Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

ইকো পার্কের সপ্তম আশ্চর্য

একইসঙ্গে মিশর, চীন, রোম, ইতালি, ব্রাজিল, চিলি আর ভারত ভ্রমণের  আনন্দ পেতে চাও? তাও আবার মাত্র একদিনেই! তাহলে সটান চলে আসতে হবে কলকাতার নিউটাউনের ইকো পার্কে।

ইকো পার্কের সপ্তম আশ্চর্য
  • ৮ জুন, ২০২৫ ০৪:০০

বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের নামগুলি কে না জানে! যদি একবারেই সেগুলো দেখে নেওয়া যেত, তাহলে কেমন হতো? নিউটাউনের ইকো পার্কে রয়েছে সপ্তম আশ্চর্যের রেপ্লিকা। সেই সাতটি স্থাপত্য ঘুরে এসে লিখলেন চকিতা চট্টোপাধ্যায়।

Advertisement

একইসঙ্গে মিশর, চীন, রোম, ইতালি, ব্রাজিল, চিলি আর ভারত ভ্রমণের  আনন্দ পেতে চাও? তাও আবার মাত্র একদিনেই! তাহলে সটান চলে আসতে হবে কলকাতার নিউটাউনের ইকো পার্কে। একসঙ্গে ধরা দেবে বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্য! সোমবার বাদে প্রতিদিনই খোলা থাকে এই পার্ক।  বেলা বারোটা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত। প্রবেশমূল্য মাত্র তিরিশ টাকা। তবে সপ্তম আশ্চর্য দেখতে গেলে আলাদা করে আবার মাথাপিছু তিরিশ টাকার টিকিট কাটতে হবে। 
চারশো আশি একর বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই পার্ক। ২০১৭ সালে এখানে তৈরি হয়েছে এই অভিনব সৃষ্টি! বিশ্বের সাতটি আশ্চর্যের রেপ্লিকা। এই পার্কে প্রবেশের অনেকগুলো গেটের মধ্যে চার নম্বর গেট দিয়ে ঢুকলেই একদম সামনেই পাবে এই ‘সপ্তম আশ্চর্য’কে। দেখে চমকে না উঠে পারা যায় না! হুবহু যেন আসলের মতোই! শুধু আকারে ছোট। স্টিলের পাতের ওপর ফাইভারের এই সূক্ষ্ম কারুকাজ অত্যন্ত মনোগ্রাহী। প্রতিটি স্থাপত্যকে নিঁখুত ভাবে গড়ে তোলা হয়েছে শিল্পী রূপচাঁদ কুণ্ডুর পরিকল্পনায়।  
প্রথম ‘আশ্চর্য’র সামনে দাঁড়ালে চোখে পড়বে এক মস্ত স্ফিংস থাবা পেতে বসে রয়েছে। তার পাশেই রয়েছে মিশরের গিজার পরপর তিনটি পিরামিড। একটা প্রবাদ যুগ যুগ ধরে চলে আসছে, ‘মানুষ ভয় পায় সময়কে, আর সময় ভয় পায় পিরামিডকে!’ ফ্যারাওদের মৃত্যুর পর তাঁদের দেহ মমি করে পিরামিডের ভেতর সমাহিত করা হতো। কারণ মিশরীয়রা বিশ্বাস করত যে, ফ্যারাওরা মৃত্যুর পর মৃতদের রাজা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই পিরামিডগুলো তাই ফ্যারাওদের পুনর্জন্মের প্রবেশ দ্বার। যতদিন তাঁদের দেহ সংরক্ষণ করা যাবে, ততদিন তাঁরা স্বর্গে বাস করবেন। সবচেয়ে বড় পিরামিডটির নাম ‘খুফুর পিরামিড’। কলকাতার রেপ্লিকাতে পিরামিডের ভেতরের দেওয়াল জুড়ে রয়েছে মিশরের আনুবিশ থেকে শুরু করে নানান দেবতার ছবি। খোদাই করা আছে হায়রোগ্লিফিক লিপি। ভেতরে আলো-আঁধারির এমন ব্যবহার যে গা ছমছম করে উঠবেই! একমুহূর্তের জন্য মনে হবে যেন সত্যিই ইজিপ্ট অর্থাৎ মিশরের খুফুর পিরামিডের ভেতরেই দাঁড়িয়ে রয়েছ! 
পিরামিড থেকে বেরিয়ে এবার চলে আসা যাক দ্বিতীয় আশ্চর্য জর্ডনের পেড্রা শহরের বিখ্যাত ‘আলখাজন’-এর  সামনে। এই বিখ্যাত স্থাপত্যের সামনে বহু হলিউড ছবির শ্যুটিং হয়েছে। এই পেড্রা হল জর্ডনের হারানো শহর। তৈরি করেছিলেন নাবাদিওরা। খ্রিস্টপূর্ব তিনশো বারো পর্যন্ত তাঁরা এখানে বসবাস করতেন। যুদ্ধ এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয় পেড্রাকে একদিন জনশূন্য করে দেয়। হারিয়ে যায় এই শহর। তারপর, ১৮১২ সালে সুইস ভ্রমণকারী জোয়ান লুডভিগ বার্কহার্ড স্থানীয় গাইডের সাহায্যে ছদ্মবেশে এখানে প্রবেশ করেন। এই স্থাপত্যটি বেলে পাথরের পাহাড় কেটে বানানো হয়েছিল বলে একে গোলাপ শহরও বলা হতো। পেড্রা নাবাতীয়দের রাজ্যের রাজধানী হয়ে ওঠে। ইকো পার্কের মিনিয়েচার এই পেড্রা শহরের ভেতর ঢুকে পড়লেই দেখতে পাবে নানারকম মূর্তি আর ছবি। চাইলে ফোটো তুলতেই পার। গলির ভেতর গলি, বাঁকের পরে বাঁক, মধ্যে মধ্যে অদ্ভুত অদ্ভুত সব মূর্তি! দেখতে দেখতে গায়ে যে কাঁটা দিয়ে উঠবেই— একথা কিন্তু হলফ করে বলতে পারি!  
কথিত আছে, মহাকাশ থেকে মাটি-চুন আর পাথর দিয়ে মানুষের হাতে বানানো পৃথিবীর যে একমাত্র স্থাপত্যটি দেখা যায়, সেটি হল চীনের মহাপ্রাচীর! উত্তর চীনের প্রায় পনেরোটি অঞ্চল জুড়ে এর অবস্থান। প্রথম নির্মাণ শুরু হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৭৭০-২৭৬ অব্দে এবং নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৮৭৮ সালে। এটি শুরু হয়েছিল সাংহাই পাস থেকে। শত্রুর হাত থেকে চীনকে রক্ষা করাই এর লক্ষ্য ছিল। ইকো পার্কের এই ‘চায়না-ওয়াল’টি অবিকল দেখতে যেন আসলটির মতোই! প্রাচীরের গায়ে খোদাই করা ইতিহাস দেখতে দেখতে  এই প্রাচীরটির ওপর দিয়ে হাঁটা যায়, আবার  গম্বুজের জানলায় দাঁড়িয়ে ফোটোও তোলা যায়! 
দূর থেকে চোখে পড়বে দু’দিকে দু’হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আছেন যিশু খ্রিস্ট! ঠিকই ধরেছ। এটিই সেই ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে অবস্থিত  ‘ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার’-এর মূর্তির রেপ্লিকা! পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম এই মূর্তিটি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা লাভ করে ব্রাজিলের প্রতীকে পরিণত হয়েছে! এই মূর্তিটি কার্কোভাদো পাহাড়চূড়ায় এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন পুরো শহরটিকেই আলিঙ্গন করবে! কংক্রিট ও পাথরের মূর্তিটি প্রায় একশো ফুট লম্বা। বেদীসহ উচ্চতা ১২৫ ফুট। ছড়ানো দু’হাতের দৈর্ঘ্য ৯২ ফুট এবং এর ওজন ৭০০ টন। ১৯২২ সালের ৪ এপ্রিল ব্রাজিলের স্বাধীনতা দিবসে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। উন্মোচন হয় ১৯৩১ সালের ১২ অক্টোবর। ইকো পার্কের মূর্তিটির উচ্চতা প্রায় ষাট ফুট। সন্ধ্যার সময় আলো ঝলমলে ইকো পার্কে দু’হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই ‘ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার’ দর্শক আকর্ষণের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু!   
আরে! আরে! ওগুলো কী? সার দিয়ে দাঁড় করানো? কী অদ্ভুত দর্শন বিশাল বিশাল মূর্তি! দেখে যেন মনে হয় অসম্পূর্ণ! হ্যাঁ, ওগুলো তো সেই ইস্টার আইল্যান্ডের ‘মোয়াই’! দক্ষিণ-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের চিলির একটা ছোট্ট দ্বীপে যাদের অবস্থান! এই ছোট্ট দ্বীপটিকে ১৯৯৫ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের স্বীকৃতি দিয়েছিল! পলিনেশিয়ায় ‘রাপানুই’ সম্প্রদায়ের মানুষ এই মূর্তিগুলো তৈরি করেছিল। যাদের ‘মোয়াই’ বলা হয়। কিন্তু কেন ওই মূর্তিগুলো তৈরি করা হয়েছিল? গবেষকরা বছরের পর বছর ধরে গবেষণা করেও এই রহস্যের কিনারা আজও করতে পারেননি! তাই এই নিয়ে নানা মুনির নানা মত। এই মোয়াইগুলোর এক একটার ওজন দশতলা বাড়ির সমান! ইকো পার্কে উঠে এসেছে যেন একটুকরো ইস্টার আইল্যান্ড! মূর্তিগুলোও যেন অবিকল আসল মোয়াইয়ের মতো! তাই এগুলির সামনে দাঁড়ালে নিজেকে নিঃসন্দেহে একজন অ্যাডভেঞ্চারার প্রেমী বলে মনে হবে!  
ইতালির রোম শহরে অবস্থিত বৃহৎ উপবৃত্তাকার ছাদবিহীন এক মঞ্চ হল কলোসিয়াম। এর অবিকল মিনিয়েচার রেপ্লিকাও এই ইকো পার্কের অন্যতম আকর্ষণ! ৭২ খ্রিস্টাব্দে রোমান সাম্রাজ্যে নির্মাণ শুরু হয়েছিল এই আটচল্লিশ মিটার উচ্চতার স্থাপত্যটির। এটি এখনও পর্যন্ত নির্মিত বৃহত্তম প্রাচীন অ্যাম্পিথিয়েটার। চুনাপাথর ও ইটের তৈরি এই থিয়েটারে পঞ্চাশ হাজার থেকে আশি হাজার দর্শক বসতে পারত। গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই, রোমান পুরাণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি নাটক অভিনীত হতো এই কলোসিয়ামে। একদিকে ভূমিকম্প ও অন্যদিকে ‘পাথর ডাকাত’দের লুটপাটের কারণে এটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইকো পার্কের কলোসিয়ামের ভেতরে দেখতে পাবে গ্যালারিতে সার সার দর্শকদের মূর্তি, নীচে মানুষ আর বাঘ-সিংহের লড়াইয়ের মূর্তিও! দেখতে দেখতে কল্পনায় পিছিয়ে যাবে প্রায় দু’হাজার বছর! মনে হবে যেন নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছ সেসব কিছু! এই বুঝি সিংহটা ঝাঁপিয়ে পড়বে! 
সপ্তম আশ্চর্যর শেষ আশ্চর্যটি হল ভারতের আগ্রায় অবস্থিত তাজমহল! এই সমাধিস্থল মুঘল সম্রাট শাহজাহান তাঁর স্ত্রী মমতাজমহলের স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মাণ করেছিলেন। নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ১৬৩২ সালে। আর শেষ হয়েছিল ১৬৫৩-তে। সাদা মার্বেল পাথরের এই গম্বুজাকৃতির রাজকীয় সমাধিটি বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম। ইকো পার্কের তাজমহল দেখে চমকে উঠবেই! মনে হবে যেন সত্যিকারের তাজমহলের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছ! সিঁড়ি দিয়ে উঠে এর চাতালে  হাঁটতে হাঁটতে ফোটো তুলতে পারবে। সন্ধেবেলা এর গম্বুজের খোপে খোপে জ্বলে উঠবে আলো! আরও মনোমুগ্ধকর দেখাবে সাদা দেওয়ালের কারুকার্য!  
বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক জুলে ভার্ন আশি দিনে পৃথিবী পরিক্রমণের গল্প বলেছিলেন তাঁর ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটটি ডেজ’ বইটিতে। কলকাতার ইকো পার্কের কল্যাণে তোমরাও কিন্তু বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্য  ঘুরে আসতে পারবে মাত্র আশি মিনিটেই!

সম্পর্কিত সংবাদ