Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

একটি ভাণ্ডারের কাহিনি... রাজনীতি নয়, সুরক্ষা

প্রয়োজন। স্থান-কাল এবং পকেটের জোর অনুযায়ী এই একটি শব্দের অভিঘাত বদলে বদলে যায়। কলকাতা শহরের ভবানীপুরে পাঁচজনের সংসার টানতে যে পরিমাণ খরচ হয়, ডোমকলের গ্রামে নিশ্চিতভাবে তা হয় না।

একটি ভাণ্ডারের কাহিনি... রাজনীতি নয়, সুরক্ষা
  • ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: প্রয়োজন। স্থান-কাল এবং পকেটের জোর অনুযায়ী এই একটি শব্দের অভিঘাত বদলে বদলে যায়। কলকাতা শহরের ভবানীপুরে পাঁচজনের সংসার টানতে যে পরিমাণ খরচ হয়, ডোমকলের গ্রামে নিশ্চিতভাবে তা হয় না। যেমন গোপাল হালদার। দুটো জেলা পেরিয়ে বর্ধমান শহরের একটি মিষ্টির দোকানে কাজ করতে আসেন তিনি। এবং সেখানেই থাকেন। এক-দেড় মাসে একবার ছুটি নিয়ে বাড়ি যান। এই জীবনযাপন তাঁর কাছে জলভাত হয়ে গিয়েছে। বাড়িতে আছে বয়স্ক মা, অসুস্থ বাবা, স্ত্রী, আর দেড় বছরের মেয়ে। হাজার পনেরো টাকা বেতন পান মাসে। তাতে কিন্তু হেসেখেলে তাঁর সংসার চলে যায়। নিজের জন্য খুব বেশি খরচ হয় না তাঁর। হাজার তিনেক টাকা হাতে রেখে পুরোটাই পাঠিয়ে দেন গ্রামের বাড়িতে। অসুস্থ বাবার চিকিৎসা হয়ে যায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। নিখরচায়। ঘর লাগোয়া জমিতে শাকটা-কুমড়োটা ফলিয়ে নেন স্ত্রী। বিনা পয়সায় রেশনের চাল-গম আছে। আর আছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার।

Advertisement

লাবণীর সদ্য বিয়ে হয়েছে। শ্বশুরবাড়ি আসানসোল। কিন্তু শ্বশুরমশাইয়ের দেশের বাড়ি মুর্শিদাবাদের প্রত্যন্ত গ্রামে। তাঁরা সেখানকার মান্যিগণ্যি পরিবার। এ বাড়ির ছেলের বিয়ে হয়েছে। বউকে তো একবার যেতে হবেই। তাই লাবণী গিয়েছিল সেখানে। যেতে যেতে শাশুড়ি মায়ের থেকে শুনেছিল, কে কে আছে বাড়িতে। বড়ো জেঠুর পরিবার। পিসি। আর খান তিনেক কচিকাঁচা। গ্রামে পৌঁছে লাবণীর মনে হল, আরে... ছেলেমেয়েগুলোর জন্য তো কিছুই নেওয়া হল না! খুঁজেপেতে একটা দোকান নজরে এল। ঝুপড়ি ঘর। কিন্তু চিপস-চকোলেট আছে। খুব বেশি করে কিনেও তিনশো টাকার বেশি খরচ করতে পারল না লাবণী। কিছুটা এগিয়ে এসেই মনে পড়ল, এই যাঃ! পাশের বাড়ির যে ছেলেটা সব সময় এখানে পড়ে থাকে, তার জন্য তো কিছু নেওয়া হল না? সঙ্গে সঙ্গে ফিরল লাবণী। কিন্তু এসে দেখল, দোকান বন্ধ! এই তো খোলা ছিল! সবে সকাল ১১টা। এখনই বন্ধ? শাশুড়িমা হাসলেন... তুমি ওর থেকে ৩০০ টাকার জিনিস কিনেছ। ওর দু’দিনের বিক্রি হয়ে গিয়েছে। আর দোকান খোলা রাখে? লাবণীর মাথায় চিন্তার ঢেউ খেলে গেল... এদের প্রয়োজন এখনও এতই কম? শাশুড়িমা বললেন, কী খরচ আছে বলো ওদের? নিজেদের একচিলতে জমি আছে। তার উপর একটা বাড়ি দাঁড় করিয়ে নিয়েছে। বিনামূল্যে রেশন পায়। সরকারি স্কুলে ছেলেমেয়েরা পড়ে। ওরা সাইকেল পায়, কন্যাশ্রীর টাকা পায়, মেয়ের বিয়ে হলে রূপশ্রীর টাকা আছে, আর লক্ষ্মীর ভাণ্ডার তো আছেই। সংসার চালিয়েও টাকা জমাতে পারে ওরা।

সবিতা ভাবছে। বাড়ি থেকে খবর এসেছে... বর এসেছিল। সবিতাকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। ১০ বছর পর। বাড়ির সবাই চাপ দিচ্ছে। কিন্তু সবিতা ভাবছে। সনৎ যখন তাকে ফেলে অন্য একজনের সঙ্গে ঘর পাতল, তখন সবিতার কোলে একরত্তি মেয়ে। স্বামী ছেড়ে গিয়েছে বলে বাপের বাড়িতেও সবাই তেতো গেলার মতো আচরণ করত। ওদের গ্রামদেশে এমন হয়। কিন্তু মানতে পারেনি সবিতা। ছ’মাসের মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। সঙ্গে ছিল লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের জমানো কয়েক হাজার টাকা। এখন সে ‘স্বনির্ভর’। নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। মেয়েকে স্কুলে ভরতি করেছে। কেন ফিরে যাবে সে এখন? প্রয়োজনটা কার? সবিতার তো নেই!

তিনটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু এই তিন পরিবারকেই এক সূত্রে বেঁধেছে মূলত একটি প্রকল্প—লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। এটি যে ভোট রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্রহ্মাস্ত্র, সে ব্যাপারে কোনো সংশয় নেই। বিরোধীরা সেই দাবি করে থাকে। তৃণমূলের অন্দরেও এই দাবি উড়িয়ে দেওয়া হয় না। কিন্তু রাজনীতির বাইরে প্রান্তিক মানুষের সমাজে উঁকি মারলে... এ হল গ্রামীণ অর্থনীতির বিশল্যকরণী। ১০০ দিনের কাজের দরজা বাংলার মানুষের মুখের উপর মোদি সরকার বন্ধ করে দেওয়ার পর এই প্রকল্পই টাকার জোগান দিয়ে গিয়েছে। কর্মশ্রীতে গ্রামের বহু মানুষ কাজ পেয়েছেন। যাঁরা পাননি, তাঁরা অন্যত্র গিয়েছেন কাজের খোঁজে। কিন্তু অনিশ্চিত ঘোরাঘুরির শেষে একটা নিশ্চয়তা বাংলার প্রত্যেক প্রান্তিক মানুষের মনে থাকত—লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকাটা তো আছে! কী বলা যায় একে? আশ্বাস? স্বস্তি? আর যাই হোক, প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা ভেঙে ছারখার করার প্রবৃত্তি নয়। হ্যাঁ, কলকাতা বা জেলার শহরের অধিকাংশ মানুষের জন্য এই হাজার-বারোশো টাকা গায়ে না-ই লাগতে পারে। কিন্তু গ্রামের সাধারণ মানুষ! তাঁদের কাছে হাজার টাকা মানে বাবার ওষুধ খরচ, কিংবা ছেলেমেয়ের দরকারি বইপত্র, চাষের জন্য সারের খরচটা, ছোটোখাটো ব্যবসা শুরু করা...। মালতির মতো। সাইকেল ছিল বরের। সেটা নিয়েই এখন সে বেরিয়ে পড়ে। সামনের হ্যান্ডলে ঝোলানো থাকে বোঝাই দু’টি ব্যাগ। তার থেকে উপচে বেরিয়ে আসতে চায় নানা গন্ধের ধুপকাঠি, চুলের ক্লিপ, চায়ের ছাঁকনি, নাইলনের দড়ি... কী নেই! মালতি কিন্তু সত্যিই আজ স্বনির্ভর। আর এর মধ্যে কোনও রাজনীতি নেই। আর হ্যাঁ, চিন্তাও নেই। কারণ, এই টাকাটা... এই পুঁজিটা তার ‘নিজের’। কাউকে ফেরত দিতে হবে না। জেলায় জেলায় এই মালতি, সবিতারা ছড়িয়ে রয়েছে। সমীক্ষার রিপোর্ট বলছে, কলকাতায় হয়তো লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের উপভোক্তা মাত্র ৩৮ শতাংশ। কিন্তু পূর্ব মেদিনীপুর হোক, কোচবিহার, হাওড়া বা নদীয়া... পরিসংখ্যানটা ৮০-৮৫ শতাংশের বেশি। মুর্শিদাবাদে তো ৯১ শতাংশ মহিলা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পেয়ে থাকেন। এই মুহূর্তে গোটা রাজ্যে এই প্রকল্পের সরাসরি উপভোক্তার সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ২১ লক্ষ। পরিবারে গড়ে চারজন ধরলেও রাজ্যের প্রায় ৯ কোটি মানুষ লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে উপকৃত। এর প্রভাব থাকবেই। সমাজে। ভোট রাজনীতিতেও।

কোভিডের পর কাজ হারানোর যে ঢেউ আছড়ে পড়েছিল, তাতে গোটা দেশে সাত শতাংশ পুরুষ আর কর্মজগতে ফিরতে পারেননি। মহিলাদের ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানটা ৪৬ শতাংশ। এরকম একটা সময়ে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার কিন্তু বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতিকে ধসে যেতে দেয়নি। বাড়ির মহিলাদের হাতে সরাসরি টাকা থাকার অর্থ সঞ্চয়। এবং সংসারের প্রয়োজনেই খরচ। ফাঁসিদেওয়ায় চা বাগানের এক মহিলা শ্রমিকই তো বলছিলেন, ‘ওরা বলে, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নাকি ফ্রিয়ের টাকা। আর আমরা যারা সারাদিন খেটে কম মজুরি পাই, সেটা তো বছর বছর কেটে গেলেও মেক আপ হয় না! সেটা কেন তাহলে বিনা পয়সার খাটনি বলা হবে না?’ রাজনীতি যাই প্রচার করুক না কেন, প্রান্তিক বাংলার আসল চিত্র কিন্তু এটাই। মূল্যবৃদ্ধির জল গলা পর্যন্ত উঠে এসেছে। কর্মসংস্থান নেই। পশ্চিমবঙ্গকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় সহায়তা কোনো এক দূরের গ্রহ। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে নির্লজ্জভাবে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর দিল্লির ‘বিধাতা’রা বারবার এখানে এসে কী প্রচার করছে? ডবল ইঞ্জিন সরকার হলেই সব সুবিধা পাবে বাংলার মানুষ। এর থেকে বেশি বেহায়াপনা আর কীই বা হতে পারে? সরাসরি বলা হচ্ছে, আমাদের ভোট দাও, সরকারে আনো... তবেই বাঁচার সুযোগ দেব। আমরা তারপরও তাঁদের জন্য ‘জয় হো’ করে যাব! একবারও ভাবব না যে, ঘরে ঘরে পৌঁছে যাওয়া এই কয়েকটা টাকাই কিন্তু সংসারের ঝুলি শূন্য হতে দেয়নি। বছরের পর বছর। গ্রামীণ অর্থনীতি রোল করেছে এই টাকাতেই। হয়তো সামান্য। কিন্তু লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো সামাজিক প্রকল্প না থাকলে এটুকুও হত না। সবচেয়ে বড়ো কথা, নারী সশক্তিকরণ শুধু মুখে বললে হয় না। বাজেটের ঘোষণাতেও না। একটা টিপের পাতা কিনতে গেলেও বাড়ির কর্তার কাছে হাত পাততে হত। কখনো মুখ ঝামটা ফেরত আসত, কখনো আবার ‘গৃহকর্ত্রী’ নিজেই চুপ করে যেতেন। ভাবতেন, এটুকুর জন্য আর বিরক্ত করব না। টিপের পাতাটা উদাহরণ মাত্র। এইসব উপকরণ উপলক্ষ্য মাত্র। হাতে টাকার জোগান থাকা মানে বুকের মাঝে জন্ম নেওয়া একটা শক্তি। সবিতা হয়ে ওঠার সাহস। সে আজ ভাবতে পারে, সম্মান বিকিয়ে সনতের কাছে ফেরার প্রয়োজন তার নেই। মালতি হয়ে ওঠার মনের জোর। সে বেরিয়ে পড়তে পারে ব্যাগ গুছিয়ে, সাইকেলে চেপে। বাংলার এই সমাজ নির্মলা সীতারামনকে চেনে না। চিনতে চায়ও না। তারা চেনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তাই ফেব্রুয়ারি মাসের ১ তারিখ কী ঘোষণা হল, তা তাদের আলোচনার মেনু নয়। বাংলাকে কেন্দ্র বঞ্চনা করল কি না, সেটা এই সমাজ মনে রাখে না। খুব একটা আশাও কিছু করে না। বরং রাজ্য বাজেট তাদের কাছে আশার আলো। এবারও। আশায় আছে সবিতা-মালতির মতো কোটি কোটি মহিলা... এবার হয়তো মমতা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা বাড়িয়ে হাজার দেড়েক করবেন। মূল্যবৃদ্ধির বাজারে তাদের কাছে এই টাকাটা অ-নে-ক। আশায় আছেন আশাকর্মীরাও। মমতা নিশ্চয়ই তাঁদের জন্য কিছু না কিছু ভেবেছেন। গ্রামীণ রাস্তা পাকা হবে... পুকুর পাড়ের সাপে কাটা ওই পথটায় পিচ পড়বে। যাদের মাথায় এখনও ছাদ নেই, বাংলার বাড়ি প্রকল্পে নাম ঢুকবে তাদেরও। আশায় আছে তারা। এই বাংলারই মানুষ। আশা একটাই, তাদের প্রয়োজন মিটবে। কারণ তারা জানে, এই বাংলায় সমাজের সুরক্ষা আছে। আর এটা কোনো মিথ্যা ভোট-প্রতিশ্রুতি নয়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ