ঘটনাবহুল জীবন। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে আমাদের চারপাশে কিছু না কিছু ঘটে চলেছে। বহু ঘটনা হারিয়ে যায় মুহূর্তের ভিড়ে। কোনও ঘটনা উঠে আসে শিরোনাম হয়ে। আর তার মধ্যে কিছু রেখে যায় দাগ। রক্তের দাগ। এমনই সাড়া ফেলে দেওয়া কয়েকটি ঘটনা ফিরে দেখল বর্তমান। সোহম করের কলমে।
সোহিনী ২২। উঠতি বয়স। তার উপর গোখেলের মতো কলেজ। গৃহশিক্ষক হেডমাস্টারের সঙ্গে সম্পর্কটাকে হয়তো বৈপ্লবিক বলেই মনে হয়েছিল। ভেসে গিয়েছিলেন লক্ষ্মীনারায়ণও। বাড়ির লোকজনও কিছু বলেনি। এমনকী সোহিনী গর্ভবতী হয়ে পড়ার পরও না। বিয়ে করতে চেয়েছিল সোহিনী। লক্ষ্মীনারায়ণকে। কিন্তু তিনি তো বিবাহিত! নড়েচড়ে বসেছিলেন তদন্তকারী অফিসাররা। মোটিভ পাওয়া গিয়েছে। পুলিস জানতে পারে, লক্ষ্মীনারায়ণ গর্ভপাতের পরামর্শও দিয়েছিলেন সোহিনীকে। সে রাজি হয়নি। তখন থেকেই সম্পর্ক খারাপের সূত্রপাত। সম্পর্কের ব্যাপারে নিশ্চিত হতেই লক্ষ্মীনারায়ণকে গ্রেপ্তার করে পুলিস। শুরু হয় জেরা। ক্রাইমের চরিত্র দেখে তদন্তকারী অফিসাররা একটা বিষয় বুঝেছিলেন—এটা কোনও ভাড়াটে খুনির কাজ। হঠাৎ গ্রেপ্তার আরও এক। চন্দন দাস। সিআইডি দাবি করল, এই চন্দনই ভাড়াটে খুনি। প্রথমে চেনা কেউ গিয়েছিল পাল বাড়িতে। চায়ে মেশানো হয়েছিল অত্যন্ত ভারী ডোজের ঘুমের ওষুধ। অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল সবাই। তখন ঢুকেছিল ভাড়াটে খুনি। তদন্তকারীদের কথায়, চন্দন দাস। সে-ই গলার নলি কেটে খুন করেছিল বাবা-মা ও দুই মেয়েকে।
তাহলে কি কেস ক্লোজড?
না। দীর্ঘকাল চলেছিল মামলা। এবং বারবার প্রকাশ্যে এসেছিল তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ। কেন? ১) চার্জশিট সঠিক সময়ে দিতে পারেনি সিআইডি। ২) যে অস্ত্র দিয়ে গলার নলি কাটা হয়েছিল, সেটি পাওয়া যায়নি। আলিপুরের অতিরিক্ত জেলা বিচারক তদন্তকারী অফিসারকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘মার্ডার উইপন’ কোথায়? উত্তর মেলেনি। ৩) প্রশ্ন উঠেছিল, সত্যিই কি লক্ষ্মীনারায়ণ চক্রবর্তী খুনের ষড়যন্ত্র করেছিলেন? তাঁর আইনজীবী আদালতে বলেন, সোহিনীর সঙ্গে আমার মক্কেলের সম্পর্কের কথা সবাই জানত। তাঁর স্ত্রী ডিভোর্স ফাইলও করেছেন। তাহলে লক্ষ্মীনারায়ণের খুনের মোটিভ কী?’ এরও উত্তর পাওয়া যায়নি। অপরাধও প্রমাণ করতে পারেনি পুলিস। ৪) চায়ে যদি ভারী মাত্রার ঘুমের ওষুধ বা বিষাক্ত কিছু মেশানো হয়েই থাকে, তা কে মিশিয়েছিল? লক্ষ্মীনারায়ণ? নাকি অন্য কেউ? প্রমাণ করতে পারেনি সিআইডি। ৫) যদি লক্ষ্মীনারায়ণ সেদিন সোহিনীদের বাড়িতে না এসে থাকে, তাহলে পরিচিত অন্য কে এসেছিল? যার ডাকে একবারে দরজা খুলে দিয়েছিল পাল পরিবার? সেই ব্যক্তিই কি তাহলে চায়ে ওষুধ মিশিয়েছিল? সেটাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে অন্য কারও ফিঙ্গারপ্রিন্ট অকুস্থলে পাওয়া গেল না কেন? এর উত্তরও চার্জশিটে ছিল না।
চার্জশিটে দাবি করা হয়েছিল, গৃহশিক্ষকই ‘সুপারি কিলার’ চন্দনকে ভাড়া করে। ৯ জুন সন্ধ্যায় প্রথমে লক্ষ্মীনারায়ণ চায়ে ওষুধ মেশায়। সোহিনীরা সবাই জ্ঞান হারিয়ে ফেললে সে অপেক্ষায় থাকা চন্দনকে ডাকে। চন্দনই খুন করে গোটা পরিবারকে। আদালতে কিন্তু এসব কিছুই প্রমাণ করা যায়নি। ১৯৯৯ সালের নভেম্বরেই জামিন পেয়ে যান লক্ষ্মীনারায়ণ। পুলিসের উপর ক্ষোভ উগরে তিনি বলেছিলেন, ‘পাল পরিবারের প্রকৃত খুনি কে, তা জানা গেল না। এটা খুবই হতাশজনক।’ চন্দন জামিন পান ২০০০ সালের জানুয়ারিতে। আর লক্ষ্মীনারায়ণ বেকসুর খালাস ২০০৭ সালে।
ওই বছরই জুন মাসে প্রয়াত বিদ্যুৎ পালের এক ভাই হাইকোর্টে আবেদন করেন। মামলা রি-ওপেন হয়। সেখান থেকে সুপ্রিম কোর্ট। মামলার জাল ছড়াতেই থাকে। কিন্তু পাল পরিবারের চারজনকে খুন করল কে? সেই উত্তর মিলল না। আর মিলবেও না। কারণ, এইসব প্রশ্ন করার লোকই কেউ আর নেই। প্রতিবেশীদের কাছে পি ৭৩ বাড়িটাই এখন বিড়ম্বনার। সাপের উপদ্রব ছাড়া আর কিছুই নেই সেখানে। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পথচলতি মানুষের মনেও থাকে না ২৬ বছর আগের সেই ভয়াবহ ঘটনা। আর পাশের গৃহশিক্ষকের বাড়ি? সেও যে তালাবন্ধ।