘ইন্ডিয়া’ তাসও খেলেছিলেন বিশেষ চতুরতার সঙ্গে। তাতে তাঁর স্বঘোষিত মিত্র নরেন্দ্র মোদি একেবারে গলে গিয়েছিলেন। বলা বাহুল্য, ভারতের আম পাবলিকের চোখেমুখেও একটা স্বস্তির ছাপ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল। অনেকে ধরেই নিয়েছিলেন, ট্রাম্প যখন সাদাবাড়ির বাসিন্দা তখন ভারতের আর চিন্তা নেই—ভারত-মার্কিন সুসম্পর্কের স্বর্ণযুগ প্রতিষ্ঠিত হবে এবং জঙ্গিবাদী পাকিস্তানও টাইট হল বলে! প্রেসিডেন্ট ইলেকশনে জয় হাসিল করার পর বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের উপর যবনিকা টানারও অঙ্গীকার শোনা গিয়েছিল ট্রাম্পের শ্রীমুখে। কিন্তু ইরান, প্যালেস্তাইনে যে লাগাতার ধ্বংসলীলা চলেছে, সেখানে ট্রাম্পের কথার কোনও মূল্যই খুঁজে পাওয়া যায়নি। আবার ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের মাঝে এই ব্যক্তিকেই পাওয়া গেল গাঁয়ে মানে আপনি মোড়লের ভূমিকায়। অতঃপর চলেছে তাঁর নোবেল পুরস্কার হাতে নেওয়ার এক বেনজির বিস্ময়কর ঘ্যানঘ্যানানি। পাকিস্তানের ‘ফেইল্ড মার্শাল’ আসিম মুনিরকে পাশে পেয়ে ট্রাম্প যখন পরম আহ্লাদিত, ঠিক তখনই তিনি ভয়ানক হতাশ মোদির দেশকে নিয়ে, কেননা তাঁকে নোবেল পুরস্কারের জন্য কোনও উচ্চবাচ্যই করছে না ভারত। তারই মধ্যে ট্রাম্প অজুহাত খাড়া করেছেন ভারত এবং চীন কেন রাশিয়া থেকে সস্তায় খনিজ তেল কিনছে! এটাকে তিনি ইউক্রেন-যুদ্ধে রাশিয়াকে মদত হিসেবেই দেখছেন। অতএব এই দুই দেশের পণ্যের উপর সর্বাধিক হারে শুল্ক চাপিয়ে দিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে অব্যাহত আছে ভারতকে মার্কিন হুঁশিয়ারি। কিন্তু ভারত তাতে কর্ণপাত না-করায় ট্রাম্পের রোষ ক্রমে বহুবর্ধিত হয়েছে। তাঁর এই আজগুবি সিদ্ধান্তের পাশে চাইছেন তিনি ইউরোপকেও। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে তাঁর আহ্বান, তারাও যেন আমেরিকার মতোই চড়া হারে শুল্ক আরোপ করে ভারতের উপর। 

Advertisement

ডোনাল্ড ট্রাম্প কোন সময়ে এই পরামর্শ দিচ্ছেন ইউরোপকে? যখন তিনি নিজেই ভারতের সঙ্গে বিবাদ মেটাতে আগ্রহী বলে বার্তা দিচ্ছেন। বলছেন, ‘বন্ধু’ নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বাণিজ্য বৈঠকে বসতে চান তিনি। এতদিন ভারতের বিরুদ্ধে ধাপে ধাপে আগ্রাসন ও আক্রমণ বাড়ানোর পর হঠাৎ এই দাবি করেছেন তিনি। আবার একইসঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ট্রাম্প বলেছেন, ভারত ও চীনের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপাও। আমেরিকার দিক থেকেও প্রয়োজনে তার প্রতিফলন দেখা যাবে। যতদিন নয়াদিল্লি ও বেজিং তেল কিনে রাশিয়াকে যুদ্ধের অর্থ জুগিয়ে যাবে, ততদিন এভাবেই দুই দেশকে চাপে রাখতে হবে। অর্থাৎ, একই মুখে দুটি মুখোশ! ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই দ্বিচারী অবস্থানে রীতিমতো কপালে ভাঁজ পড়েছে ভারতের। একদিকে ট্রাম্প বলছেন, ‘‘নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে কথা বলতে চাই। বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা মোটেই বন্ধ হয়নি। আলোচনা চলবে। চুক্তিও হবে। শুল্ক নিয়েও কথা বলব। ভারত এবং আমেরিকার মধ্যে যে বাণিজ্য-প্রাচীর তৈরি হয়েছে, তা ভাঙতে বাণিজ্য বৈঠক চলবে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মোদির সঙ্গে কথা হবে। আমি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি, দুই মহান দেশের মধ্যেকার সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে শীঘ্রই।’’ আর অন্যদিকে ইউরোপকে তাঁর সম্পূর্ণ উল্টো বার্তা! 
এই দ্বিচারিতার অর্থ কী? অন্য দেশের পণ্যের উপর চড়া হারে শুল্ক চাপানোর আমেরিকান সংস্কৃতি নতুন কিছু নয়। দ্বিচারিতাও আমেরিকার ঐতিহ্যের অঙ্গ। যেমন রাশিয়ার সঙ্গে আমেরিকা এবং ইউরোপের বাণিজ্য-সম্পর্ক যথারীতি অক্ষুণ্ণ। তা বিন্দুমাত্র টাল খায়নি। আবার তখনই ইউক্রেন ইস্যুতে ভারতের দিকে আঙুল তুলছেন বিশ্বশান্তির নয়া অবতার ট্রাম্প! সেই হিসেবে ভারত, চীন, কানাডা, ব্রাজিলসহ কিছু অপছন্দের দেশের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প যা করছেন তা অভূতপূর্ব নয়। তবে পূর্ববর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে ট্রাম্প সাহেবের তফাত একটা আছে। তা হল যেসব দেশ ট্রাম্পের হাতে তামাক খেতে রাজি নয়, তাদেরকে সবক শেখাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তিনি। ব্যাপারটা শুধু বড্ড চোখে লাগছে না, আমেরিকার কূটনৈতিক অসৌজন্যের যাবতীয় রেকর্ডও চুরমার হয়ে গিয়েছে। ট্রাম্প-ট্যারিফ রীতিমতো অসহ্য হয়ে উঠেছে বহু দেশের কাছে। মাঝে মাঝে অনেকের মনে সংশয় জাগছে, ট্রাম্প নামক ব্যক্তিটি সত্যি কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট? ভারতের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের যে ঐতিহ্য ও পরম্পরা, তার সঙ্গে এটা কি আদৌ সমঞ্জস্যপূর্ণ? হলফ করেই বলা যায়, ‘না’। এই অসৌজন্য এবং নীতিহীনতা কেবল সংকীর্ণমনা বেনিয়া ট্রাম্পকেই মানায়। তবে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিপথই আমেরিকাকে শুধরে দেবে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বাজার, সর্ববৃহৎ গণতন্ত্র, ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ নীতিতে অবিচল ভারতকে সেই সময়টুকুর জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবে তার আগে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের কূটনৈতিক প্রয়াসও জারি থাক অবশ্য করে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ