প্রীতেশ বসু, হাওড়া: ৩০০ বছরের পুরানো রামমন্দির। মন্দিরটি হাওড়া দক্ষিণ বিধানসভা এলাকার মধ্যে হলেও এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রামরাজাতলার বেশিরভাগ অংশ পড়ছে শিবপুর বিধানসভা কেন্দ্রের অধীনে। স্বভাবতই এসব অঞ্চলের মানুষের কাছে গত কয়েক বছরে, বরং বহু বছর ধরে ধর্মীয় সংস্কৃতির অন্যতম অংশ রাম পুজো। রামনবমী থেকে সাড়ে চার-পাঁচ মাস ধরে চলে পুজো ও মেলা। সেই রামমন্দিরের পাশের দেওয়ালে নন্দিতা চৌধুরীকে জোড়াফুলে ভোট দিয়ে জেতানোর আহ্বান। তিনি হাওড়া দক্ষিণ কেন্দ্রের তৃণমূলের প্রার্থী। ঠিক উলটো ফুটেই ঝুলছে শিশু চিকিৎসক ডাঃ রানা চট্টোপাধ্যায়ের সমর্থনে ব্যানার। শিবপুর কেন্দ্রে এবার তাঁকেই প্রার্থী করেছে তৃণমূল। রামনবমীকে কেন্দ্র করে এখন রাজ্যজুড়ে যেভাবে উন্মাদনা চলে, তার সঙ্গে কখনও পরিচিত ছিলেন না এসব এলাকার বাসিন্দারা। ভোটের প্রচার যখন তুঙ্গে, তখন সেই নাগরিকরাই জানাচ্ছেন, বিভেদ-বিদ্বেষের রাজনীতি তাঁদের না-পসন্দ। বরং তারা আস্থা রাখছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়নেই। তাঁদের সেই আশাকে জয়ের সাফল্যে বদলে দিতে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শিবপুরের অলিগলি চষে ফেলছেন তৃণমূল প্রার্থী। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়নের বার্তা দোরে দোরে পৌঁছে দিচ্ছেন বিশিষ্ট চিকিৎসক রানা চট্টোপাধ্যায়। প্রচারে বেরিয়ে মানুষের অগাধ স্নেহ ও শুভেচ্ছায় ভাসছেন তিনি।
মানুষের ক্ষোভ রয়েছে কেন্দ্রের অধীনস্ত আরতি কটন মিল বন্ধ হয়ে যাওয়া নিয়ে। এক সময়ের সমৃদ্ধ শিল্পাঞ্চল এখন ধুঁকছে। জিতে এলে এই শিল্পাঞ্চলের হাল ফেরানোর কথা বলছেন রানা। কেন্দ্র কেন আরতি কটন মিল চালু রাখার ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ করল না, প্রচারে সেই প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন তৃণমূল প্রার্থী। বাজার এলাকার উন্নয়ন এই কেন্দ্রের মানুষের একটি অন্যতম চাহিদা। কদমতলা বাজারের সংস্কার চলছে জোরকদমে। ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের এইচআইটি রোডের মাঝে চওড়া অংশে পাকাপাকিভাবে বাজার গড়ে উঠছে। এর ফলে এলাকার দীর্ঘদিনের যানজটের সমস্যার নিরসন হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় দোকানদার জয়ন্ত মোদক। বাজার সংস্কারের কাজ দ্রুত শেষ করার কথা বলা হয়েছে তৃণমূলের প্রতিজ্ঞাপত্রেও।
গত বিধানসভা ভোটে বালি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের টিকিটে প্রথমবার বিধায়ক হয়েছিলেন রানা। এবার তিনি প্রার্থী শিবপুরের। হাওড়া পুরসভার ১০টি (ডিলিমিটেশনের আগে) ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই কেন্দ্র। বেলগাছিয়া ডাম্পিং গ্রাউন্ড এই কেন্দ্রের অন্তর্গত। বছর খানেক আগে এই ভাগাড় সংলগ্ন এলাকায় ভয়াবহ ধসের চিহ্ন এখনও রয়েছে। তবে এলাকাবাসীকে আশার আলো দেখিয়েছে রাজ্য সরকারের পুরদপ্তরের ভূমিকা। আবর্জনার পাহাড় কেটে পরিষ্কার হয়েছে অনেকটাই। সেকথাও থাকছে রানার প্রচারে। সেই সঙ্গে বেলগাছিয়া কুঞ্জপাড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে নয়া ম্যাটারনিটি হোম সহ স্টেট জেনারেল হাসপাতালে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন রানা। একইভাবে ৪৭ থেকে ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় এক লক্ষ মানুষের জন্য পরিস্রুত পানীয় জলের ব্যবস্থা করতে কাজ শুরু এবং সুকান্ত কলোনির বাসিন্দাদের যাতায়াতের সুবিধার্থে আন্ডারপাস নির্মাণের উদ্যোগ রানার জয়ের ব্যবধান বাড়াতে সাহায্য করবে। এমনটাই মনে করছেন রামরাজাতলা স্টেশন সংলগ্ন মুদি ব্যবসায়ী চন্দ্রভানু মহান্তি। সেই সঙ্গে এসআইআর নিয়েও প্রবল ক্ষুব্ধ তিনি। তাঁর কথায়, ‘আমাকে শুনানির জন্য ডেকেছিল। দু’বার গিয়েছিলাম। রোজ দোকান বন্ধ করে যাওয়া সম্ভব নয়। আমরা এখানকার আদি বাসিন্দা। নাম আছে কি নেই, আর দেখিওনি। অহেতুর হয়রান করা হচ্ছে আমাদের।’ উল্লেখ্য, এসআইআরে প্রায় ৪০ হাজার নাম বাদ গিয়ে এই কেন্দ্রের ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লক্ষ ৯৩ হাজার। তবে তাতেও জয়ের ব্যবধান বাড়বে বলেই মনে করছেন রানা। তাঁর কথায়, ‘গণদেবতার সেবাই হল প্রধান লক্ষ্য। কাজের জোরেই আমরা আরও বেশি মানুষের ভালোবাসা পেতে চলেছি।’
১৯৭৭ সালের বামফ্রন্ট সরকারের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী হয়েছিলেন এই কেন্দ্রের তৎকালীন ফরওয়ার্ড ব্লক বিধায়ক কানাইলাল ভট্টাচার্য। ১৯৯১ সালে জটু লাহিড়ীর হাত ধরে রাজনৈতিক পালাবদল হয়। প্রথমে কংগ্রেস। ২০০১ সাল থেকে তৃণমূলের দখলেই থেকেছে। এর মাঝে ২০০৬ থেকে ২০১১—পাঁচ বছর বিধায়ক ছিলেন কানাইলালের ভাইপো ফরওয়ার্ড ব্লকের ডাঃ জগন্নাথ ভট্টাচার্য। ২০১১ এবং ২০১৬’র পর এবারও অর্থোপেডিক সার্জেন জগন্নাথবাবুকেই প্রার্থী করেছে বামফ্রন্ট। দুই চিকিৎসকের মাঝে পদ্ম চিহ্নের প্রার্থী রুদ্রনীল ঘোষ কতটা জায়গা করে নিতে পারবেন? উত্তর মিলবে ৪ মে।