


ত্বকের যত্নে আমরা নানাবিধ পন্থা খুঁজে বেড়াই। কিন্তু হাজার বাহারি যত্নের ভিড়ে ভুলে যাই মূল যত্নের কথা। সেটা হল হাইড্রেশন অর্থাৎ ত্বক সবসময় আর্দ্র রাখা। ত্বকের আর্দ্রতার ভারসাম্য যদি ঠিকভাবে বজায় রাখা যায়, তাহলে অনেক সমস্যা কমে যাবে এমনিতেই। তবে ভেতর থেকে ত্বককে রাখতে হবে আর্দ্র। তার জন্য একটা সার্বিক রূপরুটিন মেনে চলাই আদর্শ। হঠাৎ একদিন প্যাক লাগালাম, আর ভাবলাম ফল পেয়ে যাব, এটা কিন্তু হয় না। পুজো আসতে মাস দুয়েক এখনও হাতে রয়েছে। তাই দ্রুত শুরু করে দিন সার্বিক যত্ন।
যাদের এমনিতেই শুষ্ক বা ড্রাই স্কিন তাদের তো বেশি করে খেয়াল রাখতে হবে আর্দ্রতার দিকে। বাইরে থেকে বিভিন্ন রূপচর্চার সামগ্রী ব্যবহার করলেও ফল পাবেন তখনই, যখন দেখবেন ঘুম ঠিকঠাক হচ্ছে। সৌন্দর্য বজায় রাখতে পর্যাপ্ত ঘুম সবসময় দরকার। ইদানীং ব্যস্ত জীবনে ঘুমের বিষয়ে অনেকেই অবহেলা করেন। রাত জেগে ওটিটি কিংবা সামাজিক মাধ্যমে দীর্ঘক্ষণ মগ্ন থাকার ফলে চোখে কালির ছাপ পড়ছে সহজেই। ঘুম বিঘ্নিত হওয়ায় তার প্রভাব পড়ছে ত্বকেও। এই কুঅভ্যাসে বলিরেখাও আসছে দ্রুত। তাই ছোটবেলা থেকে শেখা মন্ত্র ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম, কখনওই হেলাফেলা করবেন না। মন থেকে সব দুশ্চিন্তা দূরে সরিয়ে রাতে টানা ঘুম দিন।
এরপর আসুন জল খাওয়ার অভ্যাসে। প্রতিদিন পরিমাণমতো জল খাওয়া শুরু করে দিন। এতদিন যা অনিয়ম করেছেন, কুলুঙ্গিতে তুলে রাখুন সেসব। নিজেকে বোঝান, দিনে আট-দশ গ্লাস জল খেতেই হবে। সঠিক সময় ঘুম এবং ঠিকমতো জলপানের অভ্যাস আপনার ত্বকের অনেক সমস্যা কমিয়ে দেবে। ত্বক নিয়ে যত বেশি ভাববেন, তত দ্রুত ত্বকে তার প্রভাব পড়বে। তাই প্রাকৃতিক অভ্যাসের মাধ্যমে ত্বকের খেয়াল রাখাই সেরা উপায়।
খাওয়ার অভ্যাসের সঙ্গেও ত্বকের আর্দ্রতার রক্ষার সম্পর্ক রয়েছে। জলীয় ফল ও সব্জির উপর ভরসা রাখুন। এই মরশুমে শসা, তরমুজ, বেলপেপার, পাতিলেবু এবং শীতে কমলালেবু, ফুলকপি এগুলো নিয়ম করে খাওয়ার অভ্যাস করুন। খেতে পারেন ডাবের জলও।
এবার দেখা যাক ত্বক সাফসুতরো রাখতে কী কী করবেন? সুস্থ ত্বকের জন্য ক্লেনজিং খুব গুরুত্বপূর্ণ। মুখ পরিষ্কার করতে বেছে নিন হালকা কোনও ক্লেনজার। মুখ ধোয়ার জন্য ব্যবহার করুন ঈষদুষ্ণ জল অথবা ঠান্ডা জল। ক্ষতিকর উপাদান সমৃদ্ধ কড়া ক্লেনজার ত্বকের আর্দ্রতা নষ্ট করে। ত্বক আরও শুষ্ক হয়ে যায়। সালফেট থাকা ক্লেনজার বাদ দিন রূপচর্চা থেকে। ফোম বেসড বা অ্যান্টি-ব্যাক্টেরিয়াল ক্লেনজার কিংবা যেগুলোয় বেশি সুগন্ধ থাকে, সেই ধরনের ক্লেনজার থেকে দূরে থাকাই ভালো। আর যত ঠান্ডাই পড়ুক, খুব গরম জলে কখনও মুখ ধোবেন না। এতে মুখ আরও অনুজ্জ্বল দেখায়।
ত্বক পরিষ্কার করতে গিয়ে অতিরিক্ত কিছু করতে যাবেন না। অনেকে ভাবেন ভালো করে এক্সফোলিয়েশন করালে ত্বক ভালো থাকবে। কিন্তু সেটাও করতে হবে সময়ের সঠিক ব্যবধান মেনে। মনে রাখবেন, অতিরিক্ত এক্সফোলিয়েশনে ত্বকের কোনও উপকার হয় না। উল্টে ত্বক খুব শুষ্ক হয়ে যেতে পারে।
ক্লেনজিং-এর পরে আসুন ময়েশ্চারাইজিং-এ। ত্বকের আর্দ্রতা রক্ষায় ময়েশ্চারাইজ খুবই জরুরি। আপনার ত্বকে যে ময়েশ্চারাইজার উপযোগী তেমনটাই ব্যবহার করুন। ত্বক তৈলাক্ত যাদের, তাদের জন্য এখন রয়েছে জেল বেসড ময়েশ্চারাইজার বা হায়ালুরনিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ ময়েশ্চারাইজার। ত্বকে অতিরিক্ত তেলাভাব থাকলে আর্দ্রতা দরকার নয়, এমনটা কিন্তু একেবারেই নয়। শুষ্ক ত্বকে লাগবে ক্রিম বেসড ঘন ময়েশ্চারাইজার। আর যাদের ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক, তাঁরা ময়েশ্চারাইজারের পাশাপাশি অতিরিক্ত আর্দ্রতা পেতে ব্যবহার করতে পারেন তেলও। তবে সেটা শীতেই বেশি উপযোগী। নারকেল তেল থেকে শুরু করে সূর্যমুখী তেল, অলিভ অয়েল সবই ব্যবহার করতে পারেন। ভিটামিন ই সমৃদ্ধ তেল পেলে তো কথাই নেই। এগুলো সব ক’টিই আর্দ্রতা বজার রাখার ক্ষেত্রে খুবই কার্যকর।
রূপরুটিনে কখনওই ভুলবেন না সানস্ক্রিন লোশন। এসপিএফ ৩০-র মতো সানস্ক্রিন রোজকার ত্বক-চর্চায় রাখতেই হবে। কারণ অতিরিক্ত রোদ্দুর এবং ঘামের ফল হল আর্দ্রতা হারিয়ে যাওয়া। তাই বাইরে থাকলে কিছু সময় অন্তর সানস্ক্রিন প্রয়োগ দরকারি।
কোনওদিন রাতে সময় পেলে ‘স্লিপিং মাস্ক’ হিসেবে মুখের ত্বকে ব্যবহার করতে পারেন, শসা-অ্যালোভেরার মিশ্রণ। অর্ধেক শসা মিক্সিতে কুরিয়ে নিন। তার সঙ্গে মেশান কয়েক চামচ অ্যালোভেরা জেল। এই মিশ্রণ হালকাভাবে লাগিয়ে রাখুন গোটা মুখে। অ্যালোভেরা সবসময়েই আর্দ্রতা রক্ষার দৌড়ে এক নম্বরে। আর শসা ত্বকের জ্বালাভাব এবং শুষ্কতায় দেয় নরম প্রলেপ। সারা রাত ত্বকে রেখে ঘুম থেকে উঠে ধুয়ে ফেলুন মুখ। দেখবেন ঝলমলে লাগছে।
আর এক পথে ঘুমের মধ্যে যত্ন করতে পারেন ত্বকের। ভেজা মুখে ভালো করে পেট্রোলিয়াম জেলির প্রলেপ দিয়ে শুয়ে পড়ুন। সারা রাত আর্দ্রতার ভারসাম্য রক্ষা তো হবেই, ঘুম থেকে উঠে পাবেন শিশিরভেজা ত্বকের মতো অনুভূতি! তবে অ্যাকনে বা ব্রণর সমস্যা থাকলে এই উপায় একেবারেই অনুসরণ করবেন না। ত্বক বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করে তবেই সিদ্ধান্ত নেবেন। বলা হয় পেট্রোলিয়াম জেলির পুরু আস্তরণ ‘ট্রান্সএপিডারমাল ওয়াটার লস’ প্রতিরোধ করে। হঠাৎ সকালে উঠে যদি মনে হয় ত্বক বেশি খসখস করছে, বুঝবেন ট্রান্সএপিডারমাল ওয়াটার লস-এর জন্যই এমন অনুভূতি হচ্ছে।
এছাড়া ত্বকের আর্দ্রতা রক্ষা করতে ব্যবহার করতে পারেন হাইড্রেটিং সেরাম। এই ধরনের যেসব সেরামে হায়ালুরনিক অ্যাসিড আছে, বেছে নিন সেগুলো। ত্বকের আর্দ্রতা ফেরাতে এই ধরনের সেরাম বেশিরভাগ সময়েই উপযোগী।
অন্বেষা দত্ত