ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: মা কালী হলেন আদ্যা মহাবিদ্যা। মহানির্বাণতন্ত্রে সদাশিব দেবীকে বলেছেন, জগৎ সংহারকারী মহাকাল তুমিই। মহাসংহার কালে তুমিই কাল রূপে সমগ্র বিশ্ব চরাচরকে গ্রাস কর। আবার মহাকালকে গ্রাস করে তুমিই হলে আদ্যাকালী। আর তুমিই বিশ্বের আদিরূপিণী বা কারণস্বরূপা। অথর্ববেদে কালসূক্তে বলা হয়েছে, কালে ব্রাহ্ম সমাহিত। কাল সর্বেশ্বর, কাল প্রজাপতির পিতা। কাল ব্রহ্ম হয়ে ব্রহ্মাকে ভরণ করেন। কালসূক্তে এটাও বলা হয়েছে, কাল একদিকে সৃষ্টিকারী অন্যদিকে পালনকারী দেবতা। পরে তিনি ধ্বংসকারী দেবতা রুদ্রের সঙ্গে মিছে গিয়েছেন। পুরাণ ও তন্ত্রে তিনিই মহাকালরূপে কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়কর্তা।
কালীর সৃষ্টি: একাধিক পৌরাণিক শাস্ত্রে কালীর সৃষ্ট কথা পৃথক পৃথক ভাবে বলা হয়েছে। প্রতিটি কাহিনি বৈচিত্র্যময়। যেমন মার্কণ্ডেয় পুরাণে দেবী চণ্ডীর বর্ণনায় দু’বার কালীর আবির্ভাবের প্রসঙ্গ পাওয়া যায়। দেবী পার্বতীর দেহ থেকে উৎপন্ন হন এক দেবী। তিনিই হলেন অম্বিকা। তিনি আবার কৌশিকী নামেও খ্যাত। কারণ তিনি পার্বতীর দেহকোষ থেকে উৎপন্না। দেবী অম্বিকা পার্বতীর শরীর থেকে সৃষ্টি হওয়ার পর দেবী পার্বতীর গাত্রবর্ণ কালো হয়ে যায়, তাই তিনি কালিকা নামে পরিচিতা। দ্বিতীয় বর্ণনাটি হল, শুম্ভ-নিশুম্ভর সেনাপতি চণ্ড-মুণ্ডের সঙ্গে যুদ্ধের সময় দেবীর ভ্রুকুটি কুটিল কপাল থেকে এক অতি ভয়ংকর নারী মূর্তি আবির্ভূতা হন। তিনিই কালী নামে প্রসিদ্ধা।
মহাভাগবত পুরাণ মতে, দক্ষরাজের শিবহীন যজ্ঞে অনিমন্ত্রিত হন তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা সতী। তবুও তিনি পিতৃগৃহে যজ্ঞে উপস্থিত হওয়ার জন্য স্বামী শিবের কাছে জেদ করলেন। শিব নানা যুক্তি,ধর্ম কথা বলে তাঁকে বিরত করার চেষ্টা করলেও তিনি শুনলেন না। বরং তাঁর ক্রোধ ও জেদ সাংঘাতিক বেড়ে গেল। তিনি তীক্ষ্ণ বাক্যে পতিকে বিদ্ধ করতে লাগলেন। শেষে নিজের ভয়ংকরী অতি ভীষণা স্বরূপ প্রকাশিত করলেন। তাঁর এই রূপ দেখে শিব নিজেকে নিজে ভুলে গেলেন। তিনি ভয় পেয়ে চোখ বুঝলেন। আবার দেখলেন ভয়ংকরী কালীমূর্তি। তিনি ক্ষীণকণ্ঠে বললেন, শ্যামা তুমি কে? আমার সতী কোথায়! শিবের এই কথায় মহাদেবী কিছুটা রাগ সংবরণ করলেন। তিনি বললেন, আমি তোমার পত্নী হওয়ার জন্য গৌরবর্ণ হয়েছি। তোমার দশদিকে তুমি যে মহাভয়ংকরী সব মূর্তি দেখছ তা সবই আমি। এটিই আমার দশ মহাবিদ্যার রূপ। তুমি আমাকে ভয় পেও না। শিব কী দেখলেন! তিনি দেখলেন, দশ মহাবিদ্যা তাঁর দশ দিকে অবস্থান করছেন— সামনে কালী, ঊর্ধ্বে তারা, পূর্বে ছিন্নমস্তা, পশ্চিমে ভুবনেশ্বরী, দক্ষিণে বগলা, অগ্নিকোণে ধূমাবতী, নৈর্ঋত কোণে ত্রিপুরাসুন্দরী,বায়ু কোণে মাতঙ্গী, ঈশান কোণে ষোড়শী আর অধঃদেশে ভৈরবী। এভাবেই মহাদেবী কালীর আবির্ভাব।
কালীর স্বরূপ: বিভিন্ন তন্ত্র শাস্ত্রে কালীর স্বরূপের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। যেমন শক্তিসঙ্গমতন্ত্রে কালী আদিনাথ ও পরব্রহ্ম। তিনি সচ্চিদাত্মস্বরূপা, ব্রহ্মরূপা ও নির্গুণ। ব্রহ্মাদি সমস্ত দেবতার উৎপত্তি ও লয় কালিকা থেকেই। ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণের কথায়, ‘গিন্নির কাছে যেমন একটা ন্যাতা ক্যাতার হাঁড়ি থাকে, আর সেই হাঁড়িতে গিন্নি পাঁচরকম জিনিস তুলে রাখে... হ্যাঁ গো! গিন্নিদের ওইরকম একটা হাঁড়ি থাকে। তারই ভিতরে সমুদ্রের ফেনা, নীল বড়ি, ছোট ছোট পুঁটলি বাঁধা শশা বীজ, কুমড়ো বীজ, লাউ বীজ— এইসব রাখে দরকার হলে বার করে। মা ব্রহ্মময়ী সৃষ্টি নাশের পর এইরকম সব বীজ কুড়িয়ে রাখেন। সৃষ্টির পর আদ্যাশক্তি জগতের ভেতরেই থাকেন। জগৎ প্রসব করেন, আবার জগতের মধ্যে থাকেন। বেদে আছে‘ঊর্ণনাভির’কথা; মাকড়সা আর তার জাল। মাকড়সা ভিতরে থেকে জাল বার করে, আবার নিজে সেই জালের উপর থাকে। ঈশ্বর জগতের আধার আধেয় দুই।’
তন্ত্রান্তরে কালিকা দু’রকম, কৃষ্ণা আর রক্ত। কৃষ্ণা হল দক্ষিণাকালী আর রক্ত হল সুন্দরী। দক্ষিণাকালী হলেন শ্যামাকালী। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কথায়,‘শ্যামাকালীর অনেকটা কোমল ভাব বরাভয়দায়িনী। গেরস্থের বাড়িতে এই দেবীর পূজা হয়।’
দক্ষিণাকালী নাম কেন?
নির্বাণতন্ত্র মতে, দক্ষিণ দিকে যমের অবস্থান। কালী নামে ভীত হয়ে যম এদিক ওদিক ছুটে পালায়। এই জন্য কালিকাদেবীকে দক্ষিণাকালী বলা হয়। এই শাস্ত্রেরই আরও একটি জায়গায় বলা হয়েছে,পুরুষ অর্থাৎ শিব হলেন দক্ষিণ আর শক্তি হলেন বামা। বামা দক্ষিণকে জয় করে জীব ও ত্রৈলোক্যের মহা মোক্ষ প্রদায়িনী। তাই তিনি দক্ষিণাকালী নামে খ্যাত। কামাখ্যাতন্ত্রে শিব বলেছেন, যজ্ঞাদি কর্মের শেষে যেমন দক্ষিণা প্রদান করলে যজ্ঞাদি কার্য সিদ্ধ হয়, তেমনই দেবী কালিকা সকলকে তার অভীষ্ট ফল প্রদান ও মুক্তি দান করেন। তাই তিনি বরবর্ণিনী দক্ষিণাকালী। আবার অনেক পণ্ডিত বলেন, দক্ষিণামূর্তি নামক ভৈরবের আরাধ্যদেবী বলে তাঁকে দক্ষিণাকালী বলা হয়।
দক্ষিণা কালীর ধ্যান রূপ?
কালীতন্ত্রের ধ্যান মন্ত্রে দক্ষিণাকালী মহা মেঘপ্রভা শ্যামা এবং অঞ্জনাদ্রিনিভা। তিনি করালবদনা, ঘোরা, মুক্তকেশী, চতুর্ভুজা ও মুণ্ডমালায় বিভূষিতা। আর তা থেকে বের হওয়া রক্তের ধারায় তিনি অভিষিক্তা। নীচের বাম হাতে সদ্যছিন্ন মুণ্ড। ওপরের বাম হাতে খড়্গ। ডানদিকের ওপরের হাতে অভয়মুদ্রা এবং ডান দিকের নীচের হাতে বরমুদ্রা। তিনি ঘোরদংষ্ট্রা করালাস্যা। পীনোন্নতপয়োধরা ভীষণা। শবহস্ত দিয়ে তৈরি তাঁর কাঞ্চী। তবু তিনি হাস্যমুখী। তাঁর ঠোঁটের দুই প্রান্ত দিয়ে বিগলিত রক্তধারায় দেবী দীপ্ত বদনা। তিনি মহারৌদ্রী ভয়ঙ্কর ঘোর রবকারিণী শ্মশানবাসিনী। উদিত অরুণের দ্যুতি তাঁর ত্রিনয়নে। মহাদেবী দন্তরা, মুক্তাখচিত ডান দিকে এলানো কেশরাশি। শবরূপী শিবের হৃদকমলে তাঁর অধিষ্ঠান। যার চারধারে ভয়ানক রব করছে দেবীর বাহন শিবা অর্থাৎ শিয়ালের দল। মহাকালের সঙ্গে তিনি বিপরীত রতিতে মগনা। প্রসন্নবদনা। ঈষদহাস্যযুক্ত মহাদেবীর শ্রীমুখপদ্ম যেন ভক্তের সর্বকামনা পূর্ণকারিণী ও সমৃদ্ধদায়িনী।
দক্ষিণাকালীর রূপের অন্তরালে
কৃষ্ণবর্ণা: ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কথায়, ‘কালী কী কালো? দূরে তাই কালো, জানতে পারলে কালো নয়। আকাশ দূরে থেকে নীল বর্ণ। কাছে দেখ, কোনও রং নাই। সমুদ্রের জল দূর থেকে নীল, কাছে গিয়ে হাতে তুলে দেখ, কোনও রং নাই।’ কর্পূরাদি স্তোস্ত্রে কালিকা দেবী নীল মেঘের মতন মনোজ্ঞা। এখানে কৃষ্ণবর্ণ এবং নীল বর্ণ একই। যোগবাশিষ্ঠ থেকে স্বামীজি উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, শিব আর শিবার ব্যোমরূপ বলে তাঁদের বপু অসিত বা কৃষ্ণ।
দিগম্বরী: কালী দিগ্ বস্ত্রা বা দিগম্বরী। বস্ত্র আবরণ স্বরূপ। একই সঙ্গে মায়ারূপ, যা আসল বস্তুর দর্শনের অন্তরায়। মা কালী মায়ার অতীত। তিনি পূর্ণব্রহ্মময়ী, তাই তিনি আবরণহীনা দিগম্বরী।
মুক্তকেশী: কালী নিজে মায়াতীতা কিন্তু অনন্ত কোটি জীবকে মায়ার পাশে আবদ্ধ করেন। তার মুক্ত কেশরাশি মায়াপাশ স্বরূপ। অন্যদিকে তিনি আবার ব্রহ্মা-বিষ্ণু- মহেশ্বরের মুক্তিদাত্রী, তাই তিনি মুক্তকেশী—ক+অ+ঈশ=কেশ। ক— ব্রহ্মা, অ— বিষ্ণু ও ঈশ অর্থে শিব।
কপালে অর্ধচন্দ্র: মহাদেবী কালী নির্বাণ মোক্ষ প্রদান করেন বলে তাঁর কপালে অর্ধচন্দ্র বা চন্দ্রকলা। মহানির্বাণতন্ত্রের মতে নিত্যা কালরূপা অব্যয়া শিবস্বরূপা কালীর কপালে অমৃতত্ত্ব চন্দ্রকলা অঙ্কিত। চন্দ্র থেকে ক্ষারিত অমৃত দেবীর কপালে চন্দ্রের সপ্তদশী কলা বা অমাকল শোভা বর্ধন করে।
ত্রিনয়নী: জগৎ সংসার কালের অধীন। ত্রিকাল অর্থাৎ ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান কাল। মা কালী হলেন কালাতীতা। তাঁর ত্রিনয়ন হল চন্দ্র, সূর্য ও অগ্নি। এইগুলি দিয়ে তিনি ত্রিকালকে সদা অবলোকন করছেন। তাই তিনি ত্রিনয়না মা।
করালবদনা: কালী করালবদনা। মহাকাল রূপে তিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে গ্রাস করে শেষে মহাকালকেও গ্রাস করেন। তাই তিনি করালবদনা।
ঘোরদংষ্ট্রাদি: মায়ের ঘোর দংষ্ট্রাদি রূপের বিশেষ অর্থ আছে। তাঁর সাদা দাঁত সত্ত্বগুণের, রক্তবর্ণ-জিভ রসনাময় রজোগুণের প্রতীক। মহাদেবী সন্তানের রজোগুণকে প্রথমে বৃদ্ধি করে তমোগুণ নাশ করেন। তারপর সত্ত্বগুণ বৃদ্ধি করে রজো ও তমো উভয় গুণকেই নাশ করেন। জিহ্বা দংশনে তাঁর রূপের আড়ালে এই তত্ত্বটিই প্রতিষ্ঠিত হয়।
শবকর্ণভূষণা: মা ভূষণ প্রিয়া। তবে তিনি যে সে গয়না পরেন না। তাঁর যে পরমপ্রিয় হল শিবের মতন নিষ্কাম নির্বিকার বালক স্বভাব। তাইতো তাঁর দুই কানের অলঙ্কার হল দু’টি কিশোর বা বালকের শব।
মুণ্ডমালিনী: মায়ের গলায় শোভা পায় পঞ্চাশটি (মতান্তরে একান্নটি) মুণ্ডের মালা। যা ৫০টি মাতৃকাবর্ণের প্রতীক। মা হলেন পঞ্চদশ বর্ণময়ী। তাঁর থেকে শব্দার্থময় জগতের উৎপত্তি ও লয়। কালীর গলার মুণ্ডমালা এই তত্ত্বের সংকেত বহন করে। অন্যদিকে তিনি শব্দব্রহ্মস্বরূপিণী সাক্ষাৎ সর্বদেবময়ী। কারণ এক একটি মাতৃকাবর্ণ একেকজন দেবতার সূক্ষ্মরূপ। মায়ের মুণ্ডমালার অন্য ব্যাখ্যাও আছে।
পীনোন্নতপয়োধরা: মা কালী জগজ্জননী। তিনি স্তন্যরূপ অন্নাদি দিয়ে ত্রিজগতের প্রতিপালন করছেন। তাই তিনি পীনোন্নতপয়োধরা। এর অর্থ হল তিনি তাঁর সন্তানকে দান করছেন দুগ্ধ রূপ অন্নাদি খাদ্য।
চতুর্ভুজা: মা দক্ষিণাকালী চতুর্ভুজা। তিনি দুষ্টের দমন ও সৃষ্টের পালন করেন। পূর্ণ বৃত্ত চতুর্ভুজ ধরলে তা ৩৬০ ডিগ্রি হয়, আর এক একটি বৃত্তকে চার ভাগে ভাগ করলে ৯০ ডিগ্রি করে হয়। কালী পূর্ণরূপা মহাকাশরূপিণী। তাই আকাশ ও কালী দুই ব্রহ্ম। মহাকাশকে পূর্ণবৃত্তকল্পনা করা হয়। তাই কালী চতুর্ভুজা।
মস্তক তত্ত্বজ্ঞানের আধার। দেবীর হাতে থাকা নৃমুণ্ড এই তত্ত্ব প্রকাশ করে। সন্তানরা মায়ের অতিপ্রিয়। দেবীর হাতের খড়্গটি জ্ঞান খড়্গ। এটির দ্বারা তিনি সাধকের মোহপাশ ছিন্ন করেন। তত্ত্বজ্ঞানী মোহমুক্ত সন্তানকে মা তার আদরের দুলাল রূপে পরম স্নেহে নিজের কাছেই রাখেন।



