কমে গিয়েছে কর্মচারী ভবিষ্যনিধি সংগঠনের (ইপিএফও) গ্রাহক সংখ্যা। মাত্র একমাসের ব্যবধানে এই কেন্দ্রীয় সংগঠনের হ্রাসপ্রাপ্ত সদস্য সংখ্যা প্রায় এক লক্ষ! ২২ লক্ষ থেকে কমে হল ২১ লক্ষ। আমরা জানি, বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানি, কারখানা, অফিসে যেসব শ্রমিক ও কর্মচারী চাকরি করেন তাঁরা এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড অর্গানাইজেশনের (ইপিএফও) সদস্য। এই তহবিলে তাঁদের নামে প্রতিমাসে কিছু অর্থ সঞ্চয় হয়। কিছু টাকা কেটে নেওয়া হয় সদস্যের বেতন থেকে এবং নিয়োগ কর্তার তরফেও কিছু টাকা ওই সঙ্গে জমা পড়ে। সদস্য অবসরগ্রহণের পর সুদসহ এককালীন মোটা টাকা ফেরত পান এবং ওইসঙ্গে প্রতিমাসে ন্যূনতম এক হাজার টাকা পেনশনেরও ব্যবস্থা হয় তাঁর। তাই শ্রমের বাজারে ইপিএফও সদস্য সংখ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই সদস্য সংখ্যার হ্রাস-বৃদ্ধি দিয়ে দেশে নিয়োগ পরিস্থিতির বিচার বিশ্লেষণ করা সহজ হয়।
সরকারি ক্ষেত্রে নিয়োগের ছবিটা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারি দপ্তর ও রেল এবং ব্যাংক, বিমাসহ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিতে কর্মী নিয়োগ বাড়ছে না। জনসংখ্যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শাখাসংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও সমানুপাতে কর্মী নিয়োগ বাড়ছে না, বরং বহু ক্ষেত্রে তা কমেই যাচ্ছে। গত দু-দশকে শূন্যপদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের অনীহা ধরা পড়েছে ব্যাপক মাত্রায়। দেশজুড়ে রাজ্য সরকারের রকমারি দপ্তর এবং অধিগৃহীত সংস্থাগুলির ছবিটাও অবিকল। সব মিলিয়ে দেশের বৃহত্তম বাহিনীর নাম বেকারবাহিনী! আর এই পরিস্থিতিতেই সামনে এল কেন্দ্রের শ্রমমন্ত্রকের আওতাধীন ইপিএফওর মন খারাপ করা পে-রোল ডেটা। স্বভাবতই উদ্বেগ বেড়েছে মোদি সরকারের। কারণ উৎসবের মরশুমে ইপিএফওতে গ্রাহক অন্তর্ভুক্তি কমে যাওয়ার অর্থ, বেসরকারি সংস্থায় চাকরির আকাল। উৎসবের মরশুম না-হয় কালের নিয়মে পেরিয়ে যাবে, কিন্তু সামনেই যে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বড়ো রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচন! নভেম্বরে ভোট নেওয়া হবে বিহারে। ওই হিন্দিভাষী রাজ্যে এখন নীতীশ কুমারের ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার চলছে। বিহারের নির্বাচন মিটতে না মিটতেই চলে আসবে বাংলা, অসম, কেরল ও তামিলনাড়ুতে সরকার তৈরির ভোট। অর্থাৎ আগামী মে মাস পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলির মরণ-বাঁচন সংগ্রামই চলবে। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে তাই ইপিএফওতে গ্রাহক অন্তর্ভুক্তি কমে যাওয়ায় যথেষ্টই চিন্তায় পড়েছে মোদি সরকার। কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রক সদ্য সদ্য প্রকাশ করেছে গত জুলাই মাসের ভিত্তিতে ইপিএফও পে-রোল ডেটা। তাতে দেখা যাচ্ছে, ওই মাসে সারা দেশে ইপিএফওতে প্রায় ২১ লক্ষ ৪ হাজার গ্রাহক অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে যেমন নতুন গ্রাহকের পাশাপাশি রয়েছেন রি-জয়েনিংও শ্রমিক-কর্মচারীরাও—অর্থাৎ, একবার ইপিএফওর আওতা থেকে বেরিয়ে গিয়ে পুনরায় এই সামাজিক সুরক্ষা পরিষেবার অধীনস্থ হয়েছেন তাঁরা। জুন মাসের পে-রোল ডেটা অনুযায়ী, দেশে গ্রাহক অন্তর্ভুক্তির সংখ্যা ছিল প্রায় ২১ লক্ষ ৮৯ হাজার। অর্থাৎ, একমাসের ব্যবধানে ইপিএফওর গ্রাহক অন্তর্ভুক্তির সংখ্যা সারা দেশে প্রায় ৮৫ হাজার কমে গিয়েছে! নতুন গ্রাহক অন্তর্ভুক্তিও আশাব্যঞ্জক নয়। গত জুন মাসে ইপিএফওতে নতুন গ্রাহক নথিভুক্ত হয়েছিলেন ১০ লক্ষ ৬২ হাজার। জুলাই মাসে তা কমে ৯ লক্ষ ৭৯ হাজারে নেমে এসেছে।
মোদি সরকার যখনই বিপাকে পড়ে তখনই আঁকড়ে ধরে কিছু চমকের রাজনীতি। যেমন পিঠ বাঁচাতে এখন চলছে জিএসটি সংস্কারের বাগাড়ম্বর। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, এটা নাকি দেশবাসীকে তাঁর ‘দীপাবলির উপহার’। ২২ সেপ্টেম্বর থেকে আমাদের ‘সাশ্রয় উৎসবে’ মেতে ওঠারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, টালমাটাল অর্থনীতির কঙ্কাল ঢাকতে স্বদেশি পণ্যে গুরুত্ব আরোপের ধুয়ো তোলা হচ্ছে। বিশ্বায়নের যুগে এই হুজুগের প্রাসঙ্গিকতা কতটা অবশিষ্ট রয়েছে, সেই কথা
ভুলে এইমতোই অর্থনীতির রোডম্যাপ বানাতে চলেছে সরকারের প্রাণভোমরা আরএসএস বা সংঘ। এই ধামাকা ভোটের বাজার দখলে কতটা সফল হবে তা জানার জন্য আমাদের আগামী নির্বাচনগুলির জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু কাজের বাজারের মন্দা কাটাতে এই দাওয়াই যে কোনও কাজে আসবে না তা এখনই হলফ করে বলে দেওয়া যায়। যে বেকারদের কাঁধে ভর করে নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর কুর্সি দখল করেছিলেন, তাঁদের কল্যাণচিন্তায় আন্তরিক হতে হবে তাঁকে। কোটি কোটি যুবক-যুবতির সুবিশাল বেকারবাহিনী আর কোনও চাতুরি, ছলনা চায় না।